মঙ্গলবার সোশ্যাল মিডিয়ায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী লিখেছেন, ‘তৃণমূলের পরাজয়ে কংগ্রেসের অন্দরে কিছু মানুষ উল্লাস করছেন। তাঁদের বুঝতে হবে যে বিজেপি-র হাতে ভারতে গণতন্ত্র ধ্বংস হওয়ার পথে বড় পদক্ষেপ অসম এবং বাংলার এই ফলাফল। ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ সরিয়ে রাখুন। এটা কোনও একটি রাজনৈতিক দলের ব্যাপার নয়। দেশের ব্যাপার।’ এই মন্তব্যকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি আসলে বিরোধী রাজনীতির বর্তমান সংকটের এক নির্মম স্বীকারোক্তি—এবং একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তা।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যে যে তীক্ষ্ণতা আছে, তা মূলত বিরোধী শিবিরের ভেতরের অসুখকে সামনে আনে। অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল কেবল আঞ্চলিক ভোটের অঙ্ক নয়; এগুলি ভারতের জাতীয় রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকছে, তার ইঙ্গিত। আর সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট—বিরোধী রাজনীতি বিভক্ত, দিশাহীন এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মঘাতী।
প্রশ্নটা তাই সরাসরি: ভারত কি কার্যত একমুখী রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে? বিজেপি-র ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে যদি শুধু তাদের সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়, তবে তা অসম্পূর্ণ বিশ্লেষণ হবে। সমানভাবে দায়ী বিরোধী দলগুলির পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংকীর্ণতা এবং রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা।
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি সবসময়ই এসেছে শক্তিশালী বিরোধী উপস্থিতি থেকে। কিন্তু আজ বাস্তবতা হলো, যে কংগ্রেস একসময় জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র ছিল, তারা দীর্ঘদিন ধরে সাংগঠনিক দুর্বলতা, নেতৃত্বের দ্বিধা এবং কৌশলগত ভুলে নিজেদের অবস্থান ক্ষয় করেছে। অন্যদিকে বিজেপি ধারাবাহিকভাবে নিজেদের বিস্তার ঘটিয়েছে—মাঠে, বার্তায় এবং নির্বাচনী যন্ত্রে।
অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল সেই বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকলেও, বিরোধী ভোটের বিভাজন এবং অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সিকে বিজেপি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। অসমে পরিচয়-রাজনীতি, আঞ্চলিক সমীকরণ এবং সংগঠিত প্রচারের সমন্বয়ে বিজেপি নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে কংগ্রেসের কিছু অংশ যদি তৃণমূলের দুর্বলতায় আনন্দ খুঁজে পায়, তবে তা রাজনৈতিকভাবে শুধু অপরিণত নয়—বরং আত্মঘাতী। কারণ বাস্তব অঙ্ক খুব পরিষ্কার: বিরোধী ভোট যত ভাগ হবে, বিজেপির পথ তত সহজ হবে। রাহুল গান্ধী এই সরল সত্যটিই উচ্চারণ করেছেন, যা অনেকেই বলতে চান না।
তাঁর ‘ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থ সরিয়ে রাখুন’—এই আহ্বান আদতে একটি কৌশলগত নির্দেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বিরোধী রাজনীতি কি সেই পরিণতিতে পৌঁছেছে? ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল—প্রতিটি রাজ্যের নিজস্ব শক্তির সমীকরণ, আঞ্চলিক দলগুলির নিজস্ব এজেন্ডা, এবং নেতৃত্বের সংঘাত একটি সর্বভারতীয় ঐক্য গড়ে তোলাকে কঠিন করে তোলে।
তবুও, একটি ন্যূনতম অভিন্ন অবস্থান ছাড়া বিকল্প রাজনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। শুধু জোট করলেই হবে না; প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক বয়ান—যা গণতন্ত্র, সংবিধান, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে স্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান নেয়। বর্তমানে সেই বয়ানের অভাবই সবচেয়ে বড় সংকট।
আগামী দিনের ভারতের রাজনীতি তিনটি সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমত, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিজেপির আধিপত্য আরও গভীর হবে এবং বিরোধী রাজনীতি প্রান্তিক হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, বিরোধী দলগুলি যদি বাস্তবতা মেনে কৌশলগত ঐক্যে পৌঁছতে পারে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক গণতন্ত্রের পুনরুত্থান সম্ভব। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক দলগুলি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় উঠে এসে জোট রাজনীতিকে নতুন রূপ দিতে পারে।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই—তিনি সমস্যাটিকে শুধু নির্বাচনী হারজিতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; তিনি এটিকে গণতন্ত্রের কাঠামোগত প্রশ্ন হিসেবে তুলেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক হোক বা বিতর্কিত—এটি উপেক্ষা করার মতো নয়।
গণতন্ত্র কেবল ভোটে সীমাবদ্ধ নয়; এটি নির্ভর করে কার্যকর বিরোধী শক্তি, স্বাধীন প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার উপর। সেই জায়গাতেই আজ ঘাটতি স্পষ্ট।
সবশেষে, অসম ও পশ্চিমবঙ্গের ফলাফল এবং তা ঘিরে এই বিতর্ক একটি কঠিন সত্য সামনে আনে: বিরোধী রাজনীতি যদি আত্মসমালোচনা না করে, নিজেদের পুনর্গঠন না করে, তবে ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একমুখী হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। আর সেই পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের কাঠামো আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে থাকলেও, তার প্রাণশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হবে।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

