প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : বাংলাদেশের কূটনীতিতে আঞ্চলিক ভারসাম্যের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তাঁর প্রথম চীন সফর এবং সামগ্রিকভাবে প্রথম দিককার উচ্চপর্যায়ের বিদেশ সফরগুলোর একটি। সফরটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন বৈশ্বিক রাজনীতি দ্রুত বহুমেরুকেন্দ্রিক রূপ নিচ্ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ায় চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে এই সফরকে শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির আলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয়ে অগ্রগতি অর্জন করা। বেইজিংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সবুজ জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।

সফরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জনের মধ্যে একটি হলো বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী চীনের বাজারে আরও বেশি বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া। প্রধানমন্ত্রী চীনের কাছে আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, পাটজাত পণ্য, চামড়া ও ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। চীনও বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি মানসম্পন্ন পণ্য আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এই ঘাটতি কমানোর উদ্যোগ সফল হলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করবে।

অবকাঠামো খাতেও সফরটি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকার চীনের কাছে বিভিন্ন বৃহৎ প্রকল্পে অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চেয়েছে। বিশেষ করে সড়ক, সেতু, পরিবহন ও শিল্পায়ন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো আলোচনায় এসেছে। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ এবং সম্ভাব্য নতুন বিনিয়োগ বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তিস্তা প্রকল্প ও নদী ব্যবস্থাপনা সহযোগিতাও সফরের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বাংলাদেশ ও চীন তিস্তা নদীসহ অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা ইস্যু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এই খাতে চীনের সম্পৃক্ততা নিঃসন্দেহে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে।

তবে সফরের মূল্যায়ন করতে গিয়ে শুধু অর্জনের তালিকা তৈরি করলেই চলবে না। এর ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে একদিকে ভারতের সঙ্গে তার গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, অন্যদিকে চীন বর্তমানে অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারী। ফলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা।

প্রশ্ন উঠছে, এই সফরের ফলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না।

বাস্তবতা হলো, এখন পর্যন্ত ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ নয়াদিল্লি খুব ভালোভাবেই জানে যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র এবং তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন মানেই ভারতবিরোধী অবস্থান গ্রহণ নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের আধুনিক বাস্তবতায় অধিকাংশ রাষ্ট্রই বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করে থাকে।

ভারতের উদ্বেগের জায়গা অবশ্যই রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর ব্যবহার এবং সম্ভাব্য কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে দিল্লি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। অতীতে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ বা নেপালের ক্ষেত্রে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ভারতকে উদ্বিগ্ন করেছে। বাংলাদেশেও যদি চীনের উপস্থিতি অতিরিক্ত কৌশলগত রূপ নেয়, তাহলে ভারতের উদ্বেগ বাড়তে পারে। কিন্তু বর্তমান সফরের ঘোষিত এজেন্ডা মূলত অর্থনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক। তাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তবসম্মত নয়।

বরং বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থানকে “ব্যালান্সিং ডিপ্লোমেসি” বা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত। একদিকে ভারত বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী, প্রধান স্থল যোগাযোগ অংশীদার এবং নিরাপত্তা সহযোগী। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার, বিনিয়োগকারী ও উন্নয়ন সহযোগী। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ হচ্ছে উভয় পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে “শূন্য-সম” (zero-sum) কূটনীতির পরিবর্তে “বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব” ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার পূর্বশর্ত নয়। বাংলাদেশ যদি দক্ষতার সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, তাহলে চীন থেকে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতাও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

তবে ঝুঁকির বিষয়ও রয়েছে। চীনা ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণের চাপ বাড়তে পারে। একইভাবে, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে কোনো এক পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার ধারণা তৈরি হলে তা কূটনৈতিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন সরকারের কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করা। সফরের মাধ্যমে তিনি বার্তা দিয়েছেন যে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়। একই সঙ্গে চীনও বাংলাদেশকে তার দক্ষিণ এশীয় কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

সবকিছু বিবেচনায় বলা যায়, চীন সফরকে আপাতত বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায়। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নদী ব্যবস্থাপনা সহযোগিতার ক্ষেত্রে সফরটি সম্ভাবনার নতুন দ্বার খুলেছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে তার ওপর।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে তাৎক্ষণিক কোনো ফাটল ধরার সম্ভাবনা বর্তমানে স্পষ্ট নয়। বরং পরিস্থিতি এমন যে ঢাকা যদি বিচক্ষণ কূটনীতি অনুসরণ করে, তাহলে চীন ও ভারতের সঙ্গে সমান্তরালভাবে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রুর চেয়ে স্থায়ী স্বার্থই বড়—বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতাই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। চীন সফরের প্রকৃত মূল্যায়ন তাই হবে আবেগ নয়, বরং জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার আলোকে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.