নেপালের ত্রিশূলী ৩-এর সুড়ঙ্গ থেকে ভেসে এল আটকে পড়া শ্রমিকদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর

ভয়াবহ হড়পা বানের তাণ্ডবের এক ভয়াবহ সাক্ষী নেপাল। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি নেপালের রাসুয়া জেলার ত্রিশূলী ৩। এখানেই রয়েছে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। ত্রিশূলী নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত এই কৌশলগত সাবস্টেশনটি আকস্মিক বন্যায় সম্পূর্ণ জলের নীচে তলিয়ে যায়। ফলে তার ভেতরে আটকা পড়া কর্মীদের নিয়ে গত কয়েক দিন প্রবল অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তবে, কয়েক ঘন্টা আগে সুড়ঙ্গের গভীর থেকে ভেসে এসেছে ক্ষীণ কণ্ঠস্বর! যা ঘিরেই আশার আলো। আটকেপড়া কর্মীদের বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশা জেগে উঠেছে।

২৬ আগস্টের সেই দুর্যোগের পর থেকে ত্রিশূলী-৩এ অবস্থিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্তত ৪০ জন কর্মী নিখোঁজ। এছাড়া দেশটির অন্তত ছয়’টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৯০০ কর্মী নিখোঁজ রয়েছেন।

 

শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির আইনপ্রণেতা শ্রী রাম নেউপানে (যিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার এবং শুরু থেকেই উদ্ধারকাজে যুক্ত আছেন) জানান যে- সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে একাধিক ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছে। তিনি বলেন, “উদ্ধারকারী দলের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী- ভেতর থেকে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা গিয়েছে। উদ্ধারকারী দল যখন বলে, ‘আতঙ্কিত হবেন না, আমরা আপনাদের উদ্ধার করছি’, তখন ভেতর থেকে সাড়া পাওয়া যায়।”

নেউপানে জানান, উদ্ধার অভিযানের অংশ হিসেবে নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর দল তাদের তৎপরতা জোরদার করেছে এবং সুড়ঙ্গের ভেতরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, “সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে মানুষের কথা বলার খবর পাওয়াটা একটি আশাব্যঞ্জক লক্ষণ।” তিনি আটকা পড়াদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

নেউপানে এই অভিযানে যুক্ত নেপালি সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ, কারিগরি দল এবং অন্যান্য উদ্ধারকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং আশা করেন যে শীঘ্রই “নিরাপদে উদ্ধারের সুখবর” পাওয়া যাবে।

ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো, খারাপ আবহাওয়া এবং ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোতে পৌঁছানোর জটিলতার কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হলেও, নেপালি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী সুড়ঙ্গে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।

ভূগর্ভস্থ পথ আটকে থাকা কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করার জন্য ভারী যন্ত্রপাতি ও বিশেষ সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। তবে আশার এই আলোর মাঝে, আরেকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে এক মর্মান্তিক ঘটনা সামনে এসেছে।

রাসুয়া লাংটাং খোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে চলমান উদ্ধার অভিযানের সময় নেপালি সেনাবাহিনীর একটি দল সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে দু’জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছে। উদ্ধারকর্মীরা সুড়ঙ্গের পথ ধরে প্রায় ১৫০ মিটার ভেতরে এগোতেই মেলে মৃতদেহ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে নিয়োজিত ৪১ জনের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আটকে পড়াদের কাছে পৌঁছানোর জন্য উদ্ধারকারী দল যখন আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁদের পরিবার এক চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

বাইরে অপেক্ষমান পরিবারগুলোর কাছে পরিস্থিতির প্রতিটি নতুন খবর আশা ও আশঙ্কার এক মিশ্র অনুভূতি বয়ে আনছে।

‘ত্রিশূলি ৩এ’ প্রকল্পে আটকা পড়া কর্মীদের স্বজনরা নিজেদের প্রিয়জনদের বিষয়ে তথ্যের সন্ধানে সরকারি দপ্তর ও সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে ছোটাছুটি করছেন। উদ্ধারকাজ চলাকালীন অনেকে আবার দুর্ঘটনাকবলিত এলাকাগুলোর দিকেও রওনা হয়েছেন।

প্রকল্পের ভেতরে আটকা পড়া এক ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী জানান, বেশ কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির খুব একটা উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তবুও কর্মীরা শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরবেন- এমন আশাই আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁরা। শুক্রবার পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,২৫৯-এ এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫,০৫৩ জন।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from শুদ্ধস্বর ডটকম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading