ইরান ইস্যুতে ট্রাম্পের কৌশলকে ‘টাইটানিকের সস্তা টিকিট’ বললেন ফরাসি জেনারেল ইয়াকোভলেফ

ফ্রান্সের প্রখ্যাত সামরিক ব্যক্তিত্ব মিশেল ইয়াকোভলেফ সম্প্রতি ইরান ইস্যুতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর কৌশলকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তিনি ট্রাম্পের উদ্যোগকে “টাইটানিক ডুবি-এর পরে সস্তায় টিকিট কেনার” সঙ্গে তুলনা করে এটিকে এক ধরনের বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ইয়াকোভলেফ কোনো সাধারণ বিশ্লেষক নন। তিনি ফরাসি সেনাবাহিনীর একজন থ্রি-স্টার জেনারেল, কিংবদন্তিতুল্য ফরাসি ফরেন লিজিয়ন-এর প্রাক্তন কমান্ডার এবং ন্যাটো-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে তার মতামত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক উদ্যোগে ইউরোপীয় দেশগুলোকে যুক্ত করার প্রচেষ্টা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইয়াকোভলেফ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরেন, কেন ইউরোপের উচিত এ ধরনের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা।

প্রথমত, তিনি বলেন ট্রাম্প ন্যাটোর কার্যপ্রণালী সঠিকভাবে বোঝেন না। কোনো দেশ একতরফাভাবে সামরিক অভিযান শুরু করে পরে মিত্রদের আমন্ত্রণ জানাতে পারে না। ন্যাটোর ক্ষেত্রে একটি ঐক্যবদ্ধ কমান্ড, একক নেতৃত্ব এবং সমন্বিত পরিকল্পনা অপরিহার্য।

দ্বিতীয়ত, এই অভিযানের কোনো স্পষ্ট কৌশলগত লক্ষ্য নেই। হরমুজ প্রণালী খোলা রাখা ছাড়া এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য কী—শাসন পরিবর্তন, প্রতিরোধ, নাকি কূটনৈতিক সমাধান—তা অস্পষ্ট।

তৃতীয়ত, ইয়াকোভলেফ তীব্রভাবে সমালোচনা করেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বারবার অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে কোনো বহুজাতিক সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। মিত্রদের জন্য সুস্পষ্ট, লিখিত এবং স্থিতিশীল নীতি অপরিহার্য।

চতুর্থত, তিনি বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটের কথা উল্লেখ করেন। অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন মিত্রদের প্রতি অঙ্গীকার রক্ষা করেনি—এমন উদাহরণ হিসেবে কুর্দি ও আফগান পরিস্থিতির কথা উঠে আসে। ফলে ভবিষ্যতেও একই আচরণের আশঙ্কা থেকে যায়।

পঞ্চমত, ইয়াকোভলেফ মার্কিন সামরিক শিক্ষার একটি নীতি তুলে ধরেন—“ব্যর্থতাকে শক্তিশালী করা উচিত নয়, বরং বিকল্প পথ খুঁজতে হবে।” এই নীতির আলোকে তিনি বর্তমান কৌশলকে একটি গুরুতর ভুল বলে অভিহিত করেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও ছিল নেতিবাচক। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন—সবাই এই উদ্যোগে অংশগ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সময়ে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, ফলে বীমা কোম্পানিগুলো তেলবাহী জাহাজের বীমা করতে অনিচ্ছুক।

উল্লেখ্য, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। এর ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে এবং সাধারণ ভোক্তারা এর প্রভাব অনুভব করছেন।

সব মিলিয়ে, ইয়াকোভলেফের মন্তব্য আন্তর্জাতিক পরিসরে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—অপরিকল্পিত ও অস্পষ্ট সামরিক কৌশল কেবল মিত্রদের দূরে সরিয়ে দেয় এবং বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা বাড়ায়।

প্রতিবেদন (অনুলিখন: মাহবুবুল হক)

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.