বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই, ত্যাগ ও কারাবরণের মধ্য দিয়ে তিনি বহুবার প্রমাণ করেছেন তার দৃঢ়তা ও নেতৃত্বগুণ। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যখন দেশে একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হলো, তখন খালেদা জিয়া অনেকটা “জাতীয় ঐক্যের প্রতীক” হিসেবে উদ্ভাসিত হন। সেই সময় তিনি দলীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে এক ধরনের অভিভাবকসুলভ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন — যা বাংলাদেশের বিভক্ত সমাজে এক বিরল দৃষ্টান্ত।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। এটি শুধু রাজনৈতিক কৌশলগত ভুল নয়, বরং খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার প্রেক্ষিতে এক ধরনের আত্মঘাতী পদক্ষেপ বলেই মনে হয়। কারণ, নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানে আবারও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার ময়দানে নামা, আবারও পক্ষ-বিপক্ষের লড়াইয়ে নিজেকে আবদ্ধ করা। এর ফলে তিনি সেই “জাতীয় ঐক্যের প্রতীক” অবস্থান থেকে নেমে আসবেন, যা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা অত্যন্ত জটিল। অর্থনীতি ভঙ্গুর, আইনশৃঙ্খলা অনিশ্চিত, এবং সমাজ গভীরভাবে বিভক্ত। এই পরিস্থিতিতে যে কোনো সরকার—তা বিএনপির হোক কিংবা অন্য কারও—অতি সহজে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারবে না। ফলে যদি খালেদা জিয়া আগামীতে সংসদ সদস্য বা এমনকি প্রধানমন্ত্রীও হন, তার জনপ্রিয়তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয় হতে থাকবে। জনগণ তখন একজন ব্যর্থ শাসক হিসেবে তার মূল্যায়ন করবে—যেমনটি ইতিহাসে দেখা গেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রেও।
একজন রাজনীতিক হিসেবে খালেদা জিয়ার এখন সবচেয়ে বড় ভূমিকা হতে পারত “জাতীয় অভিভাবক” হিসেবে—যিনি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেন, মতবিরোধের মধ্যেও একটি সাধারণ লক্ষ্য স্থির করতে পারেন। এমন এক সময় যখন বাংলাদেশ গভীর বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন একজন অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন, যিনি জাতির সংকটে পথপ্রদর্শক হবেন। খালেদা জিয়া সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হলে তিনি আরও গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধাভাজন হতেন—দেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অবস্থান অর্জন করতে পারতেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত তাকে সেই সম্ভাবনা থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তিনি আবারও রাজনৈতিক বিভাজনের এক পক্ষ হয়ে পড়েছেন। হয়তো এটি তার দলের তাগিদে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এটি খালেদা জিয়ার জন্য এক আত্মঘাতী পদক্ষেপই হবে।
শেষ পর্যন্ত, ইতিহাস রাজনীতির চেয়ে অনেক বড়। নেতা সেই যিনি ক্ষমতার মোহ ছাড়িয়ে ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়াতে পারেন। খালেদা জিয়া যদি সেই অবস্থানে থাকতেন—জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে—তাহলে তিনি হয়তো রাজনীতির বাইরে গিয়েও বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিতে পারতেন।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

