(পঞ্চদশ পর্ব)
জাসদের জন্মের আগের দিনগুলো এখন ফিরে তাকালে আমার কাছে মনে হয়, সেগুলো ছিল অপেক্ষার দিন। আমরা তখন জানতাম, ছাত্রলীগের বিভক্তির পর একটি নতুন রাজনৈতিক পথ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই পথ কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তার কোনো স্পষ্ট মানচিত্র আমাদের হাতে ছিল না।
আমরা ছিলাম তরুণ। রাজনীতি করতাম আবেগ দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তখনও আমাদের অনেকের কাছে পরিষ্কার নয়। মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, শ্রেণিসংগ্রাম—এসব শব্দ আমাদের চারপাশে ঘুরছিল। সিনিয়র নেতারা বলতেন, আমরা নতুন সমাজ নির্মাণের পথে যাচ্ছি। আমরা বিশ্বাস করতাম।
কিন্তু নতুন রাজনৈতিক দল হবে—এই সিদ্ধান্তটি যে হঠাৎ করে কয়েকজন সিনিয়র নেতা নিয়ে নিলেন, এমনটা নয়। বরং এখন ফিরে তাকালে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে পড়ে। দল গঠনের আগে শীর্ষ নেতারা অপেক্ষাকৃত জুনিয়র নেতাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছিলেন। তাঁদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন।
একদিন ছাত্রলীগের সভাপতি শরীফ নুরল আম্বিয়া ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক মুশতাক হোসেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—
‘একটা রাজনৈতিক দল গঠন করলে কেমন হয়?’
মুশতাক হোসেনের উত্তর ছিল খুবই সরল—
‘আমরা ছাত্র সংগঠন নিয়েই থাকি। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দল গঠনের দরকার নেই।’
এই ছোট্ট কথাটির মধ্যে আমি পরে একটি বড় রাজনৈতিক শিক্ষা খুঁজে পেয়েছি।
সিনিয়র নেতারা চাইলে সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তাঁরা তা করেননি। তাঁরা বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের মতামত শুনেছেন, রাজনৈতিক দল গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আমাদের সেই সময় হয়তো বিষয়টির গুরুত্ব এতটা বুঝিনি। কিন্তু এখন মনে হয়, এটি ছিল তাঁদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মানসিকতার একটি দৃষ্টান্ত।
মুশতাক হোসেন নিজেও ছিলেন অসাধারণ এক তরুণ নেতা। ঢাকা কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক। তার আগের জীবনের কথাও আমাদের জানা ছিল। স্কুলজীবনে পাকিস্তানি শাসকদের চাপিয়ে দেওয়া ‘দেশকৃষ্টি’ ধরনের সাংস্কৃতিক ভাবনার বিরুদ্ধে আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল। খুব ভদ্র, লাজুক, মেধাবী—কিন্তু রাজনৈতিকভাবে সচেতন।
আমরা তখন এমন অনেক তরুণের সঙ্গে রাজনীতি করতাম, যাদের মধ্যে মতের পার্থক্য ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল গভীর।
নতুন দল গঠনের পর সেই সম্পর্কগুলোর অনেকগুলোই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরীক্ষা দিতে শুরু করল।
জাসদের জন্মের পর সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে বিভাজনের রেখা তৈরি হচ্ছিল, তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল। শুধু ছাত্রলীগ নয়, শ্রমিক রাজনীতিতেও তার প্রতিক্রিয়া পড়ল।
জাতীয় শ্রমিকলীগের মধ্যেও বিভাজন দেখা দিল।
রুহুল আমিন ভূঁইয়া এবং মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী অংশ জাসদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে বিবৃতি দিল। বিবৃতি দেওয়ার পরপরই তাঁদের গ্রেফতার করা হলো।
ঘটনাটি আমাদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
মেসবাহ উদ্দিন আহমেদের নাম আমাদের কাছে অপরিচিত ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের কঠিন সময়ে তিনি ভূমিকা রেখেছিলেন। ষাটের দশকে আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিসে যখন রাজনৈতিক কর্মীদের উপস্থিতি কমে গিয়েছিল, তখনও তিনি অফিসের বাতি জ্বালিয়ে রাখতেন—এমন গল্প আমরা শুনেছি।
সেই মানুষটিই স্বাধীনতার পর নতুন একটি রাজনৈতিক মতের সঙ্গে দাঁড়ানোর কারণে জেলে গেলেন।
আমাদের মনে প্রশ্ন জাগল—
এই কি সেই বাংলাদেশ, যার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি?
আমরা তো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম।
মত প্রকাশের অধিকার থাকবে।
রাজনৈতিক ভিন্নমত থাকবে।
কেউ সরকারের সমালোচনা করলে তাকে শত্রু ভাবা হবে না।
কিন্তু বাস্তবতা যেন ধীরে ধীরে অন্যদিকে হাঁটছিল।
স্বাধীনতার পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশছোঁয়া। একটি নতুন দেশ, নতুন পতাকা, নতুন মানচিত্র—সবকিছু যেন নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ দেখতে শুরু করল, পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর অনেক কিছুই রয়ে গেছে। পুরোনো আইন, পুরোনো ব্যবস্থা, পুরোনো আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি—সবকিছু একসঙ্গে বদলে যায়নি।
রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ক্ষেত্রেও সহনশীলতার জায়গা সংকুচিত হতে শুরু করল।
এই পরিবেশে জাসদের জন্ম শুধু একটি নতুন রাজনৈতিক দলের জন্ম ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি নতুন বিতর্কেরও সূচনা।
এরপর ঢাকার রাস্তাঘাট ও বিভিন্ন স্থাপনার নাম পরিবর্তন হতে লাগল।
জিন্নাহ এভিনিউ হয়ে গেল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ।
নামের এই পরিবর্তনও তখন আমাদের কাছে স্বাধীনতার নতুন পরিচয়ের প্রতীক ছিল।
এই বঙ্গবন্ধু এভিনিউতেই জাসদ তার কার্যালয়ের জন্য একটি অফিস নিল—৩৪ নম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউ।
একটি মজার বৈপরীত্য তখন আমাদের চোখে পড়ত।
জাসদের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের বিরোধী। তাঁকে আমরা ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে রাজনৈতিক সম্বোধন করতাম না। অথচ দলের অফিসের ঠিকানা লিখতে হলে আমাদের লিখতে হতো—
৩৪ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ।
রাজনীতির ভাষা আর প্রশাসনিক ঠিকানা—দুটো যেন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুই ভিন্ন বাস্তবতা।
প্রথম দিকে অফিসটির অবস্থা ছিল একেবারেই সাদামাটা।
বড় একটি অফিস।
কিন্তু নেই কোনো সুন্দর আসবাব।
নেই সারি সারি টেবিল।
নেই একরকমের চেয়ার।
নেই সাজানো-গোছানো কোনো রাজনৈতিক কার্যালয়ের চেহারা।
মেঝেতে সতরঞ্জি বিছানো।
তার ওপর নেতাকর্মীরা বসে আছেন।
কেউ গল্প করছেন।
কেউ রাজনৈতিক আলোচনা করছেন।
কেউ পত্রিকা পড়ছেন।
কেউ নতুন পরিচিতের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।
দৃশ্যটি আমার কাছে অনেকটা মিলাদ মাহফিলের মতো মনে হতো।
মনে হতো, সবাই যেন মেঝেতে বসে আছে—কিন্তু প্রত্যেকের চোখে অন্যরকম উত্তেজনা।
নতুন দল।
নতুন স্বপ্ন।
নতুন ভবিষ্যৎ।
অফিসে সিনিয়র নেতারাও আসতেন এবং অন্যদের সঙ্গে একইভাবে বসতেন। কোনো দূরত্ব চোখে পড়ত না।
কিছুদিন পর কয়েকটি চেয়ার এল।
কিন্তু সেগুলোও এক রকমের নয়।
একটির হাতল আছে, অন্যটির নেই।
কোনোটি পুরোনো, কোনোটি নতুন।
দেখে মনে হতো, কেউ হয়তো নিজের বাসা থেকে একটি চেয়ার এনে দিয়েছেন, কেউ বা আরেকটি।
কেউ টাকা দিয়ে আসবাব কিনে দিচ্ছে না, কেউ হয়তো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একটি পাটি এনে দিচ্ছে।
কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার—এই অগোছালো অফিসটিই অল্পদিনের মধ্যে প্রাণের কেন্দ্র হয়ে উঠল।
বিকেল তিনটার পর থেকেই মানুষের আনাগোনা বাড়তে শুরু করত।
চারটা বাজতে না বাজতেই অফিস সরগরম।
পাঁচটার দিকে মনে হতো, এখানে যেন কোনো মেলা বসেছে।
কেউ এসেছে পুরান ঢাকা থেকে।
কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।
কেউ নারায়ণগঞ্জ থেকে।
কেউ শ্রমিক সংগঠনের খবর নিয়ে এসেছে।
কেউ ছাত্রলীগের নতুন কমিটির কথা বলছে।
কেউ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তর্ক করছে।
আবার কেউ নিছক গল্প করছে।
আমিও প্রায় প্রতিদিনই সেখানে যেতাম।
নতুন দলটিকে আমরা শুধু বাইরে থেকে দেখছিলাম না—তার ভেতরের স্পন্দনও অনুভব করছিলাম।
একটি রাজনৈতিক দল জন্মের পর কীভাবে ধীরে ধীরে মানুষের মধ্যে নিজের জায়গা তৈরি করে, আমরা যেন তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
সেদিনগুলোর কথা মনে পড়লে মনে হয়, জাসদ তখন ছিল সদ্য জন্ম নেওয়া একটি শিশুর মতো।
তার কোনো পরিপাটি ঘর ছিল না।
নিজস্ব আসবাব ছিল না।
সংগঠনও পুরোপুরি গোছানো ছিল না।
কিন্তু তাকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা ছিল।
উৎসাহ ছিল।
আশা ছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, ছিল ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার স্বপ্ন।
আমাদের কাছে সেই স্বপ্নের মূল্য ছিল অনেক।
কারণ আমরা যুদ্ধ করে একটি দেশ পেয়েছি।
এবার আমরা চেয়েছিলাম সেই দেশের সমাজব্যবস্থাও বদলাবে।
শুধু পতাকা বদলাবে না—মানুষের জীবন বদলাবে।
শুধু মানচিত্র বদলাবে না—অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক বদলাবে।
শুধু শাসকের নাম বদলাবে না—শোষণের কাঠামো বদলাবে।
এই বিশ্বাস থেকেই আমরা নতুন দলের দিকে তাকিয়েছিলাম।
তবে নতুন দলের ভেতরেও যে কত মত, কত চিন্তা, কত আকাঙ্ক্ষা—তা তখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।
কেউ বিপ্লবের কথা বলছে।
কেউ গণতন্ত্রের কথা বলছে।
কেউ শ্রমিক-কৃষকের মুক্তির কথা বলছে।
কেউ ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার কথা বলছে।
আর আমরা তরুণ কর্মীরা সবকিছু শুনে মনে মনে নিজেদের ভবিষ্যৎ কল্পনা করছি।
৩৪ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সেই অফিসটি তাই আমাদের কাছে শুধু একটি কার্যালয় ছিল না।
এটি ছিল এক ধরনের রাজনৈতিক বিদ্যালয়।
সতরঞ্জির ওপর বসে আমরা রাজনীতি শিখেছি।
চায়ের কাপ হাতে তর্ক করেছি।
পত্রিকার খবর নিয়ে আলোচনা করেছি।
সিনিয়রদের কথা শুনেছি।
নিজেদের স্বপ্নের সঙ্গে অন্যের স্বপ্ন মিলিয়ে দেখেছি।
সেই সময় আমাদের কারও কাছে রাজনীতি পেশা ছিল না।
ছিল জীবন।
আমরা জানতাম না ভবিষ্যতে কে কোথায় থাকব।
কে নেতা হবে, কে কর্মী থাকবে, কে রাজনীতি ছেড়ে চলে যাবে—কিছুই জানতাম না।
শুধু জানতাম, আমরা একটি নতুন পথের যাত্রী।
আর সেই পথের শুরুটা ছিল অতি সাধারণ।
একটি বড়, প্রায় খালি অফিস।
মেঝেতে একটি সতরঞ্জি।
কয়েকটি অসমান চেয়ার।
আর তার চারপাশে অসংখ্য স্বপ্নবান তরুণ-তরুণী ও রাজনৈতিক কর্মী।
আজ এত বছর পর মনে হয়, ইতিহাসের অনেক বড় অধ্যায়ের শুরু আসলে এমনই সাধারণ দৃশ্যের মধ্য দিয়ে হয়।
সেদিন ৩৪ বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সেই অফিসে বসে আমরা হয়তো বুঝতে পারিনি—বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় মাত্র শুরু হয়েছে।
সামনে অপেক্ষা করছিল আরও সংঘাত, আরও উত্তেজনা, আরও স্বপ্ন, আরও হতাশা।
কিন্তু তখন?
তখন আমরা শুধু নতুন দলের জন্মের আনন্দে উজ্জীবিত।
আমাদের চোখে ভবিষ্যৎ ছিল উজ্জ্বল।
আর সেই ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আমরা প্রতিদিন বিকেলে জড়ো হতাম বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সেই সাদামাটা অফিসে।
সতরঞ্জির ওপর বসে।
এক কাপ চা হাতে।
মুখে বিপ্লবের কথা।
মনে এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
লেখক : হাবিব বাবুল
৭০ দশকের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ছাত্রলীগের সংগঠক
এই ধারাবাহিকতা চলবে।

