ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল : স্বল্পায়ু জীবনে দীপ্ত এক বহুমাত্রিক প্রতিভা

 

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে কিছু মানুষ তাঁদের স্বল্পায়ু জীবন দিয়েই রেখে যান দীর্ঘস্থায়ী এক আলোকরেখা। ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল তেমনই এক বিরলপ্রজ প্রতিভা। কবি, গীতিকার, শিক্ষক, গবেষক ও উপস্থাপক—বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতায় তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে।

১৯৩৬ সালের ১৩ মার্চ জন্ম নেওয়া এই গুণী মানুষটি ১৯৮৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মাত্র ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। আজ তাঁর ৩৭তম প্রয়াণবার্ষিকী। বেঁচে থাকলে এ বছর তাঁর বয়স হতো ৯০ বছর। স্বল্পায়ু জীবনের এই প্রজ্ঞাবান মানুষটি তাঁর সৃজনশীলতার যে দীপ্তি ছড়িয়ে গেছেন, তা আজও বাংলা সাহিত্য ও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।

অসাধারণ মেধার অধিকারী আবু হেনা মোস্তফা কামালের শিক্ষাজীবনও ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি মেধাতালিকায় স্থান অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান ও স্নাতকোত্তর—উভয় পরীক্ষাতেই প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তীক্ষ্ণ মনীষা, গভীর অন্তর্দৃষ্টি, সৌন্দর্যবোধ এবং ভাষার ওপর অসাধারণ দখল তাঁকে পরিণত করে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বে।

কবিতা, গান, অধ্যাপনা কিংবা উপস্থাপনা—যে ক্ষেত্রেই তিনি কাজ করেছেন, সেখানেই রেখে গেছেন তাঁর স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর। তাঁর কণ্ঠস্বর, উপস্থাপনার ভঙ্গি এবং শব্দচয়ন ছিল শ্রোতাকে মুগ্ধ করার মতো। একই সঙ্গে তাঁর কবিতা ও গানে ফুটে উঠেছে প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য, মানবিক অনুভূতি এবং সময়ের নানা সংকটের শিল্পিত প্রকাশ।

আধুনিক বাংলা গানের জগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। গভীর বৈদগ্ধ্য ও পরিশীলিত সৌন্দর্যবোধে তাঁর রচিত গানগুলো পেয়েছে অনন্য কাব্যমাধুর্য। ষাট, সত্তর ও আশির দশকে বেড়ে ওঠা তরুণ-যুবা বাঙালির প্রেম, প্রকৃতি ও অনুভূতির জগতে তাঁর গান ও কবিতা তৈরি করেছিল বিশেষ এক আবহ। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে যেমন ছিল নির্মল রোমান্টিকতা, তেমনি ছিল জীবন ও সমাজকে দেখার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।

তাঁর জনপ্রিয় গানগুলোর কয়েকটি পংক্তি আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল—

“আমি সাগরের নীল নয়নে মেখেছি
এই চৈতালি রাতে
ফুল-কঙ্কণ পরেছি দখিন হাতে।”

আবার—

“অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে
যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দু’চোখ ভরে।”

প্রেম ও প্রকৃতির নিবিড় অনুভব তাঁর গানে বারবার ফিরে এসেছে—

“তোমার কাজল কেশ ছড়ালো বলে এ রাত এমন মধুর।”

তাঁর গানে যেমন প্রেমের মায়া, তেমনি রয়েছে স্বপ্ন ও নবজাগরণের আহ্বান—

“নদীর মাঝি বলে এসো নবীন,
মাঠের কবি বলে এসো নবীন,
দেখেছি দূরে ঐ সোনালী দিন।”

আর প্রেমের এক সরল অথচ গভীর উচ্চারণ—

“তুমি যে আমার কবিতা…”

তবে আবু হেনা মোস্তফা কামালের কবিতার আরেকটি দিকও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতায় প্রেম ও সৌন্দর্যের পাশাপাশি ছিল সমাজের ভণ্ডামি, সংকীর্ণতা ও তথাকথিত ভদ্রতার বিরুদ্ধে সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। ‘স্বৈরিণী’ কবিতার শেষ পংক্তিতে সেই তীক্ষ্ণ বিদ্রূপেরই প্রকাশ—

“এটা ভদ্রপাড়া, এখানে নিষিদ্ধ সব কোকিলের গান।”

এই একটি পংক্তিই যেন তাঁর কবিসত্তার আরেকটি পরিচয় তুলে ধরে—সৌন্দর্যের পাশাপাশি সত্যকে দেখার এবং প্রচলিত ভণ্ডামিকে প্রশ্ন করার সাহস।

মাত্র ৫৩ বছরের জীবনে আবু হেনা মোস্তফা কামাল যে সৃজনভুবন নির্মাণ করে গেছেন, তা পরিমাণে হয়তো বিশাল নয়; কিন্তু শিল্পগুণ, মেধা, সৌন্দর্যবোধ ও স্বাতন্ত্র্যের বিচারে তা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক মূল্যবান সম্পদ। তাঁর গান ও কবিতা আজও নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসে; ফিরে আসে প্রেম, প্রকৃতি, সৌন্দর্য ও মানবিকতার নানা অনুভূতি নিয়ে।

সময়ের অস্থিরতা ও ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর সৃষ্টির কাছে ফিরে গেলে যেন দূর কোনো বনভূমি থেকে ভেসে আসে অজস্র শিউলির সুবাস। তাঁর শব্দের ভেতর আমরা খুঁজে পাই এক নির্মল সৌন্দর্যবোধ, তাঁর গানের সুরে শুনতে পাই হৃদয়ের অনুরণন, আর তাঁর কবিতায় অনুভব করি সময়কে প্রশ্ন করার এক সাহসী শিল্পীসত্তা।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই বরেণ্য সাধক-কবির ৩৭তম প্রয়াণবার্ষিকীতে তাঁর পুণ্যস্মৃতির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। স্বল্পায়ু জীবনের দীপ্ত সৃষ্টিকর্মে তিনি যে আলো রেখে গেছেন, তা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভুবনে দীর্ঘদিন জ্বলজ্বল করবে।

 লেখক : শাজাহান কাঞ্চন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.