বিশ্বকাপ ফুটবল এলেই স্মৃতির জানালাগুলো যেন একে একে খুলে যায়। টেলিভিশনের পর্দায় আজ বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নৈপুণ্য দেখতে দেখতে মন ফিরে যায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি পেছনে—সেই পূর্ব পাকিস্তানের দিনগুলোতে, যখন টেলিভিশন ছিল বিরল, আর ফুটবলের আনন্দের প্রধান ভরসা ছিল রেডিওর ধারাভাষ্য, গ্রামের মাঠ, আর কিশোরদের সীমাহীন কল্পনা।
আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট বছর আগের কথা। তখন পূর্ব পাকিস্তানে টেলিভিশনের প্রচলন হয়নি। বিশ্বের বড় বড় ফুটবল ম্যাচ কিংবা ঢাকার মাঠের উত্তেজনাপূর্ণ খেলার খবর মানুষ শুনত রেডিওতে। ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠস্বরই যেন চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলত খেলার প্রতিটি মুহূর্ত। সেই সময় খেলাধুলা শুধু বিনোদন ছিল না; এটি ছিল মানুষের আবেগ, আনন্দ, সামাজিক মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আমাদের গ্রামের নাম বরিসুর। ছোট্ট একটি গ্রাম, কিন্তু ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ছিল অসাধারণ। শিশু, কিশোর, যুবক—সবার জীবনেই ফুটবল ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। আমাদের মতো ছোটরা তখন চামড়ার ফুটবল কোথায় পাবে? তাই জাম্বুরা দিয়েই ফুটবল খেলতাম। সেই জাম্বুরা লাথি মেরে আমরা নিজেদের কল্পনায় কখনো তোরাব আলী, কখনো টিপু, কখনো আবার প্রতাপ হাজরা হয়ে যেতাম। খেলাটা ছিল নিখাদ আনন্দের। জয়ের চেয়ে বড় ছিল একসঙ্গে মাঠে নামার উচ্ছ্বাস।
আমাদের গ্রামের বড় ভাইরা প্রায়ই ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যেতেন। ফিরে এসে তাঁরা এমন প্রাণবন্তভাবে খেলার বর্ণনা দিতেন যে মনে হতো আমরাও যেন গ্যালারিতে বসে সবকিছু দেখেছি। তাঁদের মুখে শুনতাম সেই সময়ের কিংবদন্তি খেলোয়াড়দের নাম—তোরাব আলী, কালা মুসা, আলি নেওয়াজ, আইউব দার, কালা গফুর, পিণ্টু, টিপু, শান্তু এবং প্রতাপ হাজরা। আজও তাঁদের নাম স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।
প্রতাপ হাজরার কর্নার কিক নিয়ে তখন ছিল অসংখ্য গল্প। বলা হতো, প্রতাপ কর্নার নিলে আর টিপুর মাথায় বল পৌঁছালে গোল ঠেকানোর মতো গোলকিপার ঢাকায় নেই। হয়তো এসব কথার মধ্যে অতিরঞ্জন ছিল, কিন্তু সেই অতিরঞ্জনই ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসার প্রকাশ। খেলোয়াড়রা তখন শুধু মাঠের নায়ক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সাধারণ মানুষের স্বপ্ন ও গর্বের প্রতীক।
আমার নিজেরও দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল একদিন ঢাকা স্টেডিয়ামে গিয়ে সরাসরি খেলা দেখব। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছিল আমার বন্ধু রহমত উল্লাহর হাত ধরে। সে আমাদের মধ্যে খেলাধুলায় সবচেয়ে পারদর্শী ছিল। একদিন সে প্রস্তাব দিল, কয়েকজন মিলে ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাবে। তখন পূর্ব দিকের গ্যালারির টিকিটের দাম ছিল মাত্র চার আনা—এক টাকার চার ভাগের এক ভাগ। পশ্চিম দিকের গ্যালারির টিকিট ছিল আট আনা। আমাদের মতো গ্রামের ছেলেদের জন্য চার আনাও কম টাকা ছিল না।
রহমত উল্লাহ আমাদের একটি বিশেষ কৌশলও শিখিয়ে দিয়েছিল। যদি সবার টিকিট কেনার মতো টাকা না থাকে, তাহলে একজন টিকিটধারী সামনে থাকবে, বাকিরা তার পেছনে। গেট খোলার সময় ভিড়ের সঙ্গে ধাক্কা দিয়ে একসঙ্গে ঢুকে যেতে হবে। এই বুদ্ধি সে পেয়েছিল আমাদের এলাকার বড় ভাইদের কাছ থেকে। তখনকার দিনে এমন দুষ্টুমি অনেকেই করত, আর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আজকের মতো কঠোর ছিল না।
আমরা হেঁটে রওনা দিতাম জিঞ্জিরার উদ্দেশে। সেখান থেকে বড় গুদারা নৌকায় বিনা ভাড়ায় বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে সোয়ারিঘাটে পৌঁছাতাম। তারপর চকবাজার, নাজিমউদ্দিন রোড, বোরহানউদ্দিন কলেজের সামনে দিয়ে ফুলবাড়িয়া রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে গুলিস্তান এবং সেখান থেকে ঢাকা স্টেডিয়াম। আজকের প্রজন্মের কাছে এই পথচলা হয়তো কল্পনাতীত মনে হবে, কিন্তু আমাদের কাছে সেটিই ছিল এক রোমাঞ্চকর অভিযাত্রা।
সেদিন গেটে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। পরিকল্পনামতো ধাক্কাধাক্কি করে শেষ পর্যন্ত স্টেডিয়ামের ভেতরে ঢুকতে সক্ষম হয়েছিলাম। সেদিনের ম্যাচ ছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবের মধ্যে। দুই দলই তখন ঢাকার ফুটবলের শক্তিশালী নাম। হাজার হাজার দর্শকের উল্লাস, বাঁশির শব্দ, গ্যালারির ঢেউ, মাঠের উত্তেজনা—সব মিলিয়ে প্রথমবার সরাসরি ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতা আজও আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে।
তখন ঢাকা স্টেডিয়াম ছিল শুধু দেশীয় ফুটবলের কেন্দ্র নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু। থাইল্যান্ডের রাজবিথি ক্লাব আগা খান গোল্ড কাপে অংশ নিতে আসত। ইন্দোনেশিয়া, কোরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন দেশের দলও খেলতে আসত। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল কাছ থেকে দেখার সুযোগ তখন দেশের মানুষের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করত।
সেই সময় মোহামেডান ক্লাব ছিল এক আবেগের নাম। মোহামেডানের খেলার দিন পুরান ঢাকার বহু দোকান দুপুরের পরই বন্ধ হয়ে যেত। সবাই খেলা দেখতে চলে যেত। দল জিতলে মহল্লায় মহল্লায় কাওয়ালি গানের আসর বসত, পোলাও রান্না হতো, আনন্দ-উৎসব চলত গভীর রাত পর্যন্ত। ফুটবল তখন কেবল একটি খেলা ছিল না; এটি ছিল মানুষের উৎসব, সামাজিক বন্ধন এবং সম্মিলিত উচ্ছ্বাসের উপলক্ষ।
তবে আবেগের অন্য রূপও ছিল। সমর্থকদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক অনেক সময় মারামারিতে রূপ নিত। স্টেডিয়ামের আশপাশে সংঘর্ষ হলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করত। অনেক সময় সেই উত্তেজনা মহল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ত। এখন ফিরে তাকালে মনে হয়, আবেগ ছিল প্রবল, কিন্তু সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ফুটবল—রাজনীতি বা অন্য কোনো বিভাজন নয়।
আজকের বাংলাদেশে ফুটবল এখনও জনপ্রিয়। বিশ্বকাপ এলেই দেশের অলিগলি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে যায়। চায়ের দোকান থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই ফুটবল নিয়ে আলোচনা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দেশের নিজস্ব ফুটবল আর সেই উচ্চতায় নেই। একসময় যাঁরা ঢাকা স্টেডিয়াম মাতিয়ে রাখতেন, আজ তেমন তারকা খেলোয়াড় বা শক্তিশালী দল আমরা দেখতে পাই না। দেশের ফুটবল অবকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং প্রতিভা বিকাশে নানা সীমাবদ্ধতা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে।
তবু আশার জায়গা আছে। যে জাতি একসময় ফুটবলকে এত গভীরভাবে ভালোবেসেছে, সেই জাতির মধ্যে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা কখনো শেষ হয়ে যেতে পারে না। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ সংগঠন, তৃণমূল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং ফুটবলকে জাতীয় অগ্রাধিকারের জায়গায় নিয়ে আসার আন্তরিক উদ্যোগ। আমাদের অতীতই প্রমাণ করে, বাংলাদেশে ফুটবলের জন্য উর্বর মাটি রয়েছে।
বিশ্বকাপের প্রতিটি আসর তাই আমার কাছে শুধু একটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট নয়; এটি আমার শৈশবের দরজাও খুলে দেয়। মনে পড়ে জাম্বুরা দিয়ে খেলা, গ্রামের মাঠ, বড় ভাইদের গল্প, রহমত উল্লাহর সাহসী পরিকল্পনা, বুড়িগঙ্গা পার হওয়ার রোমাঞ্চ, চার আনার টিকিট, ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারি এবং হাজারো দর্শকের গর্জন। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, ফুটবলের ধরনও বদলেছে; কিন্তু স্মৃতির মাঠে সেই দিনগুলো আজও একই রকম সবুজ, একই রকম প্রাণবন্ত।
হয়তো সেই সময় আর কখনো ফিরে আসবে না। কিন্তু স্মৃতির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা সেই দিনগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়; এটি একটি সময়ের ইতিহাস, একটি সমাজের সংস্কৃতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবনের অনবদ্য স্মৃতির নাম।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম
ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি

