যৌন হয়রানি বর্তমান সময়ের বহুলাচিত একটি বিষয়।সমাজের বিভিন্ন স্তররে মানুষ সোচ্চার এর বিরুদ্ধে। দাবী উঠেছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। লেখা হচ্ছে নানা মানুষের নানা মত। কেউ বলছেন, কেন মেয়েটিকে আত্মহত্যা করতে হবে যৌন হয়রানরি কারনে? কেন মেয়েটি রুখে দাড়াচ্ছে না সব কিছুর বিরুদ্ধে?
আর আমার এই লেখা- ”রুখে দাড়ানো কথাটি নিয়ে” যেসব খবর পত্রিকায় আসছে বা আসছে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে সেসব ক্ষেত্রে আমরা বলছি- কেন রুখে দাড়াচ্ছে না মেয়েটি? কেন করছে না প্রতিবাদ? বলতে পারছি শুধুমাত্র যেগুলি দৃশ্যমান সেগুলির জন্য , কারন দেখতে পাই আমরা সবাই কি ঘটছে তা। আর দৃশ্যমান এগুলিরই প্রকাশ খবরের পাতায় অথবা টিভি চ্যানেলে।
আমরা কি জানি বা খবর রাখি, আমাদের এই দেশে কত মেয়ে, কত নারী এই যৌন হয়রানরি শিকার? যা এক কথায় ‘‘অদৃশ্য যৌন হয়রানি ”। আমরা হয়তো জানিনা বা জানলেও বলতে চাই না। কারণ যিনি বা যারা এই অদৃশ্য ঘটনাটি ঘটাচ্ছেন তিনি বা তারা সমাজের মান্যগন্য (?) লোক। তাদের রয়েছে অনেক সুনাম, অনেক কৃতি মানুষ তারা। আর এই কৃতি পুরষদের দ্বারাই ঘটে যাচ্ছে এইসব অদৃশ্য যৌন হয়রানরি ঘটনা – বিভিন্ন অফিস, আদালত ও বাড়িতে। আর এই বিষয়টি তো অনেক অফিস খুব সাধারণ ঘটনা হিসাবে আত্মস্থ করে নিয়েছেন, যেন তাদের ‘‘কানে তুলো পিঠে কুলো”। যদিও তারা নারী অধিকার, নারী পুরুষের সমতার কথা বলে ঝড় তুলেন বিভিন্ন মিটিং ও সেমিনারে। নারীর মর্যদা রক্ষায় তারা যে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ(?)।
কিন্তু বাস্তবের রূপ ভিন্ন। বাস্তবে দেখা যায় অধিকার রক্ষাকারী (বক্তৃতায়, মিছিলে, মিটিং এ) সেই কৃতিমান ব্যক্তিটি বা ব্যক্তিদ্বয় অফিসে তাঁর অধস্তন বা সহকর্মী নারীর দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। আড়ালে আবডালে বেড়াতে যাবার কথা বলছেন, নিদেনপক্ষে হাত ধরে কাছে টানা চেষ্টা করছেন (অবশ্য তার কালো কাঁচের গ্লাসে ঢাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে)। সেই নারী চাক আর না চাক তিনি তো চাইছেন। কারণ তিনি যে বস নিদেন পক্ষে পুরুষ মানুষ। যদি নারী নিজের সম্মানহানির ভয়ে নিরব থাকেন তাহলে তো কোন কথাই নেই। আহা তুমি কত ভাল নারী। তোমার চাইতে ভাল আর মানুষ হয় না। তুমি যে অন্যের অপরাধের দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়ে নিরবে নিজের সম্মান রক্ষা করে চলেছ (সাবাশ নারী এই নিরবতা তোমার অলঙ্কার-পুরুষের চোখে, সমাজের চোখে)।
আর কোন কারণে যদি কোন নারী ভুলক্রমে (?) এর প্রতিবাদ করে বসেন রুখে দাড়ান সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাহলে গেল গেল রবে মুখুর সব রথী মহারথীদের মুখ (অবশ্যই নিরবে)। তখন তারা সবাই মিলে বসে যান এই সমস্যার একটি যথাযথ (?) সমাধানের জন্য আর সেই সমাধানটি হল এই বিষয়টি প্রকাশ করা যাবে না তাহলে মান ইজৎ যাবে রথী মহারথীদের আর তাইতো কূল মান বজায় রাখতে হবে সকলের সন্মিলিত প্রচেষ্টায়। যেভাবে হউক সেই নারীকে দুরে সরিয়ে দিতে হবে। তিনি থাকলেই যে বিপদ। দরকার হলে তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ এনে তাকে চাকরি চুত্য করতে হবে। নইলে যে সমূহ বিপদ। তিনি কখন আবার এই অদৃশ্য যৌন হয়রানি কথা বলে ফেলবেন। আর যদি বলে ফেলেন তাহলে যে, মান(?) যাবে মানী লোকের।
আমরা হয়তো জানি না বা খবরও রাখি না কত নারী নিরবে এই যৌন হয়রানি সয়ে যাচ্ছেন অফিসে, আদালতে বা বাড়িতে দিনের পর দিন। চাইলেও তিনি মুখ খুলতে পারছেন না। কারণ ‘বিচারের বাণী নিরবে নিভৃতে কাঁদে’ এই কথাটি মনে করে। কারণ তিনি তো সুবিচার পাবেনইনা বরং উল্টো তিনিই হবেন ‘বলির পাঠা’।
যাদের হাতে এই অদৃশ্যমান যৌন হয়রানির বিচারের ভার তারা কি আসলেই চান নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা হউক? নারী এ থেকে মুক্তি পাক? তারা কি সত্যই চান ভারসাম্যপূর্ণ এক সমাজ ব্যবস্থা বা কর্মময় পরিবেশ? যেখানে নারী পুরুষ সত্যিকার অর্থে সমান মর্যাদার অধিকারী। যদি তারা সত্যই তা চাইতেন তাহলে হয়তো এই অদৃশ্য যৌন হয়রানির হাত হতে রক্ষা পেতেন অনেক নারী। প্রতিবাদ করার কারণে কোন নারীকে হতে হতো না চাকরীচুত্যা বা নিগৃহীত।
সুতারাং এই অদৃশ্য মর্যাদাহীন ঘটনাগুলোর প্রতিবাদ করতে হবে নারীর নিজেকেই। সচেষ্ট হতে হবে তার নিজের অধিকার আদায়ের। আর খুলে দিতে হবে এইসব মুখোশধারী ভদ্রলোকদের মুখোশ। নারীকে মনে রাখতে হবে অন্যায় যে করবে মাথা নত করতে হবে তারই সেই নারীর নয়।
জাকিয়া শিশির ,
সামাজিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ।

