জেবা আমিনা খানের ‘ভেরি ভেরি’ সংসদ এবং বেংলিশ রাজনীতির নতুন অধ্যায়

জাতীয় সংসদ একটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বুদ্ধিবৃত্তিক মান এবং গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম প্রতীক। সেখানে যে ভাষায় কথা বলা হয়, যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয় এবং যে মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে, তা শুধু সংসদ কক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক চরিত্রেরও প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। সেই কারণেই সংসদে কোনো বক্তব্য যখন আলোচনার বদলে বিস্ময়, প্রশংসার বদলে পরিহাস এবং যুক্তির বদলে ভাষাগত বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, তখন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

সম্প্রতি সংসদ সদস্য জেবা আমিনা খানের বক্তব্য এমনই এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে মূলত ইংরেজিতে বক্তব্য রাখার চেষ্টা করেছেন, তবে সেই ইংরেজির মধ্যে ছিল বাংলার শব্দ, বাংলা উচ্চারণ, ভাঙা বাক্যগঠন এবং এমন এক ভাষিক মিশ্রণ, যাকে হয়তো অভিধানে “বেংলিশ” বলা যায়, কিন্তু সংসদীয় ভাষা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন।

তিনি বলেছেন, “দ্য রাস্তাজ আর এ ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন।” এখন প্রশ্ন হলো, রাস্তা কি “সিচুয়েশন” হয়, নাকি রাস্তার অবস্থা সিচুয়েশন হয় ? ব্যাকরণকে যদি কিছু সময়ের জন্য ছুটিতে পাঠিয়েও দেওয়া হয়, তবুও বাক্যটি শুনে মনে হয় যেন ভাষা নিজেই আত্মসমর্পণ করেছে। এরপর তিনি বলেন, “দিস ইজ ডিউ টু দ্য দুর্নীতি।” এখানে দুর্নীতি শব্দটিকে ইংরেজি বাক্যের মাঝখানে বসিয়ে এমন এক আন্তর্জাতিক মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যা হয়তো দুর্নীতিও নিজে কখনো আশা করেনি।

সংসদে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটি বাংলাদেশে নিছক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়। এই রাষ্ট্রের জন্মের ইতিহাস ভাষা আন্দোলনের রক্তমাখা পথ ধরে এসেছে। সেই সংসদে কেউ ইংরেজিতে বক্তব্য রাখতেই পারেন—এ নিয়ে আপত্তির সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেটা কি কার্যকর যোগাযোগের জন্য, নাকি ভাষাগত প্রদর্শনীর জন্য? ইংরেজি বলার অধিকার যেমন আছে, তেমনি সেই ইংরেজি যদি বক্তব্যের চেয়ে বিভ্রান্তি বেশি তৈরি করে, তবে সমালোচনাও স্বাভাবিক।

আরেকটি প্রশ্ন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জেবা আমিনা খান কে?

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তার নাম খুব পরিচিত ছিল না। তিনি কোন পর্যায়ে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কোন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, কোন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেছেন—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষের মতো বিএনপির বহু নেতাকর্মীর মধ্যেও কৌতূহল দেখা দিয়েছে। রাজনীতিতে নতুন মুখ আসবে, সেটি স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু যখন একজন নতুন মুখ সরাসরি জাতীয় সংসদে এসে এমনভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন যে তার বক্তব্যের বিষয়বস্তু নয়, বরং ভাষা আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

তবে জেবা আমিনার বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—তিনি আন্তরিকভাবে কিছু বলতে চেয়েছেন। শিক্ষা, শিশুর বিকাশ, রাজস্বের সঠিক ব্যবহার, দুর্নীতি প্রতিরোধ—এসব বিষয়ে তার বক্তব্যের মূল বার্তা খারাপ ছিল না। কিন্তু সমস্যা হলো, বার্তার চেয়ে বাহন যখন বেশি আলোচিত হয়ে যায়, তখন গন্তব্যে বার্তা পৌঁছায় না।

তিনি শিশু শিক্ষার প্রসঙ্গে “অ্যাবজরবেন্ট মাইন্ড” থেকে শুরু করে “ফাউন্ডেশন স্টেজ” পর্যন্ত নানা ধারণা তুলে ধরেছেন। শুনে মনে হচ্ছিল সংসদ যেন হঠাৎ করে কোনো আন্তর্জাতিক মন্টেসরি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় পরিণত হয়েছে। বক্তৃতার এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল বাজেট আলোচনার চেয়ে শিশুমনের বিকাশ এবং যুক্তরাজ্যের শিক্ষাক্রম নিয়েই আলোচনা বেশি হচ্ছে। সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু বাজেট বিতর্কে বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো, পুরো বক্তব্য চলাকালে স্পিকারও কোনো আপত্তি তোলেননি। সংসদের কার্যপ্রণালীতে বাংলা ব্যবহারের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। সেখানে বাংলা, ইংরেজি এবং ভাঙা বাক্যগঠনের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণকে অনায়াসে চলতে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রশ্ন জাগে—সংসদের ভাষাগত মানদণ্ড কি এখন আর কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়?

কেউ কেউ বলছেন, ভাষা তো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম। বক্তব্যের সারবস্তুই আসল। কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু সংসদ কেবল কথোপকথনের জায়গা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সেখানে ভাষা, উপস্থাপনা, যুক্তি এবং অভিব্যক্তি—সবকিছুই গুরুত্ব বহন করে। একজন সংসদ সদস্য যখন বক্তব্য দেন, তখন তিনি কেবল নিজের প্রতিনিধিত্ব করেন না; তিনি তার নির্বাচনী এলাকা, তার রাজনৈতিক দল এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রেরও প্রতিনিধিত্ব করেন।

জেবা আমিনা খানের বক্তব্য শুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ বলছেন এটি “ইন্টারন্যাশনাল বাংলা”, কেউ বলছেন “গ্লোবাল বেংলিশ”, আবার কেউ কেউ নতুন ভাষার নামও প্রস্তাব করেছেন। কিন্তু হাস্যরসের আড়ালে একটি গুরুতর বাস্তবতা আছে। আমাদের রাজনীতিতে কি এখন বক্তব্যের মানের চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেশি? যোগ্যতার চেয়ে মনোনয়ন কি বেশি শক্তিশালী? এবং সংসদ কি ধীরে ধীরে এমন এক মঞ্চে পরিণত হচ্ছে, যেখানে বক্তব্যের গুণগত মান নিয়ে আর বিশেষ মাথাব্যথা নেই?

জেবা আমিনা খানের বক্তব্য হয়তো কয়েকদিনের মধ্যেই মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রলও নতুন কোনো ইস্যুর কাছে হার মানবে। কিন্তু যে প্রশ্নগুলো এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উঠে এসেছে, সেগুলো থেকে যাবে। সংসদে ভাষার মান কী হবে? নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মানদণ্ড কী? এবং জনগণের সর্বোচ্চ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় সংসদ নিজের মর্যাদা কতটা রক্ষা করতে পারছে?

বাংলাদেশের মানুষ অনেক কিছু মেনে নিতে শিখেছে। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ভঙ্গ, উন্নয়নের গল্প, দুর্নীতির অভিযোগ—সবই তারা বারবার শুনেছে। কিন্তু জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যখন “দ্য রাস্তাজ আর এ ভেরি ভেরি ব্যাড সিচুয়েশন” ধরনের বাক্য রাষ্ট্রীয় আলোচনার অংশ হয়ে যায়, তখন মানুষ হাসে ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কিছুটা হতাশাও থাকে।

কারণ সংসদে মানুষ কৌতুক দেখতে চায় না; তারা নেতৃত্ব দেখতে চায়। তারা ভাষার জগাখিচুড়ি নয়, চিন্তার স্বচ্ছতা দেখতে চায়। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা এমন প্রতিনিধিত্ব দেখতে চায়, যা শুনে গর্ব হয়—বিভ্রান্তি নয়।

হয়তো জেবা আমিনা খান ভবিষ্যতে আরও পরিণত হবেন, আরও প্রস্তুত হয়ে বক্তব্য দেবেন। সেটাই প্রত্যাশা। কারণ ব্যক্তিকে নিয়ে হাসাহাসি করার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিষ্ঠানকে মর্যাদার জায়গায় রাখা। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত সংসদের ইতিহাসে তার এই বক্তৃতা অন্তত একটি বিষয় প্রমাণ করে রাখবে—বাংলা ও ইংরেজির মিলনে নতুন ভাষা সৃষ্টি করা সম্ভব, তবে সেটিকে সংসদীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে হলে জনগণকে আরও অনেক “ভেরি ভেরি” ধৈর্য ধরতে হবে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.