আমেরিকায় রেকর্ড হারে বাড়ছে ভারত-বিদ্বেষ

আমেরিকার রাজনীতিতে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের জয়জয়কার যত বাড়ছে, ঠিক ততটাই দ্রুত হারে যেন বিষাক্ত হয়ে উঠছে বর্ণবিদ্বেষের আবহ। খোদ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের স্ত্রী এবং মার্কিন সেকেন্ড লেডি ঊষা ভ্যান্সের ভারতীয় ও হিন্দু পরিচয় নিয়ে সম্প্রতি শুরু হওয়া কুরুচিকর আক্রমণ এই বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক সেনেট প্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদের এক তির্যক মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়ে সম্প্রতি ভ্যান্স একটি নির্বাচনী প্রচারসভায় সাফ বলেছেন, তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে কথা বলার যোগ্যতা সায়েদের নেই। তবে বিরোধীদের আক্রমণের চেয়েও ভ্যান্স ও ঊষার জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন আমেরিকার কট্টর শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা, যাদের অনেকেই রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক বলয়ে অবস্থান করছেন।

দ্বিতীয় দফায় ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকেই আমেরিকায় ভারতীয় তথা দক্ষিণ এশীয়দের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও বর্ণবিদ্বেষের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। মার্কিন নজরদারি সংস্থা ‘স্টপ এএপিআই হেট’-এর সাম্প্রতিক এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয়দের নিশানা করে অবমাননাকর শব্দের ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ১০৯ শতাংশ। ২০২৫ সালেই আমেরিকার প্রাপ্তবয়স্ক দক্ষিণ এশীয়দের প্রায় ৪৮ শতাংশ কোনও না কোনও  ধরনের বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ১৪ শতাংশের অভিজ্ঞতা ছিল শারীরিক হেনস্থার। এফবিআই-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সমগ্র এশীয়দের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক অপরাধ সামান্য কমার কথা বলা হলেও, শিখ ও হিন্দুদের ওপর আক্রমণের ঘটনা যথাক্রমে ২৪.৬ শতাংশ ও ১২ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

 

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হল, রাজনৈতিক পরিচয় বা দলমতের পার্থক্য দিয়েও ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা এই বিষাক্ত আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। রিপাবলিকান ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি ও ওহায়োর গভর্নর পদপ্রার্থী বিবেক রামাস্বামী কিংবা এফবিআই ডিরেক্টর কাশ প্যাটেল থেকে শুরু করে নিউ ইয়র্কের নতুন ডেমোক্র্যাট মেয়র জোহরান মামদানি—সবাইকেই সমাজমাধ্যমে প্রতিনিয়ত জাতপাত ও ধর্ম তুলে গালাগালির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর অন্ধ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ডানপন্থী ভাষ্যকার দীনেশ ডি’সুজাকেও এখন শুনতে হচ্ছে ‘ভারতে ফিরে যাও’-এর মতো কটূক্তি।

এই চরম বিদ্বেষের মূল উৎস হিসেবে উঠে আসছে ২৭ বছর বয়সী নব্য-নাৎসি ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী নেতা নিক ফুয়েন্তেস এবং তার ‘গ্রয়পার’ আন্দোলনের নাম। ট্রাম্পের রাজনৈতিক বলয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা এই কট্টরপন্থী নেতা ঊষা ভ্যান্সকে বিয়ে করার দায়ে জেডি ভ্যান্সকে ‘শ্বেতাঙ্গ জাতির বিশ্বাসঘাতক’ বলে আক্রমণ করতেও দ্বিধা করেননি। সমাজমাধ্যমে ভারতীয়দের কটাক্ষ করতে ‘জিত’ বা ‘পাজিত’-এর মতো চরম আপত্তিকর শব্দ ব্যবহারকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করার চেষ্টা চালাচ্ছে এই গোষ্ঠী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষাক্ত ঘৃণার পেছনে রয়েছে একাধিক আর্থ-সামাজিক কারণ। ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা আমেরিকার প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফল এবং আর্থিকভাবে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম। কিন্তু অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কড়াকড়ি, এইচ-১বি (H-1B) ভিসা বিতর্ক এবং শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানদের কাজ কেড়ে নেওয়ার মিথ্যা অভিযোগ এই বিদ্বেষকে মারাত্মকভাবে উসকে দিয়েছে। এর সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলারের অভিবাসন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য এবং আমেরিকার অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আগুনে ঘি ঢেলেছে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল এই ঘৃণা ছড়িয়ে পড়ার পরও রাজনৈতিক শীর্ষ নেতৃত্বের নীরবতা। খোদ ট্রাম্প অতীতে ফুয়েন্তেসকে তাঁর ফ্লোরিডার বাসভবনে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং সাম্প্রতিক অতীতেও তাঁর মতো কট্টরপন্থীদের বক্তব্যের প্রকাশ্য নিন্দা করেননি। অন্যদিকে জেডি ভ্যান্স নিজের পরিবার আক্রমণের মুখে পড়লে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ঠিকই, কিন্তু নিজের দলের সমর্থকদের একটা বড় অংশের এই অন্ধ ভারত-বিদ্বেষ নিয়ে কার্যত চোখ বুজে রয়েছেন। সফলতার শীর্ষে পৌঁছা সত্ত্বেও আজকের আমেরিকায় ভারতীয়দের যেভাবে নিজেদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার জন্য শঙ্কিত হতে হচ্ছে, তা সে দেশের বহুত্ববাদী ভাবমূর্তির ওপর এক গভীর ক্ষত তৈরি করছে। সুত্র : আজকাল ।


Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.