১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলন শেষ হয়েছে। নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণার পর কাগজে-কলমে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও, বাস্তবে সংগঠনের ভেতরের পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে যেন এক অদৃশ্য নীরবতা নেমে এসেছিল। বিশেষ করে বলাকা ভবনের ৪২ নম্বরে অবস্থিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেলেই সেই পরিবেশ স্পষ্টভাবে অনুভব করা যেত।
যাঁরা সম্মেলনের আগে দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন, জেলার পর জেলা ঘুরেছেন, প্রতিনিধি সংগ্রহ করেছেন, সম্মেলনের বিশাল আয়োজন সফল করতে নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন—তাঁদের অনেকেরই প্রত্যাশা ছিল, নতুন কমিটিতে সেই শ্রম ও ত্যাগের প্রতিফলন ঘটবে। কিন্তু কমিটি ঘোষণার পর দেখা গেল, বাস্তবতা তাঁদের প্রত্যাশার সঙ্গে মিলছে না। ফলে নেতাকর্মীদের মুখে আনন্দের বদলে ছিল এক ধরনের হতাশা ও অনিশ্চয়তার ছাপ।
সম্মেলনের দু-এক দিন পর আমিও বলাকা ভবনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলাম। তবে আমার অভ্যাস ছিল, কেন্দ্রীয় অফিসে যাওয়ার আগে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের কার্যালয়ে কিছুক্ষণ বসা। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।
নগর কার্যালয়ে ঢুকতেই দেখা পেলাম মুশতাক হোসেনের। তিনি তখন ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের অফিস সম্পাদক। একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত ছিলেন। ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর পরিচয় শুধু একটি সাংগঠনিক পদে সীমাবদ্ধ ছিল না; স্কুলজীবন থেকেই তিনি ছিলেন আন্দোলনের মানুষ।
পাকিস্তান আমলে কুখ্যাত ‘দেশকৃষ্টি’ পাঠ্যবই বাতিল আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতা ছিলেন মুশতাক হোসেন। তখন তিনি গবর্মেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের ছাত্র। সেই আন্দোলনের সময় টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতার কথা অনেকেই বলতেন। ছাত্রদের মধ্যে তিনি সাহসী বক্তা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যাকে আন্দোলনের মঞ্চে এত দৃপ্ত দেখা যেত , তাঁকেই অফিসকক্ষে দেখতাম সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। অত্যন্ত লাজুক, স্বল্পভাষী, ভদ্র এবং সংযত একজন মানুষ। অযথা উচ্চস্বরে কথা বলতেন না। চুপচাপ নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর হাতের লেখা ছিল অপূর্ব সুন্দর। অনেক সময় সাংবাদিকরা পর্যন্ত বলতেন, মুশতাকের হাতে লেখা প্রেস রিলিজ পড়তে আলাদা স্বস্তি লাগে।
প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি ছাত্রলীগের প্যাডে প্রেস রিলিজ লিখছিলেন। সেই প্যাডটির কথাও আজও স্পষ্ট মনে আছে। উপরে বড় অক্ষরে লেখা থাকত—
“আমরা লড়ছি সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য।”
একটি মাত্র বাক্যই যেন তখনকার ছাত্রলীগের রাজনৈতিক দর্শনের ঘোষণা বহন করত।
সেই সময় ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন শাহাবুদ্দিন আহমেদ। সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন আব্দুস সালাম, যিনি এখন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন এবং বিএনপির মহানগরের নেতা । তাঁদের নেতৃত্বে নগর কমিটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চলছিল নিয়মিত, যদিও সম্মেলনের পর সেখানেও এক ধরনের চাপা বিষণ্নতা বিরাজ করছিল।
মুশতাক ভাইয়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করলাম। রাজনীতির কথা হলো, সম্মেলনের কথাও উঠল। তিনি খুব বেশি মন্তব্য করলেন না। শুধু মৃদু হেসে বললেন, “সময়ই বলে দেবে কমিটি কতটা সফল হবে।”
এটাই ছিল তাঁর স্বভাব। অল্প কথায় অনেক কিছু বলে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর।
কিছুক্ষণ পর গেলাম কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কার্যালয়ে।
অফিসে ঢুকেই দেখলাম, নতুন নির্বাচিত দপ্তর সম্পাদক সুভাষ সাহা এবং সহ-দপ্তর সম্পাদক হাসান বসে আছেন। দুজনের সঙ্গেই আমার আগের থেকেই আন্তরিক সম্পর্ক ছিল।
সুভাষ সাহার সঙ্গে পরিচয় আরও পুরোনো। তিনি নোয়াখালী থেকে ঢাকা এসে প্রথমে জগন্নাথ হলে উঠেছিলেন। গয়েশ্বর রায়ের কক্ষে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়। গয়েশ্বর রায় তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্র। তাঁর কক্ষে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। রাজনৈতিক আলোচনা, সাংগঠনিক পরিকল্পনা কিংবা নিছক আড্ডা—সবকিছুরই একটি প্রাণবন্ত কেন্দ্র ছিল সেই ছোট্ট কক্ষটি। সেখানেই সুভাষদার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে।
কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তখনও খুব বেশি ভিড় জমেনি। সাধারণত বিকেল পাঁচটার পর থেকেই একে একে নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করতেন। কেউ দিনের সাংগঠনিক কাজের খবর দিতেন, কেউ জেলা থেকে আসা কর্মীদের নিয়ে বসতেন, কেউ আবার শুধু রাজনৈতিক আলোচনা করতেই চলে আসতেন। সেই ব্যস্ত পরিবেশের সঙ্গে আমি পরিচিত ছিলাম।
কিন্তু সেদিন অফিসে অস্বাভাবিক নীরবতা।
আমি চারদিকে তাকিয়ে সুভাষদাকে জিজ্ঞেস করলাম,
—”কেউ এখনও আসেনি?”
তিনি হেসে বললেন,
—”একটু বসো। মান্না ভাই, মাহবুব ভাই—সবাই আসবে। নতুন কমিটির কাজ তো শুরু করতে হবে।”
তাঁর কথায় আশাবাদ ছিল, কিন্তু মুখের অভিব্যক্তিতে যেন ক্লান্তির ছাপও লুকিয়ে ছিল।
এই সময় অফিসের আরেক পরিচিত মুখ এসে সামনে দাঁড়াল।
তার নাম সুলতান।
বয়সে ছোট্ট একটি ছেলে। অফিসের স্থায়ী কর্মচারী বলা যায়। চা আনা, অতিথিদের আপ্যায়ন করা, কাগজপত্র পৌঁছে দেওয়া কিংবা ছোটখাটো যেকোনো কাজ—সবই হাসিমুখে করত। নেতাকর্মীদের কাছে সে ছিল অত্যন্ত স্নেহের। অফিসে যারা নিয়মিত আসতেন, প্রত্যেকেই তাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন।
সুভাষদা পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন,
—”সুলতান, নিচ থেকে তিন কাপ চা নিয়ে আয়।”
বলাকা ভবনের নিচতলায় একটি ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল। সেই দোকানের চা-ই ছিল আমাদের নিয়মিত বিকেলের সঙ্গী।
কিছুক্ষণ পর সুলতান ট্রেতে করে তিন কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে ফিরে এল।
আমি, সুভাষদা আর হাসান—তিনজনে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে রইলাম। কথাবার্তা খুব বেশি হচ্ছিল না। মাঝে মাঝে শুধু সম্মেলনের প্রসঙ্গ উঠে আসছিল।
আমার মনে তখন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল।
নতুন কমিটি কীভাবে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে?
সম্মেলনের সময় যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা কি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে?
নেতাকর্মীদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা কি আবার আগের মতো মুছে যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর তখন কারও কাছেই ছিল না।
অফিসের দেয়ালে ঝুলছিল ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচির পোস্টার। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু ফাইল, প্রেস রিলিজের খসড়া, কয়েকটি সংবাদপত্র আর নতুন কমিটির তালিকা। বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল। জানালা দিয়ে ভেসে আসছিল ব্যস্ত রাস্তার শব্দ।
আমরা অপেক্ষা করছিলাম।
অপেক্ষা নতুন সভাপতি এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকের জন্য।
অপেক্ষা নতুন সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য।
অপেক্ষা সেই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠকের, যেখানে হয়তো সম্মেলন-পরবর্তী সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে।
কিন্তু তখনও আমরা কেউ জানতাম না, এই নীরব বিকেলই একদিন আমার স্মৃতির পাতায় এত গভীরভাবে গেঁথে থাকবে। কারণ খুব শিগগিরই এই অফিসে শুরু হবে নতুন নেতৃত্বের কর্মপরিকল্পনা, তর্ক-বিতর্ক, মতপার্থক্য এবং এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী হব, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
সেদিন চায়ের কাপ হাতে বসে আমরা শুধু অপেক্ষাই করছিলাম—সময়ের জন্য, নেতৃত্বের জন্য এবং ছাত্রলীগের নতুন পথচলার জন্য।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

