প্রতিদিন মাত্র ৫ মিনিটের ব্যায়ামেই হতে পারে দীর্ঘ জীবন

ব্যস্ততার কারণে ব্যায়ামের জন্য আলাদা সময় বের করা অনেকের কাছেই কঠিন। দিনের শুরুতে জগিং, নিয়মিত জিম কিংবা দীর্ঘ সময় হাঁটার পরিকল্পনা করেও শেষ পর্যন্ত নানা ব্যস্ততায় তা আর হয়ে ওঠে না। অথচ সুস্থ থাকার জন্য সব সময় কঠিন বা দীর্ঘ সময়ের ব্যায়াম প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিটের কিছু শারীরিক কার্যকলাপও স্বাস্থ্যের ওপর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যকলাপ— যেমন দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা— অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবেষকদের হিসাবে, এমন সামান্য শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানো হলে প্রতি ১০টি অকালমৃত্যুর মধ্যে প্রায় একটি প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ ছোট্ট এই অভ্যাসটি লাখো মানুষকে আরও দীর্ঘ জীবন পেতে সহায়তা করতে পারে।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, সুস্থ থাকার জন্য প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট ব্যায়াম করাই যথেষ্ট। বরং গবেষণাটি দেখাচ্ছে, একেবারেই কিছু না করার তুলনায় সামান্য শারীরিক কার্যকলাপও শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর যারা এরই মধ্যে নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা বেশ সক্রিয়, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পাঁচ মিনিটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
শরীর ও মনের জন্যও উপকারী
শারীরিক কার্যকলাপ শুধু শরীরকে সক্রিয় রাখে না, এটি মস্তিষ্ক, স্মৃতিশক্তি ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। নিয়মিত নড়াচড়া মানসিক চাপ কমাতে এবং অতিরিক্ত ক্লান্তি প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কাইনেসিওলজির সহকারী অধ্যাপক নিকোল লোগানের মতে, শারীরিক সক্ষমতা, পেশির শক্তি, পেশির গুণমান ও হাড়ের শক্তি পরবর্তী জীবনে মৃত্যুঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস দিতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ তাই শুধু আয়ু বাড়াতেই নয়, দীর্ঘ সময় সুস্থ জীবনযাপনেও ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ মিনিটের গুরুত্ব
নতুন গবেষণায় যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার প্রায় দেড় লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতিদিনের শারীরিক কার্যকলাপে সামান্য পরিবর্তনও অকালমৃত্যুর ঝুঁকিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ও নরওয়েজিয়ান স্কুল অব স্পোর্টের শারীরিক কার্যকলাপ ও স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক উলফ একেলুন্ড বলেন, প্রতিদিন মাত্র পাঁচ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানোর মতো সামান্য পরিবর্তনও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়ামের লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে যারা জিমে যাওয়া বা খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন না, তাদের দৈনন্দিন জীবনে ছোট ছোট উপায়ে শারীরিক কার্যকলাপ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বসে থাকার সময় কমানোও ব্যায়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ
শুধু ব্যায়ামের সময় বাড়ানো নয়, দীর্ঘ সময় বসে থাকাও কমানো জরুরি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন বসে থাকার সময় মাত্র ৩০ মিনিট কমাতে পারলে পুরো জনগোষ্ঠীর অকালমৃত্যু প্রায় ৭ শতাংশ কমতে পারে।
কারণ দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ এবং অকালমৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গবেষকদের মতে, একসঙ্গে বড় পরিবর্তন আনার চেয়ে ধীরে ধীরে অভ্যাস তৈরি করাই বেশি কার্যকর। নিজের সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী শুরু করে সময়ের সঙ্গে শারীরিক কার্যকলাপের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে।
ব্যায়ামের ‘নাস্তা’
ব্যায়াম মানেই জিমে গিয়ে এক ঘণ্টা সময় কাটানো— এমন ধারণাও বদলে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’-এর ধারণা। অর্থাৎ দিনের বিভিন্ন সময়ে কয়েক মিনিট করে ছোট ছোট শারীরিক কার্যকলাপ করা।
এটি হতে পারে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা, জোরে ঘর পরিষ্কার করা, রান্নাঘরে গানের সঙ্গে নাচা কিংবা অল্প সময় দ্রুত হাঁটা। মূল কথা হলো এমন কিছু করা, যাতে হৃদস্পন্দন কিছুটা বেড়ে যায়।
এ ধরনের ছোট ছোট শারীরিক কার্যকলাপ হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যের উন্নতি করতে পারে। বয়স্কদের ক্ষেত্রে এগুলো পেশির সহনশীলতা বাড়াতেও সহায়তা করতে পারে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এগুলো আলাদা করে ব্যায়ামের সময় বের না করেও দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
যুক্তরাজ্যের আলস্টার ইউনিভার্সিটির ব্যায়াম ও স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক মেরি মারফির মতে, অল্প অল্প করে ব্যায়াম করলে দিনের বিভিন্ন সময়ে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়। ব্যায়াম শেষ করার পরও কিছু সময় শরীরের বিপাকক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে।
ছোট অভ্যাসেই বড় পরিবর্তন
শারীরিক কার্যকলাপ বাড়াতে সব সময় বড় পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় ছোট একটি ইঙ্গিতও মানুষের অভ্যাস বদলে দিতে পারে। যেমন লিফট বা চলন্ত সিঁড়ির পরিবর্তে সিঁড়ি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া কিংবা গাড়ি গন্তব্যের কাছাকাছি না রেখে কিছুটা দূরে পার্ক করা।
যুক্তরাজ্যের লফবোরো ইউনিভার্সিটির আচরণগত চিকিৎসাবিজ্ঞানের অধ্যাপক আমান্ডা ডেলি এ ধরনের ছোট ছোট কার্যকলাপকে ‘স্ন্যাকটিভিটি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নিয়মিত করতে করতে এসব কাজ একসময় অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন আলাদা করে চিন্তা না করেও মানুষ বেশি নড়াচড়া করতে শুরু করে।
হাঁটার ক্ষেত্রেও একই বিষয় প্রযোজ্য। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পদক্ষেপ হাঁটতেই হবে— এমন ধারণা সব সময় প্রয়োজনীয় নয়। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫১৭ থেকে ২ হাজার ৭৩৫ পদক্ষেপ হাঁটলেও হৃদরোগের ঝুঁকি ২ হাজার পদক্ষেপের তুলনায় ১১ শতাংশ কমতে পারে।
নিজের মতো করে শুরু করুন
শারীরিক কার্যকলাপের ধরনও হতে পারে একেবারেই নিজের পছন্দমতো। কেউ চাইলে নাচের ক্লাসে যেতে পারেন, কেউ রক ক্লাইম্বিং করতে পারেন। আবার কেউ উচ্চতীব্রতার ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরচর্চা করতে পারেন। এসব কার্যকলাপ রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করার পাশাপাশি শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুরু করার জন্য এত কিছুই প্রয়োজন নেই।
টেলিভিশন দেখার সময় কয়েকটি স্কোয়াট করা যেতে পারে। রান্না শেষ হওয়ার অপেক্ষায় কয়েকবার লেগ কিক করা যেতে পারে। ফোনে কথা বলার সময় বসে না থেকে হাঁটা যায়। কাছাকাছি জায়গায় গাড়ি না নিয়ে হেঁটে যাওয়া যায়। সিঁড়ি ব্যবহারের অভ্যাস করা যায়।
এসব হয়তো আলাদা করে দেখলে খুব ছোট ছোট কাজ। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে এগুলো যোগ হতে হতে তৈরি করতে পারে একটি বড় পরিবর্তন।
তাই ব্যায়ামের জন্য দীর্ঘ সময় বের করতে না পারলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। পাঁচ মিনিট দিয়ে শুরু করাই হতে পারে ভালো শুরু। কারণ সুস্থ থাকার পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো দীর্ঘ সময়ের কঠিন ব্যায়াম নয়—বরং প্রতিদিন একটু একটু করে নড়াচড়া করার অভ্যাস ধরে রাখা।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.