এনবিআরের সংস্কার বেগবান না হলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব নয় : সিপিডি

এনবিআরের সংস্কার বেগবান না হলে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয় বলে মনে করে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পিলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। আগামী অর্থবছরের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামাতে খাদ্য ও জ্বালিনির সরবরাহ বাড়াতে হবে বলেও মনে করে সংস্থাটি।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এ কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অ্যাধাপক মোস্তাফিজুর রহমান ও জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহকারী তামিম আহমেদ।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, “প্রস্তাবিত এই বাজেট সরকারের প্রথম বাজেট। এই বাজেটটি এমন সময়ে দেয়া হয়েছে যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে এবং গত প্রায় চার বছর থেকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজমান। পাশাপাশি দেখছি আমাদের প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়েছে, দুর্বল ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান হচ্ছে না, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ মোটামুটি অবস্থায় রয়েছে, প্রেসারে ছিল কিন্তু মোটামুটি ভালো হয়েছে, তবে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এখন একটা ক্রিটিক্যাল সময়— আমাদের জ্বালানি সংকট। এই প্রেক্ষিতে বাজেটকে মানবিক, গণতান্ত্রিক মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ বাজেট বলা হয়েছে।”

ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, “প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। ভৌত অবকাঠামোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনকল্যাণমূলক খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।”

সিপিডি মনে করে, এই দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যবসাবান্ধব নীতি গ্রহণ, নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং সামাজিক খাতের উন্নয়নের বিষয়গুলোতে মিল রয়েছে।”

সংস্থাটি বলছে, “বাজেটের সাফল্য আকারের ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের মানের ওপর নির্ভর করবে।”

“অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবায়ন দুর্বল হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না” যোগ করেন ফাহমিদা খাতুন।

বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য— উল্লেখ করে সিপিডি বলেছে, “এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেগুলো দক্ষতার সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারবে এবং জনগণের কাছে দৃশ্যমান ফলাফল পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই বাজেট নতুন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে।”

প্রতিক্রিয়ায় আরও বলা হয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেয়ার সক্ষমতা প্রদর্শনের এটিই সরকারের প্রথম বড় সুযোগ। বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার যদি কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের অর্থনীতিকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর বিপরীতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর ফলে সামগ্রিক বাজেটে নিট ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা (ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা) এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ধরা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.