স্মৃতির ভেতর বেঁচে থাকা গোলাম মাহমুদ

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল এক মানবিক, শোষণমুক্ত সমাজের। সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে যারা আজীবন লড়ে গেছেন, গোলাম মাহমুদ ছিলেন তাঁদেরই একজন। বয়সে আমার চেয়ে বড় হলেও আমাদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো—সহযোদ্ধার মতো। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্ক, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গভীর ও দৃঢ় হয়েছে।

গোলাম মাহমুদ ছিলেন বিরল এক মানুষ। অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি কখনোই ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বা পারিবারিক জীবনের মোহে নিজেকে জড়াননি। পার্টিই ছিল তাঁর জীবন, পার্টিই ছিল তাঁর পরিবার। কর্মীদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম—নিঃস্বার্থ, নির্ভেজাল। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানে মানুষের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেওয়া, আর সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি সারাজীবন আপসহীন সংগ্রামের পথে থেকেছেন।

আমার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত উদ্বেগ, কিংবা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ—সবকিছুতেই তিনি ছিলেন এক নির্ভরতার নাম। ২০১৫ সালের এই দিনে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাসদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঢাকা মহানগরের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে। অসুস্থ শরীর নিয়েও পার্টির কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি—এটাই ছিল গোলাম মাহমুদ।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর দিনগুলোতে, আন্দোলন-সংগ্রামের উত্তাল সময়ে, তাঁর সান্নিধ্য ছিল আমাদের জন্য এক ধরনের ছায়া—আপদে-বিপদে ভরসার জায়গা। তখন পশ্চিম বাংলায় নকশালবাড়ি আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। সেই সময় মাহমুদ ভাই আমাকে আর নাজির মোহাম্মদ খান খসরুকে নিয়ে যেতেন ১৪ নম্বর বাংলাবাজারের চলন্তিকা বইঘরে। সেখান থেকে আমরা সংগ্রহ করতাম সেই সময়ের মার্ক্সবাদী পত্রিকা—পূর্ব তরঙ্গ, লাল ইশতেহার, অনীক, পিকিং রিভিউ, গণশক্তি ইত্যাদি। বই আর পত্রিকার পাতায় পাতায় আমরা খুঁজে ফিরতাম বিপ্লবের ভাষা, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন।

মাহমুদ ভাইয়ের বাড়ি ছিল কে এম দাশ লেনে। আমরা মাঝেমধ্যেই সেখানে যেতাম। সেই বাড়িটি ছিল যেন এক ছোট্ট রাজনৈতিক পাঠশালা—আলোচনা, বিতর্ক, পরিকল্পনা আর স্বপ্নে ভরা। ১৯৭৫ সালে আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে তাঁর সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি আজও আমার মনে অমলিন। ভয়, অনিশ্চয়তা, রাষ্ট্রীয় দমন—সবকিছুর মাঝেও তাঁর দৃঢ়তা আমাদের সাহস জুগিয়েছে। সেসব দিন কখনো ভুলবার নয়।

গোলাম মাহমুদ ছিলেন নীরব কর্মী। প্রচারের আলো তিনি চাননি। নেতৃত্ব মানে যে কর্তৃত্ব নয়, বরং দায়িত্ব—এই সত্যটি তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না। যা বিশ্বাস করতেন, তাই বলতেন; যা বলতেন, তাই করতেন। তাই সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন নেতা নন, একজন অভিভাবকও।

আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে আমরা তাঁকে স্মরণ করি গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায়। শারীরিকভাবে তিনি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু স্মৃতিতে, আদর্শে, সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি আজও বেঁচে আছেন। আমাদের প্রত্যেকটি আন্দোলনে, প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি ন্যায়ের দাবিতে তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়।

গোলাম মাহমুদের মতো মানুষেরা কখনো সত্যিকার অর্থে চলে যান না। তাঁরা থেকে যান মানুষের স্মরণে, ভালোবাসায়, আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংগ্রামের প্রেরণায়। আজ এই দিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে ফিরে দেখা নয়—বরং তাঁর আদর্শকে নতুন করে ধারণ করার অঙ্গীকার করা।

তিনি বেঁচে থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে, আমাদের লড়াইয়ে, আমাদের ভালোবাসায়।

লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক: শুদ্ধস্বর ডটকম ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.