নিয়মিত জীবনযাপনেই শতায়ু : কিংবদন্তি চিকিৎসক ডা. মণি ছেত্রীর প্রয়াণ

রোজ ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, সময়মতো জীবনযাপন, আর প্রতিটি দিনকে উদযাপনের মতো করে বাঁচা—এই ছিল ডা. মণি ছেত্রীর জীবনদর্শন। সৌজন্য, ভদ্রতা ও মানবিকতায় তিনি ছিলেন এক অনন্য উদাহরণ। ছাত্র থেকে শুরু করে পরিচিত-অপরিচিত—সকলকে সমান সম্মান দিয়ে সম্বোধন করতেন তিনি। দেখা হলে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে নমস্কার জানানো ছিল তাঁর স্বভাবজাত অভ্যাস। অনেকের মতে, ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের পর পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসা পরিষেবার যে গতি কিছুটা থমকে গিয়েছিল, তা নতুন করে প্রাণ পেয়েছিল ডা. মণি ছেত্রীর হাত ধরেই।

১৯২০ সালের ২৩ মে দার্জিলিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। প্রাথমিক শিক্ষা সেখানেই, দার্জিলিং মিউনিসিপ্যালিটি প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৩৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। ১৯৪৪ সালে ডাক্তারিতে স্নাতক এবং ১৯৪৯ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে আরও গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য বিদেশেও পাড়ি দেন। ১৯৫৫ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ ফিজিসিয়ানস থেকে এমআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে আমেরিকান কলেজ অফ কার্ডিওলজি ও ইন্ডিয়ান অ্যাকাডেমি অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেসসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের ফেলোশিপ অর্জন করেন।

লন্ডন থেকে দেশে ফিরে কলকাতার স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিনে রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতালে (বর্তমান এসএসকেএম) কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে যোগ দেন। এই হাসপাতালের সার্জেন সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পাশাপাশি আইপিজিএমইআর-এর কার্ডিওলজি ও মেডিসিন বিভাগের প্রফেসর-ডিরেক্টর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

রাজ্যের চিকিৎসা পরিকাঠামো উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। এসএসকেএম হাসপাতালে তাঁর উদ্যোগেই গড়ে ওঠে ইনটেনসিভ থেরাপি ইউনিট (আইটিইউ)। পাশাপাশি এন্ডোক্রিনোলজি, কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, ডায়াবেটিস ও রিউম্যাটোলজির মতো বিশেষায়িত বিভাগ চালু হয়—যা সেই সময় রাজ্যের কোনো সরকারি হাসপাতালে ছিল না। বাঙুর ইনস্টিটিউট অফ নিউরোলজি এবং আইপিজিএমইআর-এর ডিরেক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তার দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক দক্ষতার পরিচয়ও দেন।

জীবদ্দশাতেই কিংবদন্তিতে পরিণত হওয়া এই চিকিৎসক ১৯৭৪ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন। বয়সকে কখনো বাধা হিসেবে দেখেননি তিনি। বরং নিজের জীবনযাপন দিয়েই প্রমাণ করেছেন—নিয়ম, সংযম আর ইতিবাচক মানসিকতা দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞান অনেকটাই নির্ভর করবে জিন থেরাপির উপর, যেখানে মানুষের আয়ু ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ধারিত হবে জিনের মাধ্যমে।

স্বাস্থ্য ভালো রাখতে কঠোর শরীরচর্চার চেয়ে নিয়মিত জীবনযাপনকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন তিনি। সময়মতো খাওয়া, পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং হাসিখুশি থাকা—এই ছিল তাঁর সুস্থ জীবনের মন্ত্র। আমিষ-নিরামিষে কোনো বাছবিচার না থাকলেও সময়ের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর।

জীবনের শেষ পর্বে বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। কিছুদিন আগে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পান এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়ি ফেরেন। তাঁর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়ে বাংলা তথা গোটা দেশ। চিকিৎসা জগতে তাঁর অবদান এবং মানবিক মূল্যবোধ আজও প্রেরণা জোগায় নতুন প্রজন্মকে।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.