১৯৭৩ সালের ছাত্রলীগের সম্মেলনের পর নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করল। সভাপতি নির্বাচিত হলেন এ.এফ.এম. মাহবুবুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান মান্না। সাংগঠনিক সম্পাদক গৌরাঙ্গ পাল, প্রচার সম্পাদক ওয়ালিউল ইসলাম সেলিম, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক খয়ের এজাজ মওসুদ এবং সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হলেন সেলিম। আরও অনেকে বিভিন্ন পদে স্থান পেলেন। কাগজে-কলমে এটি ছিল ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বের সূচনা, কিন্তু সংগঠনের ভেতরের আবহ ছিল অন্যরকম।
সম্মেলনের পরও অনেকের মতো আমিও নতুন কমিটিকে সহজভাবে মেনে নিতে পারিনি। এর কারণ ব্যক্তিগত বিরাগ ছিল না, বরং দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের রাজনীতি করতে গিয়ে আমরা যাঁদের দেখেছি, যাঁদের সঙ্গে মিছিল করেছি, আন্দোলন করেছি, তাঁদের অনেকেই নতুন কমিটিতে স্থান পাননি। পরিবর্তে এমন অনেক মুখ উঠে এলেন, যাঁদের আমরা খুব কম চিনতাম, কিংবা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তাঁদের পূর্ববর্তী ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের তেমন ধারণাই ছিল না।
মাহমুদুর রহমান মান্নার নাম ঘোষণার দিন থেকেই আমাদের মধ্যে বিস্ময় ছিল। তাঁর সম্পর্কে এতটুকুই জানতাম যে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি কবে ভর্তি হলেন, আদৌ ভর্তি হয়েছিলেন কি না, কিংবা ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত ছিলেন—এসব বিষয়ে আমাদের স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না।
এই অচেনা মানুষটিকেই এখন আমাদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মেনে নিতে হবে।
একদিন সন্ধ্যায় যথারীতি ৪২ নম্বর বলাকা ভবনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেলাম।
অফিসে ঢুকে দেখলাম, পরিবেশ শান্ত। নেতাকর্মীদের আনাগোনা শুরু হয়েছে, কিন্তু ভিড় এখনও জমেনি। সভাপতি কক্ষের সামনে এসে হঠাৎ চোখে পড়ল—মাহমুদুর রহমান মান্না ভাই বসে আছেন।
দৃশ্যটি আমাকে অবাক করেছিল।
নতুন নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদককে ঘিরে সাধারণত নেতাকর্মীদের ভিড় থাকার কথা। সবাই পরিচিত হতে চাইবে, কথা বলতে চাইবে, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা শুনতে চাইবে। কিন্তু সেখানে যেন এক ধরনের দূরত্ব কাজ করছিল। কেউ তাঁর কাছে এগিয়ে যাচ্ছিল না, তিনিও কাউকে ডাকছিলেন না।
আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর সাহস করে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
তিনি মুখ তুলে তাকালেন। মৃদু হাসলেন।
—”আসুন, বসুন।”
একটি সাধারণ বাক্য।
কিন্তু সেই “আসুন” শব্দটি আমার কানে যেন নতুন লাগল।
আমরা অভ্যস্ত ছিলাম অন্য ধরনের ভাষায়।
আমাদের সিনিয়র নেতারা সাধারণত কর্মীদের “তুই” বা “তুমি” বলেই সম্বোধন করতেন। মাহবুব ভাই আমাকে কখনও “তুই”, কখনও “তুমি” বলতেন। শরীফ নুরুল আম্বিয়াও “তুমি” বলেই ডাকতেন। তখন এটাকেই আমরা স্বাভাবিক বলে মনে করতাম।
কিন্তু মান্না ভাই সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তিনি সবাইকে “আপনি” বলে সম্বোধন করতেন।
কথা বলার সময় তাঁর কণ্ঠে কোনো কর্তৃত্বের চাপ ছিল না। বরং ছিল এক ধরনের সৌজন্য, সংযম এবং আন্তরিকতা। ছাত্ররাজনীতিতে এমন ভাষা আমরা আগে খুব একটা দেখিনি।
আমি তাঁর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললাম।
তিনি মন দিয়ে শুনছিলেন, ধীরে ধীরে উত্তর দিচ্ছিলেন। তাঁর কথার মধ্যে অযথা উত্তেজনা ছিল না, আবার অহংকারও ছিল না।
সেদিন অফিসে যতক্ষণ ছিলাম, অজান্তেই তাঁকে লক্ষ্য করছিলাম।
সন্ধ্যার আলোয় তাঁর মুখে এক ধরনের প্রশান্ত ভাব ছিল। মানুষের সঙ্গে কথা বলার ধরন, চোখের দৃষ্টি, হাসি—সব মিলিয়ে মনে হলো, এই মানুষটির মধ্যে আলাদা ধরনের ব্যক্তিত্ব আছে।
আমার প্রথম ধারণা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল।
রাজনীতিতে মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের ব্যক্তিত্বকে অস্বীকার করা যায় না।
সেদিনই সাংগঠনিক সম্পাদক গৌরাঙ্গ পালের সঙ্গেও দীর্ঘক্ষণ কথা হয়।
গৌরাঙ্গ পাল ছিলেন অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী মানুষ। তাঁর মধ্যে কখনও অহংকার দেখিনি। তবে তাঁকে সবসময় যেন একটু চিন্তিত, কিছুটা অস্থির বা বিষণ্ন মনে হতো। মুখে হাসি থাকলেও চোখে যেন এক ধরনের অজানা দুশ্চিন্তা লুকিয়ে থাকত।
সম্ভবত সাংগঠনিক দায়িত্বের চাপ, কিংবা ব্যক্তিগত স্বভাব—আজ আর নিশ্চিত করে বলতে পারি না।
প্রচার সম্পাদক ওয়ালিউল ইসলাম সেলিম ছিলেন ঠিক তার উল্টো।
সবসময় হাসিমুখ।
যে-ই কোনো প্রশ্ন করুক, ধৈর্য ধরে উত্তর দিতেন। তাঁর মধ্যে সহজে মিশে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। অফিসে ঢুকলেই মনে হতো, তিনি যেন পরিবেশটাকে প্রাণবন্ত করে তুলছেন।
সহ-সম্পাদক মোয়াজ্জেম ভাই ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র।
লম্বা-চওড়া গড়নের মানুষ।
অত্যন্ত কর্মঠ।
প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যার দিকে বলাকা ভবনে আসতেন। আজও তাঁর একটি ধূসর রঙের শার্ট চোখে ভাসে। মনে হতো, সেটিই যেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পোশাক। প্রায়ই সেই শার্ট পরেই অফিসে আসতেন।
তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক খয়ের এজাজ মওসুদের সঙ্গে আমার পরিচয়ও তখনই।
তাঁকে দেখে আমার প্রথম যে ধারণা হয়েছিল, তা হলো—তিনি যেন কোনো মাদ্রাসার ছাত্র। তাঁর চলাফেরা, পোশাক, কথাবার্তায় এক ধরনের গাম্ভীর্য ছিল।
তবে অতিরিক্ত তাত্ত্বিক আলোচনা পছন্দ করলেও সাধারণ কর্মীদের সঙ্গে তাঁর আচরণ সবসময় সহজ ছিল না। অনেকেই তাঁর কাছে স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন না।
পরে বিভিন্নজনের কাছে শুনেছিলাম, নোয়াখালীর সাংগঠনিক সমীকরণের ভিত্তিতেই তিনি এই পদে এসেছেন। এর আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা সম্পর্কে অন্তত আমার কোনো ধারণা ছিল না।
একইভাবে সহ-সভাপতি পদে নোয়াখালী থেকে নির্বাচিত হন সিরাজুদ্দিন।
তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মাঝে-মধ্যেই সেখানে রাত কাটিয়েছি। ছাত্রলীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি।
সেই সময় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু আতম গিয়াসউদ্দিন খিজির।
খিজিরের সঙ্গে প্রায়ই ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রোগ্রামে ঘুরেছি। ছাত্রলীগের কর্মীদের সঙ্গেও পরিচয় ছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই সময় সিরাজুদ্দিনকে কখনও উল্লেখযোগ্যভাবে সক্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে আমার চোখে পড়েনি। তাই তাঁকে কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দেখে আমিও বিস্মিত হয়েছিলাম।
আসলে ১৯৭৩ সালের কেন্দ্রীয় কমিটিতে এমন আরও কয়েকজন ছিলেন, যাঁদের ছাত্রলীগের পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ কর্মীদের ধারণা ছিল খুবই সীমিত।
এটাই সম্ভবত সম্মেলন-পরবর্তী অসন্তোষের অন্যতম কারণ ছিল।
তবে সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল সাংস্কৃতিক সম্পাদক সেলিমকে নিয়ে।
সম্মেলনের কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভা আহ্বান করা হয়।
আমি যথারীতি পাবলিক লাইব্রেরির দিকে যাচ্ছিলাম।
পাবলিক লাইব্রেরির সামনে এসে হঠাৎ দেখি, সেলিম ভাই এক তরুণীর সঙ্গে বসে গল্প করছেন।
সেই সময় পাবলিক লাইব্রেরির দক্ষিণ পাশটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এক জনপ্রিয় আড্ডাস্থল। বিকেল হলেই অসংখ্য তরুণ-তরুণী জোড়ায় জোড়ায় সেখানে বসে গল্প করতেন। সে সময়ের ঢাকা শহরে এমন নিরিবিলি জায়গা খুব বেশি ছিল না।
আমি অবাক হয়ে তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
হেসে বললাম,
—”সেলিম ভাই, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভা শুরু হয়ে গেছে, আর আপনি এখানে বসে আছেন?”
আমার কথা শেষ হতেই তাঁর মুখের ভাব বদলে গেল।
কিছুটা বিরক্ত হয়ে তিনি বললেন,
—”তুমি এখানে কেন?”
আমি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
আর কোনো কথা বাড়ালাম না।
হয়তো তাঁর ব্যক্তিগত সময়ে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে আমি তাঁকে বিব্রত করেছিলাম। আবার হয়তো তিনি মনে করেছিলেন, একজন অপেক্ষাকৃত জুনিয়র কর্মীর এমন প্রশ্ন করা উচিত হয়নি।
ঘটনাটি খুব ছোট ছিল।
কিন্তু আজও সেই দৃশ্যটি স্পষ্ট মনে আছে।
ছাত্ররাজনীতির ব্যস্ত জীবন, মিটিং-মিছিল, উত্তেজনা, ক্ষমতার লড়াই—এসবের মাঝেও প্রত্যেক নেতার একটি ব্যক্তিগত জীবন ছিল, ব্যক্তিগত অনুভূতি ছিল, ভালোবাসা ছিল।
সেই সময় হয়তো আমরা তা বুঝতাম না।
আজ এত বছর পরে ফিরে তাকালে মনে হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালেও তাঁরা সবাই ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ। তাঁদেরও ছিল স্বপ্ন, আবেগ, সম্পর্ক এবং একান্ত নিজস্ব কিছু মুহূর্ত।
আর বলাকা ভবনের সেই দিনগুলো—নতুন নেতৃত্ব, নতুন মুখ, নতুন ভাষা আর নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে—ধীরে ধীরে আমাদেরও বদলে দিচ্ছিল।
লেখক: হাবিব বাবুল
৭০ দশকের ছাত্রলীগের সংগঠক

