“জলের শ্যাওলা”- গত সরকারের আমলে স্পষ্টতই একটি বয়ান চলতো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষ। গত সরকার আমলে এই পক্ষ- বিপক্ষ যতটা তীব্র আকারের ছিল, বর্তমান সময়কালে হিসেব কষলে সেই তীব্রতাই খুঁজে পাওয়া যায় তবে একটু ভিন্ন মাত্রায়। লক্ষ্য করুন, গত সরকারের আমলে আওয়ামীদের প্রচার ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষ এবং যা অস্বাভাবিকও ছিল না কারণ আওয়ামীরা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী দল হিসেবে নিজেদের দলীয় ও সরকারের নানান দূর্বলতা ঢাকার কৌশল হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে দেশ দুইভাগে বিভক্ত বলে প্রচার চালাতো। ধরেই নিচ্ছি আওয়ামীরা নিজেদের বাঁচাতেই ওই কৌশল অবলম্বন করতো। আওয়ামীদের কৌশল সাধারণ জনমানুষ যে খুব বেশি গ্রহণ করেছিল তা কিন্ত জোর দিয়ে বলা যাবে না। এমনকি গত সরকার আমলে বিরোধীদের পক্ষ থেকে এই পক্ষ- বিপক্ষ নিয়ে বহু কটাক্ষ শোনা যেত এবং যে কারণেই হোক আওয়ামীদের বয়ান এই পক্ষ- বিপক্ষের বিষয়ে জনমানুষেরা খুব বেশি বিশ্বাসও করতো না এবং কোন মূল্যও দিত না। তবে বর্তমান সময়ে একটু পর্যবেক্ষণ করুন, কি দেখতে পান? যদি সততার সাথে উত্তর প্রদান করেন তাহলে এটা নিশ্চিত বলাই যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষ বাস্তবিক অর্থেই তীব্রতার সাথেই আছে এবং এটা একটি বিষফোঁড়ার মতন হয়ে প্রকাশ পেয়েছে এবং সেটা বর্তমানে বেশ পরিষ্কারভাবেই দৃশ্যমান। এটা অস্বীকার করার কোন উপায় আছে কি?
আরও লক্ষ্য করুন, যে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষ নিয়ে গত আমলে আওয়ামীদের এত এত কথা শোনাতো এবং কটাক্ষ করতো, সেই বিএনপিই এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ- বিপক্ষের বর্তমান ধারক বাহক হয়ে উঠেছে। তাহলে বিষয়টি কি দাঁড়ায়? আওয়ামী আমলে যে আওয়ামীরা বলতো, সেটা সত্যিই খুব বেশি মিথ্যা ছিল কী? আবার উল্লেখ করি, আওয়ামীরা নিজেদের নানান দুর্বলতাকে ঢাকতে এই পক্ষ- বিপক্ষের ট্রামকার্ড অবশ্যই খেলতো তবে সব যে ওই ট্রামকার্ড ছিল তা মোটেও নয়। বর্তমান সময়ের হিসেবে এটা অন্তত বলাই বাহুল্য যে, গোপনে, নীরবে, কৌশলে অথবা আওয়ামীদের ভয়ে, যাই হোক বা যেভাবেই হোক, মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের মতামতটি তুষের আগুনের মতন ছিল এবং সেটাই সুযোগ বুঝে এখন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে এবং জ্বলছে এবং এটাও নিশ্চয়ই স্পষ্টতই বলা যায়, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এই বিষয়ে সহায়তায় হচ্ছে, এমনটা যদি নাও বলি, এ সরকারের এ বিষয়ে কোন মাথা ব্যথাই যেন নেই, এ কথা বললে খুব বেশি ভুল হবার নয়, নিশ্চয়ই।
৭১ কী? মুক্তিযুদ্ধ কী? দেশের জন্মসূত্র কী? এ বিষয়গুলো নিয়ে মূলত ততদিন পর্যন্ত আলোচনা বহাল থাকা উচিত এবং আমি মনে করি থাকবে, যতদিন এই দেশটি বহাল আছে। জ্বি হা একটি রাষ্ট্রের জন্মসূত্র জনম জনম এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মকে জানান দিতেই হয়। একটি দেশের জন্মসূত্রকে অবজ্ঞা করে বা অপমান করে খুব বেশি দূর এগিয়ে যাবার সুযোগ থাকে না কেননা দেশপ্রেম তাহলে আসবে কোথা থেকে? দেশটির স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি সেই দেশপ্রেমটি এখনও জনমানুষের মাঝে জাগ্রত আছে বলেই মনে করি। কিভাবে বা কেমন করে সেটা অনুধাবন হয়? একটি উদহারণ দিলে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার হবে। পাঁচ আগস্টের পর থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের অহরহ অপমান করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা দেওয়া হয়েছে। আমি কিন্ত বলছি না যে, মুক্তিযোদ্ধা মানেই সততায় ভরপুর তবে দেশের জন্মের জন্য অবদানের অংশটুকু ছোটো করে দেখার কোন সুযোগ নেই। লক্ষ্য করে থাকবেন, জুতার মালা দেওয়ার পরেও কিন্ত মুক্তিযোদ্ধা পাওয়া নাম বা উপাধিটাই ব্যবহার হয়েছে। সেটি এক পক্ষ বেদনার সাথে বলেছে এবং আরেক পক্ষ আনন্দে তবে মুক্তিযোদ্ধা এই শব্দটি সংযুক্ত ছিল।
অপর দিকে লক্ষ্য করুন, জুলাইযোদ্ধা যে বলা হয়, ওটাতো সাম্প্রতিককালের মাত্র বছর হলো। উদহারণস্বরুপ ভাবুন, একজন জুলাইযোদ্ধা দেশের সুপরিচিত মুখ ব্যারিস্টার ফুয়াদ বরিশালে অপমানিত বা অপদস্থ হলো। তবে কেউ নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন না যে, একজন জুলাইযোদ্ধাকে অপদস্থ বা অপমান করা হয়েছে। এমনটা নিশ্চয়ই কেউ বলেনি, ‘জুলাইযোদ্ধা’ বলে। আমি কিন্ত এখানেও শুদ্ধ বা অশুদ্ধ বা তুলসি পাতা, এমন কিছু নিয়ে লিখছি না। স্রেফ উদহারণস্বরুপ বলছি, জুলাইযোদ্ধা বলা হয়নি তবে একজন মুক্তিযোদ্ধার ক্ষেত্রে সর্বদাই মুক্তিযোদ্ধা উচ্চারিত হয়েছে। জানি না পার্থক্যটি সবার অনুধাবন হবে কিনা?
আরও একটি উদহারণ দেই। বৈদেশ থেকে এই দেশের সন্তানেরাই (অবশ্যই বিশেষ কিছু সন্তানদের কথা বলছি) বিজয়ের মাস, বিজয় দিবস, মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিযোদ্ধা এগলো নিয়ে চরমভাবে এবং অকাট্য ভাষায় এবং মনের মাধুরী মাখিয়ে, যা ইচ্ছে তাই বলেই যাচ্ছে। অবশেষে গতকালই দেশের সংগ্রামের আঁতুরঘর ঢাবিতে তাদের কুশপুত্তলিকা জ্বালানো হলো। হ্যা হাতে গুনে কয়েকজন ছিল তবে লক্ষ্যণীয যে, কেউ বাঁধা দিতে আসেনি এবং প্রতিরোধও আসেনি। যদিও বর্তমানে এই ঢাবির চিত্র একান্তই আলাদা। উল্টো বলাই বাহুল্য যে, নীরবে সহমত ছিল প্রতিবাদে। ওই যে লিখলাম বর্তমানে ঢাবির চিত্র ভিন্ন, হতে পারে ভয় একপ্রকার ক্রিয়া করেও থাকতে পারে তবে নীরব সহমত নিশ্চিত ছিল। কেন? কেননা এই ঢাবিই ছিল স্বাধীনতার আঁতুরঘর যে। যত কথাই বলা হোক না কেন, আঁতুরঘর তার ইতিহাস জানে এবং কঠিন সময় পাড় করছে বটে তবে ইতিহাহের ইতিহাস ঢাবি সেই ইতিহাসের প্রতি সম্মান নিশ্চিত ফিরিয়ে আনবেই বলে মনে করি। কেননা ইতিহাস বড়ই কঠিন ও ভূঁইফোড় হয়েই ফিরে বারবার।
২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থান দেশের একটি সত্য ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক ইতিহাস। তবে স্মরণে রাখা ভাল যে, এই ২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থান ৭১ এ স্বাধীন দেশের অনেক অভ্যুত্থানের মতন একটি অভ্যুত্থান। হ্যা অনেক বড় অভ্যুত্থান অন্যান্য অভ্যুত্থানের চেয়ে। সেগুলো সবই ঠিক আছে তবে কোনভাবেই বা যে কোন পদ্ধতিতে শত চেষ্টা করেও ২৪ কে ৭১ সম করা যায় না যে। এই চেষ্টাটা সর্বোচ্চ ভুলগুলো একটি ভুল। বাস্তবিক সত্য হলো, এমন চেষ্টার ফলেই মাত্র দেড়বছর পাড় না হতেই ২৪ কিন্ত ইতিমধ্যেই মুখ থুবরে পড়েছে। স্বীকার করুন আর নাইবা করুন, ২৪ এর অভ্যুত্থানের প্রতি মানুষের যে টান মানুষ হৃদয়ে ছিল, সেটায় বড় রকমের ছেদ ঘটে পড়েছে। হ্যা বহুবিধ কারণ নিহিত আছে বটে তবে ওই যে অপচেষ্টা ছিল ২৪ কে ৭১ সম করার। ওটাই ইউটার্ন নিয়েছে এবং যত বেশি চেষ্টা করা হবে ২৪ কে ৭১ সম করার, ততবেশি এবং ততদ্রুত ২৪ বিনষ্ট হবেই হবে। বিষয়টি মূলত দেনির জন্মসূত্রের সাথে একটি মনোবিজ্ঞানের ক্রিয়া কিন্ত।
লেখার শেষ পর্যায়ে একটি আপন উপলব্ধির কথা বলি। আজই সম্ভবত নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে যাচ্ছে। আমি এখানে নির্বাচন নিয়ে লিখছি না তবে নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ- মুক্তিযোদ্ধা, ৭১, স্বাধীনতা, দেশের জন্মসূত্র এ বিষয়গুলো ২৪ অভ্যুত্থানের পরে যতভাবে সামনে এসেছে, নির্বাচনে এ বিষয়গুলো মোটেও ক্রিয়া করবে না বলেই ধারণা করি। কেন ? ওটা লিখতে হলে ভিন্ন কলাম লেখা প্রয়োজন হবে, আজকৈ এই লেখাতে নয়। তবে ছোট্ট করে বলি, বাংলাদেশের ভোটের বাজার বহু বিশেষণের উপর নির্ভরশীল এবং বহু প্রকারভেদের উপর’ও। মূলত আমাদের দেশের ভোট যতটা না রাষ্ট্রের স্বার্থের কথা মাথায় রেখে হয়, তারচেয়েও বেশি প্রভাব থাকে ভিন্ন স্বার্থের। এই ভিন্ন প্রভাব সবারই বেশ জানা এবং কত প্রকার ও কি কি এবং কত বহুবিধ? অবশেষে একটি ভোট হতে যাচ্ছে। শত প্রশ্নকে পাশ কাটিয়েই লিখছি, এটাইবা কম কি? কেননা যেভাবেই হোক দেশটিকে বাঁচাতে হলে একটি নির্বাচিত সরকারের অতীব প্রয়োজন যে।
বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম
Related