গাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কত পুরোনো—তার হিসাব হয়তো কোনো ক্যালেন্ডারে লেখা নেই। মানুষ যখন প্রথম আকাশের দিকে তাকিয়ে সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে আলো দেখেছিল, তখন থেকেই হয়তো গাছ তার নীরব সঙ্গী। সভ্যতা এগিয়েছে, নগর বেড়েছে, কংক্রিটের দেয়াল উঁচু হয়েছে, মানুষ প্রকৃতি থেকে ক্রমশ দূরে সরে গেছে; কিন্তু গাছের প্রতি মানুষের মমতা একেবারে হারিয়ে যায়নি। বরং কখনো কখনো সেই মমতাই মানুষকে নতুন কোনো শিল্পের জন্ম দিতে প্রেরণা দিয়েছে।
বাগান করা মানুষের সেই চিরচেনা ভালোবাসারই একটি রূপ। ছোটবেলায় স্কুলের রচনায় ‘বাগান করা’ নিয়ে দু-চার পৃষ্ঠা না লিখেছেন—এমন মানুষ বোধ হয় খুব বেশি নেই। কারও কাছে বাগান মানে ফুলের ঘ্রাণ, কারও কাছে ফলের গাছ, কারও কাছে দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষ সংগ্রহ। আবার এমন মানুষও আছেন, যাঁরা একটি গাছকে শুধু গাছ হিসেবে দেখেন না; তার মধ্যে দেখতে পান একটি দৃশ্য, একটি ইতিহাস, একটি জীবন, কখনো বা নিজেরই কোনো স্বপ্ন।
বনসাই সেই স্বপ্নেরই এক আশ্চর্য শিল্পরূপ।
একটি বিশাল বৃক্ষকে তার স্বাভাবিক বিস্তার থেকে ক্ষুদ্র পরিসরে এনে একটি পাত্রের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখা—প্রথম শুনলে ব্যাপারটি খানিকটা উদ্ভট বলেই মনে হতে পারে। যে গাছ প্রকৃতিতে আকাশ ছুঁতে চায়, তাকে কেন ছোট্ট একটি পাত্রে বন্দি করে রাখা হবে? কিন্তু একটু গভীরে তাকালেই বোঝা যায়, বনসাই কোনো গাছকে বন্দি করার শিল্প নয়; বরং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক দীর্ঘ, ধৈর্যশীল ও সৃজনশীল কথোপকথন।
‘বনসাই’ শব্দটির সঙ্গে জাপানের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। জাপান এই শিল্পকে নান্দনিকতা, দর্শন ও শৈল্পিক পরিপূর্ণতার এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কিন্তু বনসাইয়ের শিকড় আরও পুরোনো। প্রায় দুই হাজার বছর আগে চীনে পাত্রে ক্ষুদ্রাকৃতির গাছ লালন ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ তৈরির চর্চা শুরু হয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে জাপানের জেন বৌদ্ধধারার প্রভাবে এই শিল্প নতুন এক দর্শন ও সৌন্দর্য লাভ করে।
একটি বনসাই তাই শুধু ছোট গাছ নয়। তার কাণ্ডে সময়ের রেখা থাকে, শাখায় থাকে শিল্পীর কল্পনা, পাতায় থাকে ঋতুর পরিবর্তন, আর তার শিকড়ে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার গল্প। একটি পূর্ণাঙ্গ বনসাই তৈরি হতে কখনো বছরের পর বছর, কখনো কয়েক দশক পর্যন্ত সময় লাগে। শিল্পীকে অপেক্ষা করতে হয়—গাছের জন্য, সময়ের জন্য, নিজের স্বপ্নের পরিণতির জন্য।
বাংলাদেশে বনসাই শিল্পের প্রসার তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এর প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। শহরের ছোট্ট বারান্দা কিংবা ছাদের এক কোণে একটি বনসাই যেন নাগরিক জীবনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রকৃতির একটি ক্ষুদ্র দরজা খুলে দেয়। চারপাশে যখন কংক্রিট, যানবাহন আর যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা, তখন একটি বনসাইয়ের দিকে তাকিয়ে মানুষ হয়তো এক মুহূর্তের জন্য ফিরে যেতে পারে সেই সবুজ পৃথিবীতে, যেখানে বাতাসেরও নিজস্ব গন্ধ ছিল।
এই সবুজের টানেই বহু বছর আগে এক মানুষ নিজের জীবনকে বনসাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছিলেন। তিনি মনির উদ্দিন আহমেদ।
মনির উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আমার পরিচয়ের স্মৃতি আজও আমার কাছে উজ্জ্বল। আশির দশকে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। বিদেশের মাটিতে থেকেও তাঁর মন পড়ে থাকত বাংলাদেশের প্রকৃতির কাছে। ফ্রাঙ্কফুর্টের আধুনিক নগরজীবন, সাজানো রাস্তা, শৃঙ্খলিত নাগরিক পরিবেশ—সবকিছুর মধ্যেও তাঁর ভেতরে যেন সারাক্ষণ বয়ে চলত বাংলাদেশের সবুজের বাতাস।
বাংলাদেশের মাটি, গাছ, নদী, ঋতু—এসব তাঁর কাছে শুধু স্মৃতি ছিল না; ছিল এক গভীর টান। মনে হতো, তিনি বিদেশে থেকেও যেন নিজের দেশের প্রকৃতির সঙ্গে নীরবে কথা বলছেন।
জার্মানিতে তাঁর মন বসেনি।
শেষ পর্যন্ত তিনি ফিরে এলেন বাংলাদেশের কাছে। ফিরে এলেন সেই প্রকৃতির কাছে, যে প্রকৃতিকে তিনি দূরদেশে থেকেও ভুলতে পারেননি। কিন্তু দেশে ফিরে তিনি শুধু গাছ লাগিয়ে থেমে থাকলেন না। শুরু করলেন প্রকৃতিকে নিজের ঘরে নিয়ে আসার এক দীর্ঘ অনুসন্ধান। বনসাই হয়ে উঠল সেই অনুসন্ধানের পথ।
তারপর শুরু হলো এক দীর্ঘ সাধনা।
বনসাইয়ের জগৎ সহজ কোনো জগৎ নয়। এখানে তাড়াহুড়োর কোনো জায়গা নেই। একটি ডালকে একটু বাঁকাতে হয়, তারপর অপেক্ষা করতে হয়। শিকড়কে ছাঁটতে হয়, আবার অপেক্ষা। নতুন পাতা আসার জন্য অপেক্ষা, নতুন শাখা গজানোর জন্য অপেক্ষা। কখনো একটি গাছ শিল্পীর প্রত্যাশামতো সাড়া দেয়, কখনো দেয় না। তবু শিল্পী হাল ছাড়েন না।
মনির উদ্দিন আহমেদও ছাড়েননি।
বছরের পর বছর তিনি গাছের সঙ্গে থেকেছেন, গাছকে দেখেছেন, বুঝেছেন, পরীক্ষা করেছেন। গাছের শরীরের ভাষা পড়তে শিখেছেন। কোন ডাল কোথায় যাবে, কোন শাখা বেঁচে থাকবে, কোন অংশ বাদ দিতে হবে, কীভাবে একটি গাছের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে অক্ষুণ্ণ রেখে তাকে শৈল্পিক রূপ দেওয়া যায়—এসব নিয়ে তাঁর নিরন্তর গবেষণা ও চর্চা তাঁকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
তাঁর কাছে বনসাই এখন আর শখ নয়।
এটি তাঁর জীবন।
প্রতিটি বনসাইকে তিনি যেন নিজের সন্তানের মতো লালন করেন। একটি গাছের অসুখ হলে তাঁর মন খারাপ হয়, নতুন কুঁড়ি এলে তাঁর চোখে আনন্দের আলো ফুটে ওঠে। কোনো শাখা প্রত্যাশামতো বেড়ে উঠলে তিনি সেখানে নতুন সম্ভাবনা দেখতে পান। একটি গাছের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সৌন্দর্যও কীভাবে গভীরতর হয়—সেটি তিনি অনুভব করেন একজন শিল্পীর চোখে, আবার একজন অভিভাবকের মমতায়।
সারাদিন তাঁর জগৎ বনসাইকে ঘিরে। গাছের সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্ক কখন যে শিল্পীর সম্পর্ক ছাড়িয়ে আত্মীয়তার সম্পর্কে পরিণত হয়েছে, তা হয়তো তিনিও টের পাননি।
মনির উদ্দিনের বনসাইয়ের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি শুধু গাছকে ছোট করেননি; বরং ছোট্ট একটি পাত্রের মধ্যে বড় এক পৃথিবীকে ধারণ করেছেন। তাঁর কল্পনায় একটি গাছ কখনো হয়ে ওঠে ঝড়-জল পেরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাচীন বৃক্ষ, কখনো বাংলাদেশের গ্রামবাংলার পরিচিত কোনো দৃশ্যের স্মারক, আবার কখনো হয়ে ওঠে নিঃসঙ্গ অথচ দৃঢ় কোনো জীবনের প্রতীক।
এখানেই তাঁর শিল্পের বিশেষত্ব।
তিনি প্রকৃতিকে অনুকরণ করেন না; প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করে তার ভেতর থেকে সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন।
বনসাই শিল্পীর সবচেয়ে বড় গুণ হয়তো ধৈর্য। কারণ এই শিল্পে আজ বীজ বুনে কাল ফল পাওয়ার সুযোগ নেই। এখানে সময়ই সবচেয়ে বড় কারিগর। শিল্পী শুধু সেই সময়কে পরিচালনা করেন। গাছের সঙ্গে তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়, কখনো নিজের ইচ্ছাকে গাছের স্বভাবের কাছে সমর্পণ করতে হয়। প্রকৃতির সঙ্গে এই সমঝোতার মধ্যেই জন্ম নেয় শিল্প।
মনির উদ্দিন আহমেদের দীর্ঘ বনসাইযাত্রা তাই কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সাধনার গল্প নয়; এটি প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসারও গল্প। বিদেশের মাটিতে থেকেও যে মানুষটি বাংলাদেশের প্রকৃতিকে ভুলতে পারেননি, তিনি শেষ পর্যন্ত সেই প্রকৃতিকেই ক্ষুদ্র অথচ অপূর্ব এক শিল্পরূপে মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন।
আজ তাঁর নাম শুধু ঢাকার বনসাই অঙ্গনেই নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিত হয়ে উঠছে। তাঁর দীর্ঘ সাধনা ও নিরলস চর্চা অনেক মানুষকে বনসাইয়ের প্রতি আগ্রহী করেছে। সবচেয়ে বড় কথা, তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে অনেকেই নতুন করে উপলব্ধি করছেন—গাছ শুধু লাগানোর বিষয় নয়, গাছকে ভালোবাসারও বিষয়।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ঢাকার ধানমণ্ডিতে শুরু হতে যাচ্ছে মনির উদ্দিন আহমেদের তিন দিনব্যাপী বনসাই প্রদর্শনী। এই আয়োজন তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা, অভিজ্ঞতা ও সৃষ্টিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। যারা বনসাই ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বিশেষ আয়োজন। আর যারা বনসাইকে কেবল ছোট্ট টবে রাখা গাছ বলে ভাবেন, তাদের জন্যও এই প্রদর্শনী হয়তো একটি নতুন দরজা খুলে দেবে।
কারণ একটি বনসাইয়ের সামনে দাঁড়ালে শুধু তার আকৃতি দেখা যায় না; দেখা যায় সময়।
দেখা যায় অপেক্ষা।
দেখা যায় একজন মানুষের শ্রম, মমতা ও কল্পনা।
দেখা যায় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক আশ্চর্য বন্ধুত্ব।
সুদূর জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বসে মনির উদ্দিন আহমেদের এই উদ্যোগের কথা ভাবলে আমার নিজের মধ্যেও এক ধরনের আবেগ কাজ করে। বহু বছর আগে ফ্রাঙ্কফুর্টে যে মানুষটির মধ্যে বাংলাদেশের প্রকৃতির জন্য অদ্ভুত এক আকুলতা দেখেছিলাম, আজ তাঁর হাতেই সেই প্রকৃতির ভালোবাসা শিল্প হয়ে মানুষের সামনে দাঁড়িয়েছে—এ দৃশ্য নিঃসন্দেহে আনন্দের, গর্বের।
প্রবাসে বসে দেশের কথা মনে পড়লে মানুষ সাধারণত স্মৃতির কাছে ফিরে যায়। কেউ গান শোনেন, কেউ পুরোনো ছবি দেখেন, কেউ কবিতা পড়েন। মনির উদ্দিন আহমেদ একটু ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রকৃতিকে স্মৃতিতে আটকে রাখেননি; তাকে জীবন্ত করে নিজের কাছে ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁর বনসাইয়ের পাতায়, কাণ্ডে, শিকড়ে যেন বাংলাদেশেরই কোনো না কোনো গল্প লুকিয়ে আছে।
এই শিল্প আমাদের আরও একটি কথা মনে করিয়ে দেয়—বড় হওয়া মানেই বড় আকার নয়। ছোট্ট একটি গাছের মধ্যেও বিশাল এক পৃথিবী বাস করতে পারে। একটি ক্ষুদ্র বনসাইয়ের মধ্যে যেমন বহু বছরের ইতিহাস থাকে, তেমনি থাকে ভবিষ্যতেরও সম্ভাবনা। তাকে দেখতে হয় মন দিয়ে, বুঝতে হয় ধৈর্য দিয়ে।
মনির উদ্দিন আহমেদ সেই দেখার চোখ তৈরি করতে চান।
তাঁর বনসাই যেন তাঁর নিজেরই ভাষা—যে ভাষায় তিনি প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে কথা বলেন, নিজের শিকড়ের সঙ্গে কথা বলেন।
আজ যখন আমাদের চারপাশে গাছ কাটা হচ্ছে, সবুজ কমছে, নগরায়ণের চাপে প্রকৃতি সংকুচিত হচ্ছে, তখন বনসাইয়ের মতো একটি শিল্প আমাদের কাছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি অন্তত মনে করিয়ে দেয়—গাছকে ভালোবাসা যায়, গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায়, একটি গাছকে ঘিরে মানুষের জীবনেও সৌন্দর্য তৈরি হতে পারে।
মনির উদ্দিন আহমেদের বনসাই তাই শুধু তাঁর সৃষ্টি নয়; তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ আত্মকথা।
সেই আত্মকথার পাতায় আছে বাংলাদেশের সবুজ, আছে ফ্রাঙ্কফুর্টের স্মৃতি, আছে প্রবাসের অস্থিরতা, আছে দেশে ফিরে আসার আকুলতা, আছে বছরের পর বছর পরিশ্রম এবং সবচেয়ে বেশি আছে গাছের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা।
ধানমণ্ডির প্রদর্শনীতে তাঁর বনসাইগুলো যখন একসঙ্গে মানুষের সামনে দাঁড়াবে, তখন হয়তো দর্শক শুধু টবে সাজানো ছোট ছোট গাছ দেখবেন না। তাঁরা দেখতে পাবেন একজন মানুষের দীর্ঘ স্বপ্নের দৃশ্যমান রূপ।
আমি দূর জার্মানি থেকে আমার প্রিয় বন্ধু ও বনসাই শিল্পী মনির উদ্দিন আহমেদের এই মহৎ উদ্যোগকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। তাঁর তিন দিনের প্রদর্শনী সফল হোক, তাঁর শিল্প আরও বিস্তৃত হোক, নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা জাগুক—এই আমার আন্তরিক প্রত্যাশা।
প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার পথ কখনো কখনো খুব ছোট হতে পারে।
হয়তো একটি ছোট্ট পাত্রে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছের কাছেও।
আর সেই ছোট্ট গাছের মধ্যে যদি কেউ একটি পুরো বাংলাদেশকে দেখতে পান—তবে সেটিই তো শিল্পীর সবচেয়ে বড় সার্থকতা।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

