১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনের ঘটনাগুলো বুঝতে হলে তার আগে ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালের শুরুতে ঘটে যাওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন। কারণ, এই ঘটনাগুলো শুধু ছাত্রলীগের সাংগঠনিক অবস্থাকেই প্রভাবিত করেনি, বরং সে সময়কার ছাত্ররাজনীতির চরিত্র, সম্পর্ক এবং সংঘাতের প্রকৃত চিত্রও তুলে ধরে।
১৯৭২ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনের পর শরীফ নুরুল আম্বিয়া সভাপতি এবং এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাঁদের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড বেশ সুসংগঠিতভাবেই চলছিল। স্বাধীনতার পর দেশের পুনর্গঠনের পাশাপাশি ছাত্রলীগও নিজেকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠন বিস্তৃত হচ্ছিল, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতেও ছাত্রলীগ ধারাবাহিকভাবে শক্ত অবস্থান ধরে রাখে।
কিন্তু স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ মোটেও শান্ত ছিল না। আদর্শগত বিভক্তি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছিল।
১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার তোপখানা রোডে ইউএসআইএস (USIS)-এর সামনে ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়নের একটি বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেই কর্মসূচিতে গুলিবর্ষণের ঘটনায় ছাত্র ইউনিয়নের দুই কর্মী—মতিউল ও কাদের—নিহত হন। ঘটনাটি ছাত্রসমাজকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
পরদিন, ২ জানুয়ারি, বায়তুল মোকাররমের টিকিট কাউন্টারের ছাদের ওপর ছাত্রলীগের উদ্যোগে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন শরীফ নুরুল আম্বিয়া।
সেই সভাটি আমার কাছে শুধু একটি প্রতিবাদ কর্মসূচি ছিল না; বরং ছাত্ররাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা বলেই মনে হয়েছিল। দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে একটি মানবিক সংহতির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দুই সংগঠনের নেতাদের মধ্যে কথাবার্তা বাড়তে থাকে, দূরত্ব কিছুটা হলেও কমে আসে।
তার আগে অবশ্য সম্পর্ক ছিল একেবারেই ভিন্ন ধরনের।
আমরা তখন ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের নিয়ে নানা ধরনের ঠাট্টা-বিদ্রূপ করতাম। বিশেষ করে ডাকসুর সহ-সভাপতি (ভিপি) মুজাহিদুল সেলিমকে নিয়ে ছাত্রলীগের কর্মীদের মধ্যে নানা রকম রসিকতা প্রচলিত ছিল। আড়ালে-আবডালে অনেকে তাঁকে “আপা” বলে সম্বোধন করত। তাঁর চলাফেরা ও কথাবার্তায় কিছুটা কোমল স্বভাবের ছাপ থাকায় সে সময় এমন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করা হতো। আজ ফিরে তাকিয়ে মনে হয়, সে সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এসব বিষয় খুবই সাধারণ ছিল, যদিও বর্তমান সময়ের দৃষ্টিতে তা অবশ্যই শোভন বা গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও রক্তপাতের ঘটনায় আমরা কেউ আনন্দিত হইনি। বরং মতিউল ও কাদেরের মৃত্যুর ঘটনায় ছাত্রসমাজের মধ্যে সত্যিকারের শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
এর ঠিক দুদিন পর, ৪ জানুয়ারি, ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বিকেলের দিকে অনুষ্ঠান চলছিল শান্তিপূর্ণভাবেই। উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মী এবং অসংখ্য দর্শক।
হঠাৎ পরিস্থিতি বদলে যায়।
একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী আকস্মিকভাবে অনুষ্ঠানে হামলা চালায়। সে সময় আমরা তাঁদের “মুজিববাদী গুণ্ডা” বলেই চিনতাম। হামলাটি ছিল অত্যন্ত নির্মম ও পরিকল্পিত।
এই হামলায় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এ.এফ.এম. মাহবুবুল হকের মাথা ফেটে যায়। সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়ার একটি হাত ভেঙে যায়। আরও অনেক নেতাকর্মী আহত হন।
গুরুতর আহত অবস্থায় আম্বিয়া ভাই ও মাহবুব ভাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আমি প্রায় প্রতিদিনই হাসপাতালে তাঁদের দেখতে যেতাম। সঙ্গে নিয়ে যেতাম কেক, বিস্কুট কিংবা সামান্য কিছু ফলমূল। অসুস্থ মানুষের জন্য এগুলো হয়তো খুব বড় কিছু ছিল না, কিন্তু আমাদের ভালোবাসা ও সহমর্মিতার ছোট্ট প্রকাশ ছিল।
আম্বিয়া ভাইয়ের ভাঙা হাতের অবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পরও তাঁর হাত পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অনেক দিন পর্যন্ত তিনি হাত পুরো সোজা করতে পারতেন না। সেই আঘাতের স্থায়ী প্রভাব তাঁর শরীরে রয়ে গিয়েছিল।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হওয়ার পরিবর্তে খুব দ্রুতই রাজনৈতিক পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়।
কয়েকদিনের মধ্যেই কেরানীগঞ্জের মিরজাহান নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি স্থানীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। পরে জানতে পারি, প্রতিপক্ষের গুলিতেই তিনি আহত হয়েছিলেন।
মিরজাহান কেরানীগঞ্জের আমাদের পরিচিত ছাত্রনেতা ইকবালের আত্মীয় ছিলেন। সেই সূত্রে একদিন ইকবাল আমাকে নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যান। পরদিনই তিনি মারা যান।
কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর ঘটনাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হলো।
তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান এক বিবৃতিতে অভিযোগ করলেন, “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসীরা যুবলীগ কর্মী মিরজাহানকে হত্যা করেছে।”
আমাদের কাছে এই অভিযোগ ছিল সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কারণ আমরা নিজেরাই জানতাম, মিরজাহান যে গুলিতে আহত হয়েছিলেন, তার সঙ্গে ছাত্রলীগ বা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছাত্রদের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
সে সময় এ ধরনের রাজনৈতিক দোষারোপ নতুন কিছু ছিল না। বরং বিভিন্ন ঘটনার দায় প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তখন দেশের রাজনীতিতে ক্রমেই বাড়ছিল। পরবর্তীকালে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও এ ধরনের আরও অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়েছি।
তবে এসব সংঘাত, হামলা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম থেমে থাকেনি। বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করছিল। সংগঠনের সাংগঠনিক শক্তি তখনও ছিল দৃঢ়।
এরই মধ্যে এসে গেল ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্বাচনের দিন ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক এবং আফতাব আহমদ একটি ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। যতদূর মনে পড়ে, ওই আসনে এম. আউয়াল কারাগারে থেকেই নির্বাচন করছিলেন।
নির্বাচনের দিন হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল, ভোটকেন্দ্র থেকে মাহবুবুল হক ও আফতাব আহমদকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পরে এলাকার কয়েকজন পরিচিত বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারি, তাঁদের ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে চোখ বেঁধে কিছু সময় আটক করে রাখা হয়। তখন বিভিন্ন মহলে প্রচারিত হয়েছিল যে, এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন শেখ কামাল নিজে।
আমি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম না। তাই যা লিখলাম, তা সে সময় এলাকার একাধিক নির্ভরযোগ্য পরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে শোনা তথ্যের ভিত্তিতেই উল্লেখ করছি। ইতিহাসের স্বার্থে এ ধরনের স্মৃতিচারণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও সমসাময়িকভাবে শোনা ঘটনার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করে দেওয়াই আমি প্রয়োজনীয় মনে করি।
স্বাধীনতার মাত্র দুই বছরের মাথায় দেশের রাজনীতি যে কত দ্রুত সংঘাত, অবিশ্বাস ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো ছিল তারই প্রতিচ্ছবি। আমরা তখনও বিশ্বাস করতাম, আদর্শের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে। কিন্তু বাস্তবতা ক্রমশ আমাদের ভিন্ন এক বাংলাদেশের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

