“ফুটবল হোক আনন্দের, মৃত্যুর নয়”

বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়; এটি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, সংস্কৃতি ও ঐক্যের এক অনন্য মিলনমেলা। চার বছর পরপর অনুষ্ঠিত এই আসর পৃথিবীর নানা ভাষা, জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষকে একই আনন্দের বন্ধনে আবদ্ধ করে। মাঠের ২২ জন খেলোয়াড়ের লড়াই যেন কোটি দর্শকের হৃদস্পন্দনের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। এ কারণেই বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনা থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

আজ একই ভাষাভাষী দুই দেশ—আর্জেন্টিনা ও স্পেন—বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে মুখোমুখি। যে দলই বিজয়ী হোক, ফুটবলপ্রেমীরা নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে অভিনন্দন জানাবে। একই সঙ্গে শেষ হবে বিশ্বব্যাপী কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ফুটবল উৎসবের আনন্দ। কিন্তু এই আনন্দের আড়ালেও একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা বারবার সামনে এসেছে—অতিরিক্ত আবেগ, অসহিষ্ণুতা এবং অন্ধ সমর্থন অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খেলাধুলার মূল শিক্ষা হচ্ছে প্রতিযোগিতা, শৃঙ্খলা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সমর্থক খেলাকে খেলার জায়গায় রাখতে পারেন না। প্রিয় দলের জয়কে ব্যক্তিগত গৌরব এবং পরাজয়কে ব্যক্তিগত অপমান হিসেবে গ্রহণ করেন। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা, সংঘর্ষ, এমনকি আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও।

বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা অন্যান্য দলের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস বিশ্বজুড়েই আলোচিত হয়েছে। বিভিন্ন শহর ও গ্রামে বিশাল পতাকা, মিছিল, আনন্দ-উৎসব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই উৎসবের মধ্যেই বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ, মারামারি, গুরুতর আহত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রিয় দলের পরাজয় মেনে নিতে না পেরে আত্মহত্যার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশে ঘটেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, একটি খেলাকে ঘিরে কেন মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে?

এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের সমাজ, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং ব্যক্তিগত মানসিকতার দিকে তাকাতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, খেলাকে ঘিরে অস্বাস্থ্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়। বন্ধুত্ব নষ্ট হয়, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে, এমনকি রাজনৈতিক বিভাজনের মতো দলীয় বিভক্তিও তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কটূক্তি, বিদ্রূপ এবং উসকানিমূলক পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

ফুটবল কখনোই ঘৃণার ভাষা শেখায় না। বরং বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের দিকে তাকালে দেখা যায়, মাঠে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ম্যাচ শেষে তারা একে অপরকে আলিঙ্গন করেন, অভিনন্দন জানান এবং সম্মান প্রদর্শন করেন। দর্শকদের মধ্যেও সেই সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কেবল প্রতিযোগিতা আয়োজন করলেই তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ফুটবলকে ঘিরে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ ও ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। স্টেডিয়ামে বর্ণবাদবিরোধী প্রচারণা, বৈষম্যবিরোধী বার্তা কিংবা ‘ফেয়ার প্লে’ কর্মসূচির মতোই এখন সময় এসেছে “Responsible Fan Culture” বা দায়িত্বশীল সমর্থক সংস্কৃতি গড়ে তোলার বৈশ্বিক উদ্যোগ গ্রহণের।

বিশ্বকাপ চলাকালে প্রতিটি ম্যাচের আগে, বিরতিতে এবং শেষে খেলোয়াড়, কোচ ও কিংবদন্তি ফুটবলারদের মাধ্যমে বিশেষ ভিডিও বার্তা প্রচার করা যেতে পারে। সেখানে বলা যেতে পারে—“খেলাকে ভালোবাসুন, প্রতিপক্ষকে সম্মান করুন, জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করুন, কোনো অবস্থাতেই সহিংসতায় জড়াবেন না।” বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক যখন এই বার্তা একসঙ্গে দেখবেন, তখন তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শুধু ফিফা নয়, জাতীয় ফুটবল ফেডারেশন, সরকার, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকেও একযোগে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে। উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম বা উসকানিমূলক বিতর্কের পরিবর্তে সচেতনতামূলক প্রতিবেদন, মানবিক গল্প এবং খেলাধুলার ইতিবাচক দিকগুলো বেশি তুলে ধরা উচিত।

পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে খেলাধুলায় জয়-পরাজয় থাকবে। আজ যে দল জিতবে, আগামীকাল সেই দলও হারতে পারে। কোনো দলই চিরদিন অপরাজেয় নয়। তাই পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। একটি ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট, বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য বা অপমানজনক ভাষা অনেক সময় বাস্তব জীবনে সংঘর্ষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যেন অন্যের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি না করে।

ফুটবল মানুষের মধ্যে আনন্দ ছড়ানোর জন্য। এটি বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি ও মানবিকতার প্রতীক। একটি গোল, একটি ট্রফি কিংবা একটি পরাজয় কোনো মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে না। একজন সমর্থকের মৃত্যু কখনোই কোনো দলের বিজয়কে অর্থবহ করে না। একটি আত্মহত্যা, একটি সংঘর্ষ বা একটি পরিবারের কান্না পুরো ফুটবল বিশ্বের জন্যই লজ্জার বিষয়।

বিশ্বকাপ শেষ হবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসবে, আবার চার বছর পর নতুন উৎসব শুরু হবে। কিন্তু যদি আমরা প্রতিবারই কিছু প্রাণ হারাই, কিছু পরিবার শোকাহত হয়, তাহলে সেই আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়। ফুটবলকে ভালোবাসার অর্থ প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করা নয়; বরং সুন্দর খেলাকে উপভোগ করা।

ফিফার উচিত বিশ্বব্যাপী একটি স্থায়ী সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করা, যেখানে খেলোয়াড়, ক্লাব, জাতীয় দল, সম্প্রচারমাধ্যম এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সবাই যুক্ত থাকবে। প্রতিটি বড় টুর্নামেন্টে “Football Brings Us Together” বা “Enjoy the Game, Respect Everyone” ধরনের বৈশ্বিক প্রচারণা পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে স্থানীয় ভাষায় সচেতনতামূলক বার্তা প্রচারের নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে।

আমাদেরও আত্মসমালোচনা করা দরকার। আমরা কি সত্যিই খেলাকে খেলার মতো দেখছি, নাকি সেটিকে অহংকার ও বিভেদের প্রতীকে পরিণত করছি? একজন প্রকৃত সমর্থক কখনো সহিংসতা সমর্থন করেন না। তিনি নিজের দলকে ভালোবাসেন, কিন্তু প্রতিপক্ষের সাফল্যকেও সম্মান করতে জানেন। এটাই ক্রীড়াসুলভ মনোভাব।

আজকের ফাইনালে যে দলই বিশ্বকাপ জিতুক, সেটিই হবে ফুটবলের বিজয়। কিন্তু সেই বিজয় তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন পৃথিবীর কোথাও কোনো সমর্থকের প্রাণ ঝরবে না, কোনো পরিবার শোকে ভেঙে পড়বে না, কোনো তরুণ আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে না, কিংবা কোনো বন্ধুত্ব শুধুমাত্র একটি ফুটবল ম্যাচের কারণে নষ্ট হবে না।

আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—খেলা দেখব, আনন্দ করব, উদযাপন করব; কিন্তু কখনোই এমন কিছু করব না, যাতে একটি খেলার কারণে মানুষের জীবন, সম্পর্ক বা সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফুটবল হোক ভালোবাসার ভাষা, মানবতার সেতুবন্ধন এবং বিশ্বশান্তির এক অনন্য প্রতীক। কারণ, শেষ পর্যন্ত ট্রফি জেতে একটি দল, কিন্তু ফুটবলের প্রকৃত জয় তখনই, যখন জিতে যায় মানবতা।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.