মিল- অমিল, দূরত্ব অতঃপর কৃষ্ণগহ্বর

“জলের শ্যাওলা”- ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির দূরত্ব প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার। (আকাশপথে সরলরেখা)।
কিয়েভ এবং মস্কো ৭৫০ কিলোমিটার এবং পড়শী দেশ।
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মানুষের মধ্যে ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম, খাদ্যাভ্যাস ও লোকসংস্কৃতি সবই একই এবং গভীর মিল। শুধুমাত্র মিল বললে মারাত্মক ভুল হবে কেননা ইউক্রেন ও রাশিয়ার জনমানুষেরা দেখতেও এক, ভাষাও এক (একই ভাষাপরিবারের ভাষা), এমনকি গলার কন্ঠস্বর ও খাদ্যাভ্যাসও একই।
কেন আমি ইউক্রেন আর রাশিয়ার মিল- অমিল বা পড়শী ইত্যাদি উল্লেখ করছি?
এই প্রশ্নের উত্তর একটি ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বললে বুঝতে সুবিধের হবে।
আমেরিকা কি বন্ধুত্বের খাতিরে ইউক্রেনকে যুদ্ধে সহযোগিতা করেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর না দিলেও চলবে নিশ্চয়ই কারণ এমন প্রশ্নের উত্তর শিশু বা পাগলেও জানে কেননা আমেরিকা বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডে একমাত্র ইসরাইল ছাড়া কারো বন্ধু রাষ্ট্র নয়। তাহলে স্বাভাবিক প্রশ্ন জাগে, ইউক্রেনকে রক্ষা করার নামে আমেরিকা কায়দা করে ফয়দা লুটেছে কি? কি সেই ফয়দা?
সর্বপ্রথম হলো স্বার্থ। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ অতঃপর একে একে রাশিয়াকে সামরিকভাবে দুর্বল রাখা, ইউরোপে NATO-র নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী কর, মার্কিন অস্ত্রশিল্প বড় বাজার পাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি যা মোটাদাগে এগুলো সব যুদ্ধকালীন সময়ে নিশ্চয়ই সবাই পত্র- পত্রিকায় পড়ে থাকবেন।
পত্র পত্রিকায় আরও পড়ে থাকবেন, যুক্তরাষ্ট্রের মোট যুদ্ধ-সম্পর্কিত বরাদ্দ $ ১৯৫ বিলিয়ন ডলার ছিল এবং তার মধ্যে সরাসরি ইউক্রেনকে সহায়তা প্রায় $ ১২৭ বিলিয়ন ডলার। তাহলে প্রশ্ন জাগে মনে, যুক্তরাষ্ট্রতো দিয়েই গেছে। লাভ বা মুনাফা করেনি। কত বড় হৃদয়ের যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই?
অত সহজভাবে না ভাবুন। পত্র পত্রিকায় একটি খবর পড়ে থাকবেন, “যুক্তরাষ্ট্র–ইউক্রেনের খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ চুক্তির কথা” (বিষয়টি এখানে আর লিখছি না), এমনকি একটি ভিডিও চিত্রও সবাই দেখে থাকবেন কিভাবে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে শাসাচ্ছিল? এটাতো গেলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ফয়দার কথা।
আসুন সামান্য একটু ভিন্ন ফয়দা দেখি:
যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ক্ষয় করা তবে সরাসরি রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে না জড়িয়ে। ইউক্রেনের মাধ্যমে রাশিয়ার বিপুল সামরিক সরঞ্জাম, জনবল ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ক্ষয় হয়েছে, “এটাই মার্কিন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধের হিসেবে বলে দেখা হয়”। ভিন্ন পরাশক্তিকে সামরিকভাবে দূর্বল করে দেওয়া সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সামরিক কৌশল থাকে নিজেদেরকে বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সবচাইতে বড় পরাশক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে। এই কাজটির জন্য যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বেশ পারদর্শী। অন্যান্য ফয়দার বিষয় উপরেই উল্লেখ করেছি।
এছাড়াও একটি ভিন্ন ফয়দা যুক্তরাষ্ট্র করেছে, যা খুব বেশি লেখায় খুঁজে পাওয়া ভার। অস্ত্রের একটা অংশ মার্কিন কোম্পানির কাছ থেকে ইউক্রেন কিনেছে তবে পুরোনো অস্ত্র ইউক্রেনকে দিয়ে সেই মজুত আবার নতুন অস্ত্র দিয়ে পূরণ করা হয়েছে, ফলে যুদ্ধের অর্থ মার্কিন অর্থনীতির একটি অংশে ঘুরে এসেছে। হিসেবটি ছোটোতো নয়ই উল্টো বিশাল ও প্রয়োজনীয় ফয়দা কেননা অস্ত্র বানিয়ে মজুদ রাখলেতো চলবে না যে। অস্ত্রের গুদাম বিক্রি করে খালি কর এবং নতুন অস্ত্র তৈরী করে গুদাম ভর। এই আলোচনা অনেক বড় আলোচনার বিষয়। এখানে করছি না।
লেখার শেষে একটু লক্ষ্য করুন আমি প্রথমেই ইউক্রেন ও মার্কিন মূল্লুকের দূরত্ব অতঃপর ইউক্রেন ও রাশিয়ার মিল ও অমিল উল্লেখ করেছি এবং ইউক্রেন যুদ্ধে মার্কিনিদের জড়ানোর কারণগুলো সুস্পষ্ট উল্লেখ করেছি। কেন করেছি? এই উত্তরটি নিজেদের মতন করে আপন বিবেকে ভেবে নিন। কেন ভাববেন এবং ভাবার কোন প্রয়োজন আদৌ আছে কি? কেননা ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধতো ইউরোপের যুদ্ধ যে। বর্তমান গ্লোবাল বিশ্বে কোন কিছু থেকেই নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখার কোন সুযোগ নেই এবং সে কারণেই ভাববার কথা লিখছি।
সহজভাবে ভাবুন, ১৮ কোটির গরীব বাংলাদেশের (জ্বি হা আমরা গরীব দেশ এবং ইহাই সত্য) মানুষের স্বাভাবিক ও মৌলিক সুযোগ সুবিধার বালাই বর্তমানে শূন্য। সেটা তেল- বিদ্যুত- গ্যাস থেকে শুরু করে আয়- রোজগার বা কর্মসংস্থান অথবা কঠিন শোনালেও পেটে ভাত নেই বললেও খুব বেশি বলা হবে না। তবে আমরা এমতাবস্থায়ও এক দেশ থেকে যুদ্ধ বিমান খরিদ করছি এবং আরেক দেশ থেকে বেশি দামে গমসহ বোয়িং বা আরও বহু কিছুই খরিদ করছি। স্বাভাবিক ভাবনায় ভাবুন, এই খরিদ আমরা বা আমাদের রাষ্ট্রের সরকার বিলাসিতা করার জন্য খরিদ করছে কি? আমাদের দেশ হঠাৎই বড় অর্থনীতির দেশ হয়ে গেছে কি? (ঋণের আলাপ এখানে করছি না) এমন শত প্রশ্ন সাধারণ জনগণের মনে নিশ্চিত ভাসে তবে জিজ্ঞেসার জায়গা নেই।
প্রশ্ন মনে ভাসতেই পারে, সরকার কি বোকার স্বর্গে আছে? এই প্রশ্নের উত্তরটি কঠিন নয়। না, সরকার বোকার স্বর্গে নেই বরং এভাবে ভাবুন ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ নামক দেশটি বাস্তবিক অর্থেই কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole) ঢুকে গেছে এবং আমাদের সরকার সেই কৃষ্ণগহ্বরের কালো মানিক ছায়া হয়ে ছুটছে এবং এই ছুটার শেষ কোথায় গিয়ে হয়? স্রেফ সময়ের অপেক্ষামান থাকুন এবং ভাবুন ৮ হাজার কিলোমিটার দূর থেকে মার্কিনিদের ডেকে এনে ইউক্রেনের কি লাভ হলো? আচ্ছা, বাংলাদেশ থেকে মার্কিন মূল্লুকের দূরত্ব কত? উত্তরটি হবে শূণ্য কিলোমিটার।
বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.