বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে গণতন্ত্র মঞ্চ দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে তাদের নেতৃত্ব, অবস্থান এবং অংশগ্রহণের কারণে এই মঞ্চের নেতারা দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক দমন–পীড়নের সময়গুলোতে রাজপথে তাদের ভূমিকা কম উল্লেখযোগ্য নয়। মিডিয়ার ক্যামেরায় তারা প্রায়শই উচ্চারিত হয়েছেন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের মুখপাত্র হিসেবে।
কিন্তু আন্দোলনের রাজনীতি ও নির্বাচনের রাজনীতি এক নয়—এই সত্যটি হয়তো বাস্তব পরিস্থিতিতে এসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়, গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা নির্বাচনী আসন বণ্টন নিয়ে বিএনপির প্রতি ক্ষোভ ও অভিমান প্রকাশ করছেন। তাদের বক্তব্য ও বিবৃতিতে ফুটে উঠেছে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার হতাশা। মনে হয়েছে, তারা আরও বেশি আসন প্রত্যাশা করেছিলেন এবং সেক্ষেত্রে বিএনপির ছাড় না পাওয়ায় তারা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন।
তবে বাস্তবতা হলো—
গণতন্ত্র মঞ্চের অধিকাংশ দলের পর্যায়ে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি নেই; নেই নিজস্ব বৃহৎ ভোটব্যাংক , জনসমর্থন ভোটকেন্দ্রের লাইনে—সেখানে তাদের উপস্থিতি প্রায় থাকবে না বললেই চলে। বিএনপি যদি উদারতা দেখিয়ে আসনও দিত, তবুও জয়ের নিশ্চয়তা থাকতো না। ভোট শুধু আন্দোলনের পুরস্কার নয়, এটি কঠিন রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশের ফল।
বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যেটা করেছে—তা নিছক স্বার্থপরতা নয় বরং একটি নির্বাচনী বাস্তবতা। তারা এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে চাইবে যারা জেতার সক্ষমতা রাখে, যার পেছনে সংগঠন আছে, মাঠ দখলে রাখার শক্তি আছে, এবং যার নামে ভোট গণনা হয়। শুধু আন্দোলনের ছবি পত্রিকার পাতায় ছাপা হওয়ার কারণে কেউ নির্বাচনে জিতে আসবে—এমন ধারণা রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের উচিত ছিল আগে থেকেই এ বাস্তবতা অনুধাবন করা। যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসতো, তবে তারা কিভাবে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে, ক্ষমতার কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করবে—এই কৌশল আগে থেকেই নির্ধারণ করা প্রয়োজন ছিল। নির্বাচনের আগ মুহূর্তে অভিমানের রাজনীতি করে আসন প্রত্যাশা করে যাওয়ায় লাভ কম, ক্ষতি বেশি।
ছোট দল বড় করে কথা বলতে পারে, বড় লড়াইয়ে নামতে পারে, কিন্তু বড় জয়ের জন্য প্রয়োজন বড় সংগঠন, ভোটের হিসাব, মাঠে কাজ করার শক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্য জনভিত্তি। এই জায়গায় গণতন্ত্র মঞ্চ এখনো সীমিত। বাস্তবতা স্বীকার না করলে হতাশা আরও বাড়বে, রাজনীতির পথ সংকুচিত হবে।
আন্দোলন তাদের সম্মান দিয়েছে, স্বীকৃতি দিয়েছে—
কিন্তু ভোট ক্ষমতা দেয়, আর ক্ষমতায় যেতে হলে দরকার জনসংযোগ, তৃণমূল সংগঠন এবং বাস্তবমুখী রাজনৈতিক কৌশল।
এই শিক্ষা যত দ্রুত আত্মস্থ করা যাবে, তত দ্রুত গণতন্ত্র মঞ্চ তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে পারবে। অভিমান যদি যৌক্তিক কৌশলে পরিণত হয়—তবেই সামনে এগোনোর পথ তৈরি হবে।
হাবিব বাবুল, প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম ।

