বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে—ক্ষমতা কখনো একা টিকে থাকে না, তাকে টিকিয়ে রাখে দল। আর দলকে টিকিয়ে রাখে সেইসব নেতাকর্মী, যারা প্রতিকূল সময়ে পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রায়ই সেই ত্যাগী মানুষদেরই ভুলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ইতিহাসের বহু অধ্যায়ে আমরা এই চিত্র দেখেছি, আর আজও তার ব্যতিক্রম ঘটছে না।
স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে যেসব নেতার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে তাদের মধ্যে রয়েছেন সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ স ম রব, শাজাহান সিরাজ, নূরে আলম সিদ্দিকী এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন। তারা কেবল রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, তারা ছিলেন একটি জাতির জাগরণের সহযাত্রী।
ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তারা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে আমরা এমন এক বাস্তবতা দেখেছি, যেখানে ইতিহাসের এই নির্মাতাদের অনেকেই একসময় প্রান্তিক হয়ে পড়েছেন।
মুজিব বর্ষ উপলক্ষে বছরজুড়ে নানা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে আলোচনা হয়েছে, স্মৃতিচারণ হয়েছে, নানা আয়োজন হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য—সেইসব অনুষ্ঠানে জীবিত প্রবীণ নেতাদের অনেকেই ছিলেন না আলোচনার কেন্দ্রে তাদেরকে দূরে রাখা হয়েছিলো অথচ তারাই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধুতে রূপান্তরিত করেছিলেন ।
একটি অনুষ্ঠানের দৃশ্য অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছিল। সেখানে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অপেক্ষাকৃত নবীন কয়েকজন নেতা—শাহরিয়ার আলম, জুনায়েদ আহমেদ পলকসহ আরও অনেকে। অথচ শ্রোতার আসনে বসে ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ আমির হোসেন আমু এবং তোফায়েল আহমেদ।
এক পর্যায়ে তোফায়েল আহমেদ অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এসএসএফ সদস্যরা তাকে থামিয়ে দেন, কারণ তখনো প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। পরে কয়েকজন নবীন নেতা এগিয়ে এসে তাকে বের হতে সহায়তা করেন।
এই ঘটনা নিছক একটি প্রটোকলগত বিষয় হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে ছিল রাজনীতির এক প্রতীকী বাস্তবতা—ইতিহাস নির্মাতারা একসময় দর্শকে পরিণত হন , এর মূল্য এখন আওয়ামীলীগকে দিতে হচ্ছে ।
আজ বাংলাদেশের আরেকটি বড় রাজনৈতিক দল বিএনপিতেও একই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, আন্দোলন, মামলা-হামলা, কারাবরণ—সবকিছুর মধ্য দিয়ে যারা একটি দলকে টিকিয়ে রেখেছিলেন, আজ তাদের অনেকেই যেন প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভেতরেও আজ এই বাস্তবতা নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে। দলের প্রবীণ এবং সিনিয়র নেতাদের একটি বড় অংশকে কার্যত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হচ্ছে—এমন অভিযোগ দিন দিন জোরালো হচ্ছে।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মইন খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন—এরা সবাই বিএনপির রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজ্ঞ নেতা। দীর্ঘ সময় ধরে তারা দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন সময়ে দলের পক্ষে সোচ্চার থেকেছেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা এবং উপস্থিতি যেন অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। দলীয় কর্মকাণ্ডে তাদের সক্রিয় উপস্থিতি খুব একটা দেখা যায় না, কিংবা তাদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে—সেটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
শুধু প্রবীণ নেতারাই নন, মধ্যম সারির অনেক অভিজ্ঞ নেতার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
হাবিবুন্নবী খান সোহেল, ময়াজ্জেম হোসেন আলাল, আসাদুজ্জামান রিপন, আজিজুল বারী হেলাল—এরা সবাই বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। আন্দোলনের কঠিন সময়ে তারা ছিলেন রাজপথে, মিডিয়ায়, জনমতের লড়াইয়ে।
দলের দুঃসময়ে যখন অনেকেই নীরব ছিলেন, তখন এই নেতাদের অনেকেই ছিলেন সামনে। কিন্তু আজ তাদের রাজনৈতিক অবস্থান এবং ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের অনেককেই কার্যত অবমূল্যায়নের শিকার হতে দেখা যাচ্ছে।
এই বাস্তবতা কেবল ব্যক্তিগত হতাশার বিষয় নয়; এটি একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—দল হিসেবে বিএনপির সাম্প্রতিক সময়ে দৃশ্যমান কার্যক্রম প্রায় নেই বললেই চলে। সরকার গঠনের পর দীর্ঘ সময় পার হলেও দলীয় নীতিনির্ধারণী সভা, বড় ধরনের সাংগঠনিক কর্মসূচি কিংবা তৃণমূলকে সক্রিয় করার মতো কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না।
রাজনৈতিক দল যদি নিজেই নীরব হয়ে যায়, তাহলে সেই দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার করিডোরে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি মূলত সংগঠনের শক্তির উপর দাঁড়িয়ে থাকে। হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিশ্বাস, ত্যাগ এবং আবেগ মিলেই একটি রাজনৈতিক দল তৈরি হয়।
যদি সেই দল ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে, যদি মাঠের রাজনীতি থেমে যায়, তাহলে সরকারের শক্তিও ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে শুরু করে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে আওয়ামী লীগ সরকার শক্তিশালী ছিল, কিন্তু অনেক পর্যবেক্ষকের মতে দলীয় কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করেছিলেন।
ফলে যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে, তখন দেখা যায় সরকার থাকলেও দলীয় কাঠামো আগের মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া খুবই জরুরি।
কারণ রাজনীতির সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো—দলই সরকারকে টিকিয়ে রাখে। সরকার কখনো দলকে টিকিয়ে রাখতে পারে না।
যদি একটি দল তাদের ত্যাগী কর্মীদের ভুলে যায়, যদি প্রবীণ নেতাদের অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করে, যদি মধ্যম সারির নেতৃত্বকে পাশে না রাখে—তাহলে সেই দলের ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব আসবে, নতুন প্রজন্ম সামনে এগিয়ে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অগ্রযাত্রা কখনোই অতীতকে অস্বীকার করে নয়।
বরং অতীতের ত্যাগ, সংগ্রাম এবং অভিজ্ঞতাকে সম্মান করেই ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করতে হয়।
আজ সময় এসেছে রাজনৈতিক দলগুলোকে সেই সত্যটি আবার মনে করার। কারণ ইতিহাস আমাদের একটি কথাই বারবার মনে করিয়ে দেয়—
দলকে দুর্বল করে কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

