মার্কিনি শুল্কের অঙ্ক বাড়ছে, বারুদের গন্ধ যেন না বাড়ে

“জলের শ্যাওলা”- লেখার শুরুতেই ছোট্ট করে একটি অশনিসংকেতের কথা লিখি। যে অশনিসংকেতের কথা ইতিপূর্বেও বহু লেখায় লিখেছি আজকের এই লেখা অশনিসংকেতের একটি প্রশ্ন রেখেই লিখছি:

“তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ কি এশিয়াতেই জ্বলে উঠবে?”
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘণ্টা কি ইতিমধ্যেই বেজে উঠেছে? আমরা তার শব্দ শুনতে পাচ্ছি কি? বিশ্বের বিশেষ কিছু দিক বিবেচনায় নিলে যা দেখতে পাই (আপন ভাবনা), এশিয়ার আকাশে জমছে অশনি মেঘ। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক ও ভূমধ্যসাগর, তিন প্রান্তের উত্তাপ যেন একই বৈশ্বিক সংঘাতের দিকে ইঙ্গিত করছে। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মুখোমুখি অবস্থান এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন বিশ্বকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক সন্ধিক্ষণের দিকে। ক্রমেই যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে সংঘাতের ভূরাজনীতি।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যুদ্ধের আগুন অনেক সময় যেখানে জ্বলে ওঠে, তার শিখা ছড়িয়ে পড়ে বহুদূর। তাই প্রশ্নটি এখন আর কেবল যুদ্ধ হবে কি না নয়। বরং বিশ্ব কি নতুন এক মহাসংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে?
“ইতিহাস কি সত্যিই নিজেকে পুনরাবৃত্তি করছে, নাকি একই ধরনের অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে থেকেও আজকের বিশ্ব নতুন কোনো সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম?” এই প্রশ্ন একটি সম্ভাবনার বচন বলা মাত্র। কিভাবে বা কেন? বিশদ লিখছি না তবে লেখার মাঝে উপসর্গ চলে আসবেই।
ইতিহাস থেকে ১৯৩০ সালকে স্মরণ করা যায়। যদি ১৯৩০ এর দশকের শিক্ষা এমনটা হয়, অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্যিক প্রতিশোধ আন্তর্জাতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে, তাহলে প্রশ্ন করাই বাহুল্য যে, আজকের পৃথিবী কি সেই একই পথের শুরুতে দাঁড়িয়ে আছে? প্রশ্নটি খুব বেশি অপ্রাসঙ্গিক নিশ্চয়ই নয় কিন্ত। নাকি, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে যথেষ্ট শক্তিশালী রূপ ধারণ করবে? এই প্রশ্নটি আশাবাদের মাঝেই আপাতত রাখি।
আসুন সামান্য কিছুটা ইতিহাসের পাতায় ঘুরে আসি তাহলে বহুকিছুই পরিষ্কার হয়ে সামনে আসবে।
১৯৩০ সালের “Smoot–Hawley” শুল্ক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র “Smoot–Hawley Tariff Act” পাস করে আমদানির ওপর ব্যাপক শুল্ক বাড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল মূলত মার্কিন কৃষক ও দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করা।
কিন্তু অন্য দেশগুলোও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। ফলে বিশ্ব বাজারে নতুন করে শুরু হয় বাণিজ্যযুদ্ধ। IMF-এর ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৯২৯–১৯৩৩ সালের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২৫% কমে যায়, যার একটি বড় অংশ উচ্চতর বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। (ছোট্ট করে ইতিহাসটুকু শুল্কের হুকুম বুঝতে সুবিধে হবে বলেই বলা)
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
শুল্ক এলো অতঃপর এলো পাল্টা শুল্ক । ফলাফল হলো বাণিজ্যের সংকোচন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অবনতি। IMF এর অনেক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১৯৩০ এর দশকে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভাঙন, বাণিজ্য সংকোচন এবং পরবর্তীকালে কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে Smoot–Hawley কে সরাসরি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ বলা না হলেও বড় উপসর্গ হিসেবে বহু বিজ্ঞজনদের বিশ্লেষণে পাওয়া যায়।
এখানে জাপানের একটি উদহারণ উপযুক্ত কারণ হবে বা বেশ গুরুত্বপূর্ণ:
১৯৩০ এর দশকের মহামন্দায় আন্তর্জাতিক বাজার সংকুচিত হওয়ায় জাপানের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি বড়মাপের ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে মার্কিন শুল্ক জাপানি রেশম রপ্তানিকে চরমভাবে আঘাত করেছিল। ১৯২৯ সালের Great Depression এর পর জাপানের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে ১৯৩০–৩১ সালে জাপানে মূল্যপতন, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়। IMF এর একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯২৯–৩১ সালে জাপানের পাইকারি মূল্যসূচক ৩০ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। জাপান কতটা অর্থনৈতিক চাপে পড়ে যায় সেটা বুঝতেই অল্প করে চীনের মানচুরিয়া দখলের ঘটনাটিই তার প্রমাণ রাখে।
মানচুরিয়া ছিল চীনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকা—আজকের “Liaoning, Jilin ও Heilongjiang” অঞ্চলের কাছাকাছি। অঞ্চলটি জাপানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সেখানে কয়লা, লোহা, কৃষিজ সম্পদ এবং রেলপথের মতো অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পদ ছিল।
১৯৩১ সালে জাপান মানচুরিয়া দখল করে বসে। এখানে অর্থনৈতিক সংকট ও জাপানের সামরিক সম্প্রসারণের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে ইতিহাসবিদদের বিশদ আলোচনা আছে।
তবে এটা বলা ঠিক হবে না যে, আমেরিকার শুল্কের কারণে জাপান আমেরিকার সাথে যুদ্ধ করার প্লান করেছিল। উল্টো চীনের মানচুরিয়া দখলের পরে জাপানের আগ্রাসনে চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক সম্প্রসারণ যেন বৃদ্ধি না পায় বা ঠেকানো যায়, সেই ভাবনা থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজ থেকে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে জাপানের ওপর তেলসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক চাপ আরোপ করেছিল।
বলাই বাহুল্য যে, আমেরিকার অর্থনৈতিক চাপে জাপানের অর্থনীতিতে মারাত্মক ভূমিধস ঘটে। ভবিষ্যত জাপানের চিন্তাভাবনা থেকে আমেরিকার অর্থনৈতিক চাপকে উপেক্ষা করে, জবাবে জাপান ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা করে। পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটি কি পরিমান ধ্বংস জাপান করতে সক্ষম হয়েছিল যা পরিসংখ্যান দেখলেই অনুমান হয়। ছোট্ট করে দুই লাইনে পরিসংখ্যান বলি, পার্ল হারবারে জাপানি হামলায় ১৮টি মার্কিন জাহাজ ডুবে বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ১৮৮টি বিমান ধ্বংস হয়। ২,৪০৩ জন মার্কিন নাগরিক ও সামরিক সদস্য নিহত এবং ১,১৭৮ জন আহত হন (পার্ল হারবারের ইতিহাস এবং ভয়াবহতা ভিন্ন বহু লেখায় লিখেছিলাম/ তাই আজকে স্রেফ পরিসংখ্যানটি লেখার প্রয়োজনে উল্লেখ করা)। পার্ল হারবার ঘটনার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।
কেন লেখার উপরের অংশে শুল্ক- যুদ্ধ- অশনিসংকেত বা সংঘাত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম কিনা বা সম্ভাবনা নিয়ে লিখছি?
ইতিমধ্যেই নিশ্চয়ই সবার জানা হয়ে গেছে, “ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয়কারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০% শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়ে নতুন আইন স্বাক্ষর করেছেন”। যদিও ১০০% শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে সবার ওপর কার্যকর হয়নি তবে আইনটি মূলত ট্রাম্পকে তা আরোপের ক্ষমতা দিয়েছে। এখানে বলা ভাল যে, ট্রাম্প বিশ্বের শক্তিধর প্রেসিডেন্ট অবশ্যই তবে পাশাপাশি স্মরণে রাখা ভাল যে, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়িক ধ্যান জ্ঞানের চরিত্র স্বরূপ মানুষ।
শুল্ককে শুধু অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে দেখলে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। আধুনিক ভূরাজনীতিতে শুল্ক অনেক সময় অর্থনৈতিক অস্ত্র, চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার এবং শক্তির প্রদর্শন কিন্ত। তবে হ্যা কখনোই শুল্ক নিজে যুদ্ধের সমার্থক নয়। শুল্ক কীভাবে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে পারে, সেটি বোঝার জন্য অর্থনীতি, কূটনীতি ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে দেখতে হয় এবং বলাই বাহুল্য যে, শুল্ক একটি উপসর্গ অবশ্যই।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০০% শুল্ক সরাসরি ভারতের ওপর আরোপ করেছে, এমনটা নয়। রাশিয়ার তেল-গ্যাসের বড় ক্রেতা দেশগুলোর পণ্যে সর্বোচ্চ ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ক্ষমতা পেয়েছেন এবং যা ভারত ও চীন এর আওতায় পড়বেই। এই যে লিখছি, পড়বেই সেটার নমুনা ভারতের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে কেননা ভারত সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নিজ দেশের জনসাধারণের তেল- গ্যাসের সমাধান সবার আগে। অর্আৎ ভারত ট্রাম্পের সাক্ষরকে গণনায় নিচ্ছে না বা নিতে বাধ্য নয়। এখানে বলা যায় যে, পুর্বের ও বর্তমান ভারতের অর্থনৈতিক দিকটি বিশেষ বিবেচনার বিষয় কিন্ত। দিন পাল্টাচ্ছে, বিশ্বের শক্তি পাল্টাচ্ছে, বিশ্বের অর্থনীতি পাল্টাচ্ছে এবং সেই সাথে ভারতও পূর্বের অবস্থানের চেয়েও বহু অগ্রগামী শক্তি বটে।
অপরদিকে চীন!! চীনের কথা আর কি লিখবো। চীন বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির রাজা। চীন নিশ্চয়ই মার্কিনিদের ধমককে গণনায় নিবে না এবং সেটা শিশু- পাগলেও বুঝে।
তাহলে অবশেষে কি ঘটবে? অথবা কি ঘটবে বা ঘটতে পারে? বিষয়টি সেখানেই প্রশ্নের জন্ম দেয়
বর্তমান বিশ্বে যদি অর্থনৈতিক চাপ অস্ত্র হয়, কাল তা বাণিজ্যযুদ্ধ হবে, পরশু কূটনৈতিক সংঘাত ঘটবে এবং এর পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, কেউ জানে না। ঠিক সেখানেই বিশ্বশক্তির সংঘাতের নতুন মাত্রার ইঙ্গিত। ইতিহাস বলে, যুদ্ধ সব সময় বন্দুকের গুলিতে শুরু হয় না। কখনো কখনো তার প্রথম শব্দ শোনা যায় শুল্ক, নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যে।
এ কথা বলাই যায়, ভারত-চীনকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক চাপ বিশ্বরাজনীতির পুরোনো ভারসাম্যকে আরও নড়বড়ে করে তুলছে। লক্ষ্য করুন, ১৯৩০ সালের ইতিহাস যার শুরুটা কিন্ত শুল্কতেই। একটি কথা স্মরণ রাখা ভাল যে, ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়গুলো অনেক সময় এমন ছোট ছোট সংকেত দিয়েই শুরু হয়। এ কথা বলাই যায়, বিশ্বশক্তিগুলো যদি এখনই সংযত না হয়, তাহলে আগামী দিনের পৃথিবী শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, একটি বৃহত্তর সংঘাতের মূল্যও দিতে পারে। বিশ্বকে শান্তিতে রাখতে হলে, বিশ্বের পরাশক্তিগুলোকে সতর্ক হওয়ার সময় এখনই বা চূড়ান্ত সময়।
লেখার শেষে এসে স্রেফ একটি কমনার কথা লিখছি, “আজকের অর্থনৈতিক সংঘাত যেন আগামী দিনের সংঘাতের বীজ না হয়”। বিশ্বনেতাদের মনে রাখা উচিত, পরাশক্তিদের অহংকারের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। তাই প্রতিশোধ নয়, উল্টো সংযমের হোক ভাবনা এবং আধিপত্যে কূটনীতির জায়গা পাক শান্তির কূটনীতি। পরাশক্তিগুলোর গভীরতার সাথে ভাবা উচিত হবে, “পৃথিবীকে শাসন করতে চায়? নাকি শেষ পর্যন্ত পৃথিবীকেই বিপদে ফেলতে চায়?”
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.