লুলার ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন : আমাজনের স্বস্তি, ট্রাম্পের অস্বস্তি

 

লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ডানপন্থার ক্রমবর্ধমান উত্থানের মধ্যে এক নাটকীয় নির্বাচনী প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতি হিসেবে চতুর্থবারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ২৫ অক্টোবরের নির্বাচনে প্রথম দফায় পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেছেন তিনি। ব্রাজিলের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, লুলা পেয়েছেন ৫১.৭৯ শতাংশ ভোট, আর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৪৮.২১ শতাংশ। ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪৪ লাখ। নিজের ৮১তম জন্মদিনের ঠিক দুই দিন আগে এই জয় শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং ব্রাজিলের গণতন্ত্র, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে থাকার পর মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে লুলার এই প্রত্যাবর্তনের পেছনে রয়েছে রাজপথের জনসমাবেশ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং তৃণমূল পর্যায়ে সমর্থকদের সক্রিয়তা। তাঁর প্রচারশিবির সাধারণ ভোটারদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর কৌশল গ্রহণ করে। বামপন্থী কর্মী, শ্রমজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রচারে নতুন গতি আনে। শেষ পর্যন্ত এই জনসমর্থন তাঁকে এমন একটি জয় এনে দিয়েছে, যা লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থী রাজনীতির অগ্রযাত্রার মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম।

জয়ের পর সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা নির্বাচনকে ‘অস্বীকারবাদ ও মিথ্যার পরাজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, তাঁর দেশ কারও ‘পেছনের উঠান’ হয়ে থাকবে না। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট। ওয়াশিংটনের চাপ কিংবা আন্তর্জাতিক শক্তির প্রভাবের কাছে ব্রাজিলের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে তিনি রাজি নন। তাঁর চতুর্থ মেয়াদে এই অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে লুলার এই বিজয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো আমাজন অরণ্যের ভবিষ্যৎ। পৃথিবীর বৃহত্তম গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনভূমি আমাজন শুধু ব্রাজিলের সম্পদ নয়; বৈশ্বিক জলবায়ুর ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণের জন্যও এটি অপরিহার্য। বন উজাড় অব্যাহত থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়বে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা।

লুলার তৃতীয় মেয়াদে আমাজন সংরক্ষণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ব্রাজিলের সরকারি উপগ্রহ-তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের তুলনায় আমাজনে বন উজাড় প্রায় ৭১ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত বন ধ্বংসের পরিমাণ নেমে এসেছে ৩ হাজার ৩৩৫ বর্গকিলোমিটারে, যা ১৯৮৮ সালে পর্যবেক্ষণ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন বার্ষিক পরিমাণ। অবৈধ বন উজাড়ের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদার, পরিবেশ আইন প্রয়োগ এবং সংরক্ষণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার ফলে এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

কিন্তু এখানেই লুলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমাজনের সুরক্ষায় তাঁর সরকারের সাফল্য সত্ত্বেও ব্রাজিলের আইনসভায় ডানপন্থী শক্তির প্রভাব বেড়েছে। ফলে পরিবেশ সংরক্ষণ, আদিবাসীদের ভূমির অধিকার এবং বনাঞ্চল রক্ষার আইন বাস্তবায়নে রাজনৈতিক বাধা আসতে পারে। বন উজাড় কমে যাওয়া ইতিবাচক হলেও অবৈধ খনন, কাঠ পাচার, দাবানল ও দীর্ঘস্থায়ী খরার ঝুঁকি দূর হয়নি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আমাজন যদি এমন এক সংকটসীমা অতিক্রম করে, যেখান থেকে বনভূমির বড় অংশ নিজস্ব আর্দ্রতা ও বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়, তবে তার পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী। তাই লুলার জয় আমাজনকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া এই নির্বাচনের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। লুলার বিজয়কে স্বাগত জানানোর পরিবর্তে ট্রাম্প বলেছেন, নির্বাচনটি তাঁর কাছে ‘কারচুপির মতো’ মনে হয়েছে। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। ব্রাজিলে ভোট গ্রহণের সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী লুলার জয়ের ব্যবধান ছিল প্রায় ৪৪ লাখ ভোট। অন্যদিকে পরাজিত প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারো প্রথমে ফল বাতিলের দাবি তুললেও তাঁর দল পরে নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াকে শুধু একটি নির্বাচনের ফল নিয়ে মন্তব্য হিসেবে দেখলে ভুল হবে। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, বাণিজ্যনীতি এবং ডানপন্থী রাজনৈতিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর সঙ্গে এই নির্বাচনের সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত বলসোনারো পরিবার ব্রাজিলে ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। ফলে লুলার বিজয় ওয়াশিংটনের পছন্দের রাজনৈতিক সমীকরণে ধাক্কা দিয়েছে। একই সঙ্গে ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও শুল্ক নিয়ে বিরোধ নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

বিশ্বের পরিবেশবাদী সংগঠন, জলবায়ু আন্দোলনের কর্মী এবং আদিবাসীদের অধিকার রক্ষাকারীরা লুলার বিজয়কে স্বস্তির ঘটনা হিসেবে দেখছেন। তাঁদের কাছে এটি শুধু একজন বামপন্থী নেতার জয় নয়, বরং আমাজন সংরক্ষণের নীতি অব্যাহত রাখার সুযোগ। আন্তর্জাতিক মহলে বন সংরক্ষণে অর্থায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্রাজিলের ভূমিকা নিয়েও নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে এই আশাবাদ নিঃশর্ত সমর্থন নয়। পরিবেশবাদীদের প্রত্যাশা, লুলা বন সংরক্ষণের পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাবেন এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আরও শক্তিশালী করবেন।

লুলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা। ৮১ বছর বয়সে চতুর্থবার রাষ্ট্রপতি হওয়া তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অসাধারণ অর্জন। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভ করা আর কার্যকরভাবে দেশ পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক বৈষম্য এবং আইনসভায় বিরোধীদের মোকাবিলা—সব ক্ষেত্রেই তাঁকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাঁর নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, এই মেয়াদই তাঁর শেষ রাষ্ট্রপতিত্ব হতে পারে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নির্ধারিত হবে আগামী চার বছরে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে।

সব মিলিয়ে, লুলার জয় ব্রাজিলের জন্য যেমন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার পরীক্ষা, তেমনি বিশ্বের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। ডানপন্থার উত্থান অনিবার্য নয়, জনমত পরিবর্তিত হতে পারে এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রে স্থান পেতে পারে। কিন্তু আমাজনকে রক্ষা করতে হলে শুধু রাষ্ট্রপতির সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর আইন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। লুলা এই দায়িত্ব পালনে সফল হবেন কি না, তার উত্তর দেবে সময়। আপাতত তাঁর বিজয় আমাজনের জন্য আশার আলো, আর ট্রাম্পপন্থী রাজনীতির কাছে এক অস্বস্তিকর বার্তা।

লেখক : হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.