খামেনেীর কফিনের পাশের ছোট্ট কফিনই হয়ে উঠল শেষযাত্রার সবচেয়ে হৃদয়বিদারক প্রতীক

ইরানের প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্যে হাজার হাজার মানুষের ঢল, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, সামরিক সম্মান এবং রাজনৈতিক বার্তার ভিড়ের মধ্যেও একটি দৃশ্যই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন ফেলেছে। খামেনেইয়ের কফিনের পাশেই রাখা ছিল তাঁর মাত্র ১৪ মাসের নাতনি জাহরা মহাম্মদি গোলপায়েগানির ছোট্ট কফিন। সেই ছবিই এখন ইরানের শোকানুষ্ঠানের সবচেয়ে আবেগঘন প্রতীক হয়ে উঠেছে।

তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনেইয়ের মরদেহ শায়িত রয়েছে। সেখানে দেশের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা, সরকারি প্রতিনিধি, বিদেশি অতিথি এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেছেন। কালো পোশাকে শোকাহত মানুষ বুক চাপড়ে কাঁদছেন, ফুলে ঢেকে দিচ্ছেন কফিন। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও নজর কেড়েছে ছোট্ট জাহরার কফিন এবং তার পাশে রাখা একটি ছবি।

 

মাত্র ১৪ মাস বয়সী এই শিশুর শেষযাত্রার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক সংঘাত, সামরিক উত্তেজনা এবং রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের বাইরে এই ছবি যেন যুদ্ধের সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। বহু মানুষের মতে, এটি শুধু একটি রাষ্ট্রনেতার বিদায় নয়, বরং একটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকেরও প্রতিচ্ছবি।

খামেনেই এবং তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্য সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইজরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন বলে ইরান দাবি করেছে। সেই ঘটনার পর থেকেই গোটা দেশে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকপালন চলছে। সরকার এই শেষযাত্রাকে জাতীয় ঐক্য, বিপ্লবী চেতনা এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্রের শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তবে সেই সব রাজনৈতিক বার্তার মাঝেও শিশুটির ছোট্ট কফিন মানুষের মনে অন্যরকম আবেগ তৈরি করেছে।

ইরানজুড়ে এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন শহরে শোকমিছিলের আয়োজন করা হয়েছে। তেহরানের পর কোম, ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ পর্যন্ত ৯ জুলাই মাশহাদে খামেনেইকে সমাহিত করা হবে। বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পরিবহণ, থাকার ব্যবস্থা এবং খাবারেরও আয়োজন করেছে ইরান সরকার।

তবে এই শোকানুষ্ঠানের আড়ালেই রয়েছে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। টানা ৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন খামেনেই। তাঁর মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় নেতৃত্বে বড় পরিবর্তনের সূচনা করেছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেই দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে যুদ্ধের সময় তিনিও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ফলে নতুন নেতৃত্বকে ঘিরেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সরকারবিরোধী আন্দোলনের জেরে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়া হলেও দেশের ভেতরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ এখনও প্রবল।

তবুও এই সব রাজনৈতিক সমীকরণের ঊর্ধ্বে উঠে যে ছবি সবচেয়ে বেশি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে, তা হল খামেনেইয়ের কফিনের পাশে রাখা ছোট্ট জাহরার কফিন। মধ্য এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নেতার শেষযাত্রায় সেই ছোট্ট কফিন যেন স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হয় মানুষকেই, আর সবচেয়ে গভীর শোকের ভাষা অনেক সময় রাজনীতি নয়, একটি শিশুর নীরব বিদায়।

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Discover more from শুদ্ধস্বর ডটকম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading