একই আকাশের নিচে বিভক্ত বাস্তবতা

ভারতের নবনিযুক্ত হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল সীমান্তে দাঁড়িয়ে বললেন, “একই আকাশ একই বাতাস।” কথাটি নিঃসন্দেহে কূটনৈতিক সৌজন্যের চেয়েও বেশি কিছু বহন করে। উপমহাদেশের ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আবেগী ভিত্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয় এই বক্তব্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—যদি সত্যিই দুই দেশের মানুষ একই আকাশ ও বাতাসের অংশীদার হয়, তাহলে কেন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া? কেন নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়? কেন “পুশ ব্যাক” নামে মানবাধিকারবিরোধী প্রক্রিয়া চলে? আর কেন ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশে বাংলাদেশকে ঘিরে অবিরাম নেতিবাচক প্রচারণা দেখা যায় ?

এই প্রশ্নগুলো কেবল আবেগের নয়; এগুলো রাজনৈতিক বাস্তবতা, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে একটি বিশেষ অবস্থান দখল করে আছে। স্বাধীনতার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক কখনো উষ্ণ, কখনো শীতল, কখনো কৌশলগত, আবার কখনো সন্দেহ ও অবিশ্বাসে আবৃত থেকেছে। ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল—এটি ইতিহাসের অস্বীকারযোগ্য সত্য। কিন্তু ইতিহাসের সেই বন্ধুত্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে দাঁড়াতে পারেনি। বড় রাষ্ট্র ও ছোট রাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রায়ই ক্ষমতার অসমতায় আক্রান্ত হয়, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়।

দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, “দুই ডেমোক্রেসি মিলে গেলে একটা ওয়ার্ল্ড পাওয়ার হয়ে যায়।” বক্তব্যটি তাত্ত্বিকভাবে আকর্ষণীয়। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় ১৬০ কোটিরও বেশি মানুষের সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তি নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই অঞ্চলের সহযোগিতার চেয়ে অবিশ্বাসের রাজনীতি বেশি শক্তিশালী। ভারত নিজেকে আঞ্চলিক পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আর সেই কৌশলের অংশ হিসেবেই প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে। ফলে সম্পর্কের ভাষায় বন্ধুত্ব থাকলেও নীতিতে নিরাপত্তাকেন্দ্রিক কঠোরতা প্রাধান্য পায়।

“পুশ ব্যাক” ইস্যুটি তার একটি বড় উদাহরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে বসবাসকারী বহু বাংলাভাষী মুসলমানকে “অবৈধ বাংলাদেশি” আখ্যা দিয়ে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব যাচাই না করেই বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠানো হয়েছে। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসও বাড়িয়ে তোলে। প্রশ্ন হচ্ছে, যদি বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র হয়, তাহলে বাংলাদেশকে কেন সবসময় “অনুপ্রবেশকারী উৎপাদনকারী” দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়?

ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় অংশ এই প্রশ্নের উত্তর দেয়। বিশেষত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের পর বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে একটি ভয়ভিত্তিক রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে। “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” শব্দবন্ধটি ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। এতে বাংলাদেশকে কেবল একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, বরং একটি “নিরাপত্তা ঝুঁকি” হিসেবে দেখানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ফলত সীমান্তে কঠোরতা, নাগরিকপঞ্জি বিতর্ক কিংবা পুশ ব্যাক নীতির মতো বিষয়গুলো রাজনৈতিক সমর্থন পায়।

সীমান্ত হত্যা আরও গভীর মানবিক সংকটের প্রতীক। পৃথিবীর অনেক সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যেভাবে সাধারণ মানুষ নিহত হয়, তা সভ্য বিশ্বের কাছে অগ্রহণযোগ্য। গরু পাচার, চোরাচালান কিংবা অবৈধ পারাপারের অভিযোগ থাকতেই পারে; কিন্তু তার সমাধান কি গুলি? আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালা বলছে, সীমান্ত রক্ষায় প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার হতে হবে একেবারে শেষ বিকল্প হিসেবে। অথচ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, নিরস্ত্র মানুষও প্রাণ হারাচ্ছে। ফেলানীর ঝুলন্ত লাশ এই বাস্তবতার নির্মম প্রতীক হয়ে আছে।

কাঁটাতারের বেড়াও একই ধরনের প্রতীকী প্রশ্ন তৈরি করে। একদিকে বলা হচ্ছে “একই আকাশ একই বাতাস”, অন্যদিকে কয়েক হাজার কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুক্তি অবশ্যই আছে। কিন্তু বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ভাষা এবং সীমান্ত নীতির বাস্তবতার মধ্যে এই দ্বৈততা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। সাধারণ মানুষের মনে তখন প্রশ্ন জাগে—এই সম্পর্ক কি সত্যিই পারস্পরিক সম্মানের, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক বক্তব্যের অলংকার ?

ভারতীয় মিডিয়ার ভূমিকা এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। ভারতের মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশকে প্রায়ই নেতিবাচক ফ্রেমে উপস্থাপন করে। কখনো “অবৈধ অভিবাসী”, কখনো “জঙ্গিবাদের ঝুঁকি”, কখনো “সংখ্যালঘু নির্যাতন”—এসব ইস্যু এমনভাবে তুলে ধরা হয়, যেন বাংলাদেশ একটি চিরস্থায়ী সংকটের দেশ। অথচ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক সূচকে উন্নয়ন কিংবা জলবায়ু অভিযোজনের মতো ইতিবাচক দিকগুলো তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।

এই প্রচারণার পেছনেও রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করে। ভারতীয় টেলিভিশন মিডিয়ার বড় অংশ এখন চরম জাতীয়তাবাদী আবেগের ওপর নির্ভরশীল। “বহিরাগত শত্রু” তৈরি করা তাদের জন্য লাভজনক। পাকিস্তানের পাশাপাশি বাংলাদেশও অনেক সময় সেই রাজনৈতিক বয়ানের অংশ হয়ে ওঠে। এতে দর্শকসংখ্যা বাড়ে, রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র হয় এবং ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে মিডিয়ার একটি অদৃশ্য সমঝোতা গড়ে ওঠে।

তবে দায় শুধু ভারতের নয়। বাংলাদেশকেও আত্মসম্মান ও বাস্তবতার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। একদিকে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রয়োজন—ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার কারণে। অন্যদিকে সম্পর্ক যেন আত্মসমর্পণে পরিণত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগ নয়, জাতীয় স্বার্থই হওয়া উচিত প্রধান ভিত্তি।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি রাষ্ট্র নয়, মানুষ। সীমান্তের দুই পাশে ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস ও ইতিহাসের যে মিল রয়েছে, তা রাজনৈতিক উত্তেজনার চেয়েও গভীর। কিন্তু রাষ্ট্র যখন নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদের ভাষাকে প্রাধান্য দেয়, তখন সেই মানবিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের ইতিবাচক দিক এখানেই—তিনি অন্তত মানুষে মানুষে সংযোগের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু কথার সত্যতা প্রমাণ করতে হলে বাস্তব নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রথমত, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে ভারতকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুশ ব্যাক নীতির নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, দুই দেশের মিডিয়ার মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিদ্বেষ নয়, বাস্তবতা ও পারস্পরিক সম্মান প্রাধান্য পায়। আর চতুর্থত, সম্পর্ককে বড় ভাই-ছোট ভাই মানসিকতা থেকে বের করে সমমর্যাদার অংশীদারিত্বে নিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশ ও ভারত সত্যিই যদি “একই আকাশ একই বাতাস”-এর দর্শনে বিশ্বাস করে, তাহলে সেই বিশ্বাস সীমান্তের কাঁটাতারেও প্রতিফলিত হতে হবে। কারণ বন্ধুত্বের প্রকৃত পরীক্ষা কূটনৈতিক ভাষণে নয়, সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.