ইরানের কাছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এ অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিক ও পেশাজীবীদের নিরাপত্তা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশি জাহাজ ও কনটেইনারের নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তুলেছে ঢাকা।
বুধবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৈঠকের পর একই দিন নিউইয়র্কের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রী কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী ও পেশাজীবীর নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শ্রমিক ও পেশাজীবী রয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে আটকে থাকা বাংলাদেশি কনটেইনার ও জাহাজের বিষয়টিও বৈঠকে তোলা হয়। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এসব জাহাজ ও কনটেইনার যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে, সে বিষয়ে ইরানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা কূটনৈতিকভাবে দ্রুত এই সংঘাতের সমাধানের আহ্বান জানিয়েছি।’
ইরানের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং বিষয়গুলো নোট করেছেন বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ সংঘাতের বিষয়ে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখছে বলে জানান হুমায়ুন কবির। আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কোনো সুযোগ তৈরি হলে বাংলাদেশ গঠনমূলক ভূমিকা পালনে প্রস্তুত বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ‘সফট-মিডিয়াম ইনফ্লুয়েন্স’ বা ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা সম্পন্ন দেশ হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্ব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অংশীদারের কেউ কেউ সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ অবস্থানকে কাজে লাগানোর উৎসাহ দিয়েছে।
তবে বাংলাদেশ সরাসরি দৃশ্যমান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেবে, এমনটি অপরিহার্য নয় বলে জানান তিনি। তার মতে, এ অঞ্চলের বন্ধু হিসেবে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখতে পারে বাংলাদেশ।
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠককে বাংলাদেশের জন্য একটি নিরপেক্ষ কূটনৈতিক পরিসর হিসেবে উল্লেখ করেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, ‘দ্য ইউএন ইজ আ নিউট্রাল ভেন্যু’—জাতিসংঘ একটি নিরপেক্ষ স্থান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এই সুযোগে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেননি। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের বিষয়গুলোও তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও ছিল।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ কূটনৈতিক উপায়ে সংঘাতের দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তা বৃহত্তর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, বৈঠকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিভিন্ন বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত ও কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছেন তিনি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক যোগাযোগের অংশ হিসেবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

