বিতর্ক এবং জটিলতা যেন কিছুতেই কাটছে না। সনদ তৈরি নিয়ে বিতর্ক, স্বাক্ষর নিয়ে বিতর্ক এবং বাস্তবায়ন নিয়ে বিতর্ক শেষ হলো না। অবশ্য অবস্থা দেখে মনে হয়, জটিলতা দূর করার চাইতে বাড়িয়ে তোলার চেষ্টাটাই ছিল বেশি। জুলাই সনদ তৈরি করা এবং স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রে এই কথা ভালোভাবে প্রযোজ্য। রাজনীতি যেহেতু দেশ ও সমাজ নিয়ে ভাবনা এবং ভূমিকা পালন করার বিষয় তাই কোনো একটা বিষয়কে ভিন্নভাবে দেখা আর সে অনুযায়ী মত দেওয়ার কারণে বিতর্ক রাজনীতিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবেই। কিন্তু ভিন্নমত সহ্য করার নামই গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতগুলোর মধ্যে ঐক্যের সূত্র বের করাই হচ্ছে, রাজনৈতিক দক্ষতার বিষয়। জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্য কমিশনও দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য করার চেষ্টা করেছে, তারা তাদের কাজ শেষ করেছেন। কিন্তু কাজ শেষ হলেই যে তা ভালো কাজ হয়েছে সেটা বলা কঠিন।
অভ্যুত্থানে প্রধান আকাক্সক্ষা ছিল এমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যে রাষ্ট্র বৈষম্য করবে না আর দেশ পরিচালনার নামে ক্ষমতাসীন দল দমন-পীড়ন করবে না। পুঁজিবাদী সমাজের সব স্তরে বৈষম্য মানুষকে বিক্ষুব্ধ করে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা যখন শোষণ-লুঠনের পাশাপাশি মানুষকে নিপীড়ন ও অপমান করতে থাকে, তখন মানুষের ক্ষোভ চূড়ান্ত রূপ নেয়। ক্ষুব্ধ মানুষ প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের পথ খুঁজতে থাকে। এই বিক্ষোভ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকে, রাজনৈতিক এই বিস্ফোরণই অভ্যুত্থান রূপে দেখা দেয়। অভ্যুত্থান প্রতি বছর হয় না, কিন্তু যখন হয় তখন সরকারের সব অঙ্গ-প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ জনগণের রোষের মুখে পড়ে। ’২৪-এর অভ্যুত্থানের পর ভাবা হয়েছিল, এগুলোর সংস্কার হবে। সে কারণেই সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু মানুষের আশা আর শাসকদের পরিকল্পনা সবসময় একই লক্ষ্যে চলে না। এবারও তাই হলো। সংবিধানের ওপর সব দায় চাপানো আর তাকে পাল্টে ফেলার হুংকার শুনে এই ভাবনা হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে, প্রকাশ্য ঘোষণার বাইরে অন্য কোনো গোপন উদ্দেশ্য আছে। মানুষ পরিবর্তন চায় এবং সংবিধান কোনো চিরস্থায়ী বিধান নয়। মানুষের আকাক্সক্ষা ও প্রয়োজনের স্বীকৃতি দিয়ে তা পাল্টানো হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের ফলে সংবিধানে যা আছে তার চেয়ে উন্নত নাকি তার চেয়ে নিম্নতর হবে? মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিসর যদি না বাড়ে এবং অতীতের অর্জনগুলো যদি রক্ষা না পায়, তাহলে পরিবর্তন বিপজ্জনক। অভ্যুত্থানের আবেগকে ভিন্ন খাতে পরিচালিত করে সংস্কারের পদক্ষেপগুলো কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহ তৈরি করেছে। মানুষের মতো রাষ্ট্রেরও জন্মের পরে বিকাশ এবং বিনাশ আছে। জন্মকালীন দুর্বলতাও থাকে, সেই দুর্বলতা দূর করা দরকার। কিন্তু জন্মটাকে অপমান ও অস্বীকার করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে বিতর্ক স্বাভাবিক এবং দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা থাকলে, সে ক্ষেত্রে সমাধান অসম্ভব নয়। সে ধরনের ঘটনাই ঘটেছে এবার। নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার চেষ্টার কারণে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে, সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর প্রক্রিয়ায়।
এসব বিবেচনায় নিয়ে বা খুব বেশি গুরুত্ব না দিয়ে ধারণা করা হয়েছিল আলোচনা করে সব ঠিক করে ফেলা যাবে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের মধ্যে ছয়টি কমিশনের প্রতিবেদনের ছাপানো অনুলিপি সব রাজনৈতিক দলের কাছে প্রেরণ করা হয়। এরপর ৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে পুলিশ সংস্কার কমিশন ব্যতীত অপর পাঁচটি কমিশনের প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ ১৬৬টি সুপারিশ স্প্রেডশিট আকারে ৩৭টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়। এর মধ্যে সংবিধান সংস্কার বিষয়ক ৭০টি, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার বিষয়ক ২৭টি, বিচার বিভাগ সংস্কার বিষয়ক ২৩টি, জনপ্রশাসন সংস্কার বিষয়ক ২৬টি ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার বিষয়ক ২০টি সুপারিশ ছিল। এসব সুপারিশের ওপর মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট তাদের মতামত কমিশনের কাছে প্রেরণ করে। এরপর শুরু হয় দফায় দফায় আলোচনা। ওই আলোচনার ভিত্তিতে ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমতসহ ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ প্রণীত হয়। প্রশ্ন উঠেছে, জুলাই সনদ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়ে। আলোচনার ভিত্তিতে একমত হওয়া বিষয়গুলো সনদে অন্তর্ভুক্ত থাকবে নাকি ভিন্নমতগুলোও থাকবে, ভিন্নমতের বিষয়ে চূড়ান্ত ভিন্নমত এবং আপত্তি সত্ত্বেও সম্মতির বিষয়গুলো থাকবে কিনা তা নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। এর ফলস্বরূপ ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ কিছু বিষয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও জোটের ভিন্নমতসহ প্রণীত হয়। এর পরের পদক্ষেপ ছিল, সনদে স্বাক্ষর করা এবং বাস্তবায়ন করা। এটা নিয়েই বিতর্ক তীব্র রূপ নিয়েছে। বিতর্কের অন্যতম বিষয় হলো, জুলাই সনদকে আইনি ভিত্তি দেওয়া বা সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া হবে কি? এ বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দল ও ব্যক্তির অভিমত ছিল, জুলাই সনদকে কোনোভাবেই সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া উচিত হবে না। জুলাই সনদ কোনো আইন নয়। এটা একটি পলিটিক্যাল চার্টার বা চুক্তি, যা রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে তৈরি হওয়ার কথা। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি বড় ঘটনা। ছাত্র, শ্রমিক, সাধারণ নাগরিকসহ বিপুল মানুষের অংশগ্রহণে এ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। ফলে জুলাই সনদ একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেতে পারে এবং সেই দাবি খুব যৌক্তিক। তবে কোনোভাবেই এর সঙ্গে আইন বা সংবিধানকে একাকার করে ফেলা ঠিক নয়। এর একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে, সনদকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া। পরবর্তীকালে নির্বাচিত সংসদ সংবিধান সংশোধন করে, সংবিধানের কোনো একটি তফসিলে এটিকে রেফারেন্স হিসেবে রাখবে। কিন্তু কোনোভাবেই জুলাই সনদকে সংবিধানের ওপরে স্থান দেওয়া বা সেটিকে আইন হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, আমাদের সংবিধানে কিছু দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু সংবিধানের দুর্বলতার কারণেই স্বৈরশাসনের উত্থান হয়েছে এ কথা ঠিক নয় এবং ইতিহাসসম্মতও নয়। গণতান্ত্রিক সংবিধান আছে, এমন কিছু দেশেও স্বৈরাচারী সরকার বা সরকারপ্রধানের জনগণের ভোটেই ক্ষমতাসীন হয়েছে। বাংলাদেশে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের ১৫-১৬ বছরে, যা হয়েছে তাকে ‘ডেমোক্রেটিক ব্যাকসøাইডিং’ বলা যায়। এই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের শাসন স্বৈরাচারী শাসনে পরিণত হয়।
ফলে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করার নামে সংবিধান পাল্টে ফেলার কোনো যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। এমন পরিস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদের স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আগে, সংশোধিত খসড়ায় মতামতের প্রতিফলন না থাকায় সনদে স্বাক্ষর করেনি বাম ধারার চারটি দল। দলগুলো হলো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ। ইতিমধ্যে কেন তারা জুলাই সনদে সই করবে না, তার কারণগুলো সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেছে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, জুলাই সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। তাদের পক্ষ থেকে বারবার সংশোধনী দিলেও সেগুলো সন্নিবেশিত করা হয়নি। সর্বসম্মত বিষয় ছাড়াও নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) দেওয়া প্রস্তাবগুলো সনদে যুক্ত করা হয়েছে। তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টগুলোর কারণও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।’
জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে কিন্তু এর পটভূমিতে অভ্যুত্থান পরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিমকোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা খসড়া সনদে উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যদি ‘সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি প্রদান ও আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না, এমন বিষয়ে অঙ্গীকার করতে হয় এমন কোনো সনদে ভিন্নমত দিয়ে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না।’ সনদের অঙ্গীকারনামার দুই নম্বর ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তাহলে ভিন্নমতগুলোর কী হবে? আর তিন নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে যে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করব না, উপরন্তু ওই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করব।’ ফলে তারা প্রশ্ন তুলেছে, আমরা কি বর্তমান দিয়ে ভবিষ্যতের পথ রুদ্ধ করব? আমাদের কোনো ভুল আর দুর্বলতা কি সংশোধন করা যাবে না? এটা তো জুলাই চেতনার বিরুদ্ধে চলে যায়। সর্বশেষ খবরে জানা গেল, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। এছাড়া বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্ক্সবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি। সবাই স্বাক্ষর না করলেও, যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে আগামী সরকার সেগুলো বিবেচনায় রাখবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

