বিশ্বরাজনীতি এবং বিশ্বক্রীড়া—দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র হলেও একটি মৌলিক সত্য বারবার আমাদের সামনে তুলে ধরে। সেটি হলো, পৃথিবীতে কোনো শক্তিই চিরস্থায়ী নয়। যে শক্তিকে একসময় অপরাজেয় মনে হয়, সময়ের পরিবর্তনে তার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার যাদেরকে দীর্ঘদিন দুর্বল বা প্রান্তিক হিসেবে দেখা হয়েছে, তারাও একদিন নিজেদের সক্ষমতা দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে।
গত কয়েক বছরের ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সেই বাস্তবতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। একসময় ধারণা করা হতো, সুপারপাওয়ার রাষ্ট্রগুলো চাইলে অল্প সময়েই যেকোনো সামরিক কিংবা রাজনৈতিক সংকটের সমাধান করতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছবি দেখাচ্ছে। রাশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েও প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল শক্তি প্রদর্শনের পথেই এগোয়নি; শেষ পর্যন্ত কূটনীতি ও আলোচনার গুরুত্ব অস্বীকার করতে পারেনি। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, আধুনিক বিশ্বে শুধু সামরিক শক্তি বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। দৃঢ় মনোবল, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মবিশ্বাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একই শিক্ষা আমরা ফুটবল বিশ্বকাপেও দেখতে পাই। বিশ্বকাপ এখন আর কেবল ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশের একচেটিয়া মঞ্চ নয়। আফ্রিকার দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে নিজেদের শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। এশিয়ার দলগুলোও আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। লাতিন আমেরিকার তুলনামূলক ছোট দেশগুলোও বড় শক্তির বিপক্ষে চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। বিশ্ব ফুটবলের এই পরিবর্তন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—যোগ্যতা, পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ থাকলে ছোট দেশও বড় স্বপ্ন দেখতে পারে।
একসময় বিশ্বকাপে কিছু দেশের উপস্থিতিই ছিল আনুষ্ঠানিকতার মতো। আজ তারাই বড় বড় ফুটবল শক্তিকে হারিয়ে ইতিহাস লিখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মরক্কোর অসাধারণ সাফল্য শুধু আফ্রিকার নয়, গোটা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। একইভাবে প্যারাগুয়ে, উরুগুয়ে, ক্রোয়েশিয়া কিংবা অন্যান্য অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ বারবার প্রমাণ করেছে যে জনসংখ্যা বা অর্থনৈতিক শক্তি নয়, সঠিক পরিকল্পনাই আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় সাফল্যের প্রধান ভিত্তি।
এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশেরও শিক্ষা নেওয়ার আছে।
আমাদের দেশে ফুটবল নিয়ে আবেগের কোনো অভাব নেই। বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের অলিগলি, গ্রাম, শহর, ছাদ, মাঠ, বাজার—সবখানে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স কিংবা পর্তুগালের পতাকায় ভরে যায় দেশের আকাশ। রাত জেগে কোটি কোটি মানুষ খেলা দেখে, আনন্দ করে, তর্ক করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরগরম হয়ে ওঠে। কিন্তু এই উৎসবের মাঝখানে একটি প্রশ্ন খুব কমই উচ্চারিত হয়—বাংলাদেশ নিজে বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলবে কবে ?
এই প্রশ্নটি আসলে শুধু ফুটবল নিয়ে নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্ন।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় অতিক্রম করেছে। অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, সামাজিক উন্নয়নের বহু সূচকে আমরা বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছি। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ফুটবলে, আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে আমাদের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই হতাশাজনক। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও আমরা ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। অথচ আমাদের জনসংখ্যা, তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ফুটবলপ্রেমী মানুষের সংখ্যা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
প্রথমত, আমাদের ফুটবল পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অভাব রয়েছে। বিশ্বমানের ফুটবল একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য অন্তত পনেরো থেকে বিশ বছরের ধারাবাহিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিশু পর্যায় থেকে খেলোয়াড় গড়ে তোলা, স্কুলভিত্তিক প্রতিযোগিতা, জেলা ও বিভাগীয় লিগকে শক্তিশালী করা, আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচ তৈরির কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হয়।
দ্বিতীয়ত, আমাদের ক্রীড়া অবকাঠামো এখনও পর্যাপ্ত নয়। দেশের অধিকাংশ জেলায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নেই। অনেক মাঠ হারিয়ে গেছে নগরায়নের চাপে। শিশুরা খেলবে কোথায়? একটি ফুটবলপ্রেমী জাতির জন্য খেলার মাঠ বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ।
তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও পেশাদারিত্বের অভাব আমাদের অন্যতম বড় সমস্যা। ক্রীড়া সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে প্রায়ই এমন ব্যক্তিরা আসেন, যাদের ক্রীড়া উন্নয়নের চেয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফুটবল পরিচালনা কেবল নির্বাচনী রাজনীতির বিষয় হতে পারে না; এটি একটি বিশেষায়িত পেশাগত দায়িত্ব। আধুনিক ফুটবলের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, খেলোয়াড় উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব নয়।
চতুর্থত, আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব নেই; অভাব রয়েছে প্রতিভা খুঁজে বের করার এবং লালন করার। প্রত্যন্ত গ্রামে অসংখ্য মেধাবী কিশোর রয়েছে, যারা কখনও কোনো প্রশিক্ষকের চোখেই পড়ে না। অথচ ইউরোপ, জাপান কিংবা মরক্কোর মতো দেশগুলো হাজার হাজার স্কাউটের মাধ্যমে নিয়মিত প্রতিভা অনুসন্ধান করে।
বিশ্বের সফল দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা ফুটবলকে শুধু একটি খেলা হিসেবে দেখেনি; দেখেছে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে। জাপান নব্বইয়ের দশকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে আজ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল জাতিতে পরিণত হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার জনসংখ্যা বাংলাদেশের একটি বড় জেলার চেয়েও কম, তবুও তারা বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং সেমিফাইনাল খেলেছে। মরক্কো আফ্রিকার প্রথম দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। এসব সাফল্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা পরিকল্পনা, শৃঙ্খলা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা।
বাংলাদেশ কেন পারবে না?
এই প্রশ্নের উত্তর “পারবে না” হতে পারে না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে পারবে?
প্রথমেই প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ফুটবল রোডম্যাপ। রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তন হলেও যেন সেই পরিকল্পনা পরিবর্তিত না হয়। দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়মিত ফুটবল প্রতিযোগিতা বাধ্যতামূলকভাবে চালু করা দরকার। তৃতীয়ত, প্রতিটি বিভাগে আধুনিক ফুটবল একাডেমি এবং স্পোর্টস সায়েন্স সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। চতুর্থত, বিদেশি প্রশিক্ষক আনার পাশাপাশি দেশীয় কোচদের আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, করপোরেট খাতকে ফুটবলে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে, যাতে একটি টেকসই পেশাদার লিগ গড়ে ওঠে।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমরা যেন কেবল অন্য দেশের সাফল্যে উল্লাস না করি; নিজেদের সাফল্যের স্বপ্নও দেখি। বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের জার্সি পরে আনন্দ করার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেই আনন্দের পাশাপাশি যদি বাংলাদেশের জার্সি একদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখার স্বপ্ন না দেখি, তবে আমাদের ফুটবলপ্রেম অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
জাতীয় আত্মমর্যাদা শুধু অর্থনীতি কিংবা রাজনীতিতে নয়, ক্রীড়াক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠিত হয়। একটি দেশের পতাকা যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উড়ে, তখন সেটি শুধু একটি ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করে না; সেটি পুরো জাতির সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।
আজকের পৃথিবী আমাদের নতুন করে শিখিয়েছে—বড় শক্তির একচেটিয়া আধিপত্যের যুগ ধীরে ধীরে বদলাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান অর্জন করতে হলে মুখে বড় বড় দাবি করলেই হবে না; বাস্তব অর্জনের প্রয়োজন। সেই অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে ফুটবল।
তাই আজ প্রশ্নটি আবারও উচ্চারণ করা জরুরি—বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলবে কবে?
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল ফুটবল ফেডারেশনের নয়, ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নয়, সরকারেরও নয়; এটি সমগ্র জাতির কাছে ছুড়ে দেওয়া একটি প্রশ্ন। যে দিন আমরা এই প্রশ্নকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করব, সেদিন থেকেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার যাত্রা শুরু হবে।
স্বপ্ন দেখা সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী—যে জাতি স্বপ্ন দেখতে জানে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে, তাকে একদিন না একদিন সফল হতেই হয়। বাংলাদেশেরও সেই সামর্থ্য রয়েছে। এখন প্রয়োজন শুধু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, সৎ নেতৃত্ব, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং অদম্য জাতীয় ইচ্ছাশক্তি।
হয়তো আজ নয়, কালও নয়। কিন্তু যদি এখন থেকেই সঠিক পথে হাঁটা শুরু করি, তাহলে একদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকাও ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে উড়বে। সেদিন কোটি মানুষের উল্লাস হবে কেবল ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার জন্য নয়, নিজের দেশের জন্য। আর সেদিনই আমাদের বহুদিনের প্রশ্নের উত্তর মিলবে—বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবল খেলতে পেরেছে।
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

