ইউরোপে রেকর্ড তাপপ্রবাহ: ফ্রান্সে নদী-খালে গোসলে নেমে ৪০ জনের মৃত্যু

ইউরোপজুড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে তাপমাত্রা। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সৃষ্ট গরমে অতিষ্ঠ হয়ে নদী ও খালে সাঁতার কাটতে গিয়ে গত বৃহস্পতিবার থেকে কেবল ফ্রান্সেই অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নু এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেন ও ইতালিতেও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

তীব্র গরমের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ নদী, হ্রদ বা খালে নেমে পড়ছেন। ফ্রান্সের ক্রীড়া ও যুব মন্ত্রী মারিনা ফেরারি ফরাসি রেডিওতে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘তীব্র তাপদাহের সময় লাইফগার্ড বা নজরদারি নেই এমন জায়গায় সাঁতার কাটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না।’

ফ্রান্সের আবহাওয়া অধিদপ্তর ‘মেতেও ফ্রান্স’ জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার দেশটিতে ইতিহাসের উষ্ণতম দিন রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে সোমবার রাতে রেকর্ড করা হয় দেশের ইতিহাসে উষ্ণতম রাত (গড় ন্যূনতম তাপমাত্রা ২১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। বর্তমানে ফ্রান্সের অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলে সর্বোচ্চ রেড অ্যালার্ট জারি রয়েছে।

তীব্র দাবদাহ থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনাগুলো ফ্রান্সজুড়ে শোকের ছায়া ফেলেছে। ক্রীড়ামন্ত্রী জানান, অনেকেই সুরক্ষার বিষয়টি চিন্তা না করেই নদী ও খালে ঝাঁপ দিচ্ছেন।

এর মধ্যে গত রোববার সন্ধ্যায় ফন্টেইন-লা পোর্ট এলাকায় সপরিবারে সিন নদীতে গোসল করতে গিয়ে ১৩ বছরের এক কিশোরী তলিয়ে যায়। মেয়েটি সাঁতার জানত না। লিয়নের কাছে রোন নদীতে ডুবে যাওয়ার পর এক তরুণ পেশাদার ফুটবলারকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। যেখানে সাঁতার কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, সেখানে বিপদে পড়া চার তরুণকে উদ্ধার করতে জরুরি বিভাগ কাজ করছে।

এ ছাড়া গত সোমবার ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় কার্পেনত্রাস শহরের একটি পার্কিং লটে পার্ক করা গাড়ির ভেতর থেকে দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তীব্র গরমে গাড়ির ভেতর দম বন্ধ হয়ে তারা মারা যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই পরিস্থিতি জার্মানিতেও। সেখানেও তীব্র গরমে নদীতে নেমে বেশ কয়েকজন নিখোঁজ ও প্রাণ হারিয়েছে। জার্মান লাইফসেভিং অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, গত শুক্র থেকে রোববারের মধ্যে পানিতে ডুবে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে পুরুষেরা সাঁতার কাটার ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতার অতিরিক্ত ঝুঁকি নিচ্ছেন বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে। রাইন নদীতে নিখোঁজ হওয়া তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এদিকে তীব্র গরমে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। প্যারিস অঞ্চলের প্রধান ভ্যালেরি পেক্রেস সাধারণ মানুষকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া যাতায়াত না করার এবং বাড়ি থেকে কাজ (ওয়ার্ক ফ্রম হোম) করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রেললাইনগুলো ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে না। ফলে গণপরিবহনে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।’

বিশ্বখ্যাত ল্যান্ডমার্ক আইফেল টাওয়ার গতকাল মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাধারণত রাত ১২টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকলেও মঙ্গলবার এটি বিকেল ৪টার মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থী সমাগম হওয়া লুভর মিউজিয়াম ঘোষণা করেছে, বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তারা প্রতিদিন বিকেল ৬টার পরিবর্তে বিকেল ৪টার মধ্যেই মিউজিয়াম বন্ধ করে দেবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ঐতিহাসিক ভবনটি বেশ প্রাচীন এবং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের এই তীব্র গরম মোকাবিলার উপযোগী নয়। দিনের শেষভাগে দর্শনার্থীদের ভিড়ের কারণে ভবনের ভেতরের গরম আরও অসহনীয় হয়ে উঠছে।

তীব্র গরমের প্রভাব পড়েছে ফ্রান্সের জ্বালানি খাতেও। পানির তাপমাত্রা অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে সোমবার রাতে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গোলফেচ পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দিতে হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, গারোন নদীর যে পানি চুল্লি ঠান্ডা করার কাজে ব্যবহার করা হয়, তার তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হতে পারবে না। কিন্তু মঙ্গলবার নদীর পানির তাপমাত্রা এই সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস থাকায় কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অপরদিকে স্পেনে তাপপ্রবাহের তৃতীয় দিনে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেছে। দক্ষিণের আন্দালুসিয়া এবং উত্তরের কান্তাব্রিয়া ও বাস্ক কান্ট্রিতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা ‘এইমেট’ জানিয়েছে, মঙ্গলবার কর্ডোভা শহরের গ্রামীণ এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং উত্তর-পূর্বের এব্রো উপত্যকায় ৪২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

স্পেনের আবহাওয়াবিদ রুবেন দেল ক্যাম্পো জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন গ্রীষ্মের শুরুতেই তীব্র তাপপ্রবাহের ঘটনা অনেক সাধারণ হয়ে উঠেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে স্পেনে ১০ বার জুনে এমন দাবদাহ দেখা গেছে, অথচ এর আগের ২৫ বছরে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র দুইবার।

ইতালির রোম, মিলান, ফ্লোরেন্স, তুরিন এবং ভেনিসসহ ১৫টি শহরে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এই সতর্কতার অর্থ হলো, এই আবহাওয়া কেবল বয়স্ক বা অসুস্থদের জন্য নয়, বরং সম্পূর্ণ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় ইতালি সরকার রোদে কাজ করা কৃষি ও নির্মাণ শ্রমিকদের সুরক্ষায় জরুরি শ্রম আইন পুনরায় চালু করেছে। এখন থেকে অতিরিক্ত গরমের সময়ে কাজ বন্ধ বা কমাতে বাধ্য হলে কোম্পানিগুলো রাষ্ট্র সমর্থিত বিশেষ আর্থিক সহায়তা পাবে।

স্পেনে বুধবার থেকে তাপমাত্রা কিছুটা কমতে শুরু করলেও এই তাপপ্রবাহ এখন উত্তর দিকে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বেলজিয়াম সরকার তাদের জরুরি ‘ওজোন ও তাপ পরিকল্পনা’ সক্রিয় করেছে। অন্যদিকে নেদারল্যান্ডসের আবহাওয়া অধিদপ্তর দেশটির দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে তীব্র আবহাওয়ার আশঙ্কায় ‘কোড অরেঞ্জ’ সতর্কতা জারি করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘কোপার্নিকাস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হতে থাকা মহাদেশ। এটি বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে। এর ফলে ঘন ঘন তীব্র দাবদাহ, তীব্র পানিশূন্যতা এবং ভয়াবহ দাবানলের মতো বিপর্যয় আরও নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.