পরীক্ষা হচ্ছে মানবতার

গাজা বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগার শুধু নয়, গাজা এখন একটি পরীক্ষাকেন্দ্র। যেখানে পরীক্ষা হচ্ছে, কোন দেশ মানবতার পক্ষে আছে। এখন চলছে এক নতুন পরীক্ষা। ইসরায়েলি নৃশংসতার বিপরীতে মানবতার এক অভূতপূর্ব জাগরণ দেখছে বিশ্ববাসী। ইসরায়েলের হামলা, আরব দেশগুলোর মুখ ফিরিয়ে রাখা আর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ আমেরিকার হুমকির মুখে মরতে মরতে বেঁচে থাকা মানুষেরা থাকে গাজায়। তারা বলে, আশার সব দরজা বন্ধ হয়ে গেছে বলে আমরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। কিন্তু আকাশে গনগনে সূর্য, শুকিয়ে যাচ্ছে জিহ্বা, ফেটে যাচ্ছে ঠোঁট। এক ফোঁটা পানি যেখানে দুর্মূল্য, সেখানে সূর্যও পুড়িয়ে মারছে মা ও শিশুদের। এই ইসরায়েল সৃষ্ট নরকে, প্যালেস্টাইনের শিশুদের মৃত্যুতে মায়েরা যেন কাঁদতেও ভুলে গেছে। গুলি, বোমায় মৃত্যুর পাশাপাশি চোখের সামনে না খেয়ে সন্তানকে মরতে দেখে কোনো পিতা-মাতা কি স্বাভাবিক থাকতে পারে? জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, গাজার বাসিন্দারা প্রতিদিনের প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ২৬ শতাংশ খাবার পাচ্ছেন। তারপরও এই মানুষদের কাছে স্বাভাবিক আচরণ দাবি করছে যুদ্ধবাজরা। এমন সময় ইসরায়েলের অবরোধ ভেঙে বিশ্বের মানবতাবাদীদের উদ্যোগে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা সমুদ্রপথে গাজায় ত্রাণ নিয়ে যাত্রা শুরু করছিল। তাদের নৌবহরে রয়েছে ৪০টির বেশি বেসামরিক নৌযান। বহরে প্রায় ৪৪টি দেশের ৫০০ মানুষের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া বাংলাদেশসহ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাচিত প্রতিনিধি, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকরা। মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের প্রতিনিধি আছে কিনা, জানা যায়নি। গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার প্রথম বহর ৩১ আগস্ট স্পেনের বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৩ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর তিউনিসিয়া ও ইতালির সিসিলি দ্বীপ থেকে আরও নৌযান বহরটিতে যুক্ত হয়। এ ছাড়া গ্রিসের সাইরাস দ্বীপ থেকে পরে আরও কিছু নৌযান ত্রাণ নিয়ে বহরে যুক্ত হয়। সব শেষ খবর অনুযায়ী,  গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সব জাহাজই আটক করেছে ইসরায়েল। বন্দি করেছে সবাইকে। এর প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে বিশ্বের দেশে দেশে ছাত্র, শ্রমিক, শিক্ষকসহ নাগরিক সমাজ।

কেন এই ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে এসেছেন তারা? কারণ গাজা পরিস্থিতি নতুন এক সন্ধিক্ষণে এসে হাজির হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সরকারি যে পরিসংখ্যান, যা জাতিসংঘ স্বীকৃত সেটা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গাজার ওপর চালিয়ে আসা ইসরায়েলি আগ্রাসনের ৭২৪তম দিনে এসে মৃতের সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৬৫ হাজার। এই শতাব্দীর সবচেয়ে নজিরবিহীন এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে মাত্র ১৪১ বর্গমাইলের ৩৬৫ বর্গকিলোমিটারের উপত্যকাটি। কিন্তু এই সংখ্যা কেবলই বোমা হামলা, জায়নবাদী স্নাইপারদের গুলি কিংবা ভবন ধ্বংসের মতো আঘাতে প্রত্যক্ষভাবে নিহত ব্যক্তিদেরই পরিসংখ্যান মাত্র। এর বাইরে পঙ্গু ও অঙ্গহানির শিকার, যাদের নাড়াচাড়া করা কঠিন কিংবা যারা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন অথচ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, সেসব ব্যক্তি; গর্ভেই যেসব শিশু সিজারিয়ান অপারেশন ও অক্সিজেনের অভাবে মারা গেছে, তাদের সবার সংখ্যা হিসাব করলে প্রাণহানির পরিমাণ দাঁড়াবে ভয়াবহ রকমের বিশাল। বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট কর্র্তৃক জুলাই ২০২৪ সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সরাসরি আঘাতের কারণে সরকারি হিসাবে যে মৃত্যুর সংখ্যা বলা হয়, তা প্রকৃতপক্ষে মোট প্রাণহানির সংখ্যার মাত্র ২০ শতাংশ।

সরকারি হিসাব মতে, প্রতিটি মৃতের বিপরীতে আরও চারজন মারা যাচ্ছেন ক্ষুধা, তৃষ্ণা অথবা চিকিৎসাহীনতায়। ফলে সরকারি হিসাব মতে, ৬৫ হাজার শহীদের বিপরীতে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখের অধিক। এ সংখ্যা গাজার মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ। লাশের সারি আর লাখ লাখ আহত নিয়ে মানবতার ধ্বংসস্তূপ হয়ে সভ্যতাকে ব্যঙ্গ করছে উপত্যকাটি। ফলে এর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে ব্যাপক। হলিউড থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া জগৎ পর্যন্ত সব দিকেই ইসরায়েলকে বর্জন করার দাবি উঠছে। বিশ্ব জুড়ে তরুণ সমাজের কাছে ইসরায়েল এখন সবচেয়ে ঘৃণিত রাষ্ট্র। এমনকি ইসরায়েলের প্রধান সমর্থক যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম প্রতিবাদে ফেটে পড়ছে। তারা বলছেন, কোটি কোটি মার্কিন করদাতার অর্থ এবং সামরিক শক্তি গণহত্যার কাজে লাগানো হচ্ছে, অথচ সেই করের টাকা ও সামরিক সম্পদের চেয়ে ভালো কাজে ব্যবহার করা যেত। ফলে বিশ্ব জুড়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে জনমত তৈরি হয়েছে, পরিস্থিতি পাল্টাতে তারা একটি পুরনো কৌশল পুনরায় ব্যবহার করেছে দোষ সম্পূর্ণভাবে ভিকটিমের ওপর চাপিয়ে ইসরায়েলের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মুসলিম বিশ্বের আটটি প্রভাবশালী দেশ (কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, পাকিস্তান, জর্দান ও মিসর) তাড়াহুড়া করে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনাটির অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। তারা কি বিবেচনা করল না যে, এ পদক্ষেপ ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎকে আরও অন্ধকার করে ফেলবে? আরবের দেশগুলো ভরসা করেছিল তাদের কাছে,  ট্রাম্প যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার ওপর। তিনি বলেছিলেন, ইসরায়েল পশ্চিম তীর দখল করবে না। কিন্তু নেতানিয়াহু ক্রমাগত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপন ও সম্প্রসারণ করার পরও ট্রাম্প কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। অর্থাৎ সেই প্রতিশ্রুতি ছিল অর্থহীন ও প্রতারণামূলক। এবারও গাজা নিয়ে ট্রাম্পের পরিকল্পনা ভয়াবহ একটি দলিল। এটা প্রণীত হয়েছে মূলত ইসরায়েলের সুবিধাকে মাথায় রেখে। অন্যদিকে এর ফলে ফিলিস্তিনিরা কী পাবে, স্পষ্ট নয়। ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাটির উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য হলো : ১. একজন ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার আগেই সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে হবে (কিন্তু নেতানিয়াহু সব জিম্মি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যদি চুক্তি থেকে সরে আসে তাহলে কী হবে?)। ২. গাজা শাসন করবে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি আন্তর্জাতিক কর্র্তৃপক্ষ, যার প্রধান হবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিটিশ মিডিয়া পর্যন্ত যাকে  ‘গণবিধ্বংসী প্রতারণার হাতিয়ার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, সেই টনি ব্লেয়ার থাকবেন ‘ভাইসরয়’ হিসেবে। ৩. ২০২০ সালের ট্রাম্পের যে শান্তি পরিকল্পনা ছিল, সেটিকে গ্রহণ করতে হবে। সেই পরিকল্পনা ফিলিস্তিনি নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকা এলাকাকে  আরও সংকুচিত করে দিয়েছে।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে দখল করা অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের জাতিসংঘের দাবির বিপরীতে এ পরিকল্পনা কার্যত একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে বাতিল করে দেয়। ৪. হামাসকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে। কাজটি সম্পন্ন হবে মূলত এই মুসলিম দেশগুলোর বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স (আইএসএফ) দ্বারা। অথচ ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিশাল অংশ দখল করে থাকবে এবং যতক্ষণ না তারা আইএসএফের কাজের অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ তাদের প্রত্যাহারের বিষয়ে ভেটো দেওয়ার অধিকার থাকবে। ফলে কোনো দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের অধিকার, যা আন্তর্জাতিক আইনে সুরক্ষিত আছে, সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হবে। ৫. চুক্তিতে বারবার বলা হয়েছে, ‘নতুন গাজা যেন তার প্রতিবেশীদের জন্য কোনো হুমকি সৃষ্টি না করে’। এর মাধ্যমে যারা নিজ ভূমি থেকে বিতারিত হয়েছে, যাদের ভূমি দখল করে নেওয়া হয়েছে, যারা গণহত্যা ও যুদ্ধের দ্বারা নির্যাতিত তাদেরকেই দায়ী করা হচ্ছে। ৬. গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের কোনো সময়সীমা নেই। বরং ইসরায়েল গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে অনির্দিষ্ট একটি নিরাপত্তা পরিধিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য থাকবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৭. ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেকোনো অগ্রগতিকে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের (পিএ) সংস্কারের একটি অস্পষ্ট শর্তের অধীন করা হয়েছে। পিএ সেখানে যথেষ্ট ‘সংস্কার’ করেছে কিনা, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার থাকবে ইসরায়েলের। এই কয়েকটি বিষয় খেয়াল করলেই বুঝতে অসুবিধা হবে না ২০ দফা প্রস্তাবের মূল বিষয় কী?

মুসলিম নেতাদের নীরব সম্মতিতে ট্রাম্প আরও ঘোষণা করেন যে, হামাসকে আগামী তিন বা চার দিনের মধ্যে এই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে। অন্যথায় তিনি নেতানিয়াহুকে নতুন উদ্যমে গণহত্যা পুনরায় শুরু করার জন্য পূর্ণ সমর্থন দেবেন। সুতরাং ট্রাম্পের পরিকল্পনায় এটি কোনো শান্তি চুক্তি নয়; বরং এটি একটি হুঁশিয়ারি। এই চুক্তির শক্তিতে ইসরায়েল হত্যা ও অনাহারের মুখে থাকা ২০ লাখ ফিলিস্তিনির জীবন ও মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে হামাসকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে। এ পরিকল্পনায়  ফিলিস্তিনিদের আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। আর ইসরায়েলকে তার গণহত্যাকে আড়াল এবং নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কী কারণে এই আট মুসলিম দেশ এমন দফা ও শর্তকে সমর্থন দিল? একটু খেয়াল করলে বোঝা যাবে, এই দেশগুলোর প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য আছে। ফিলিস্তিনিরা তাহলে কী করবে? হয় হত্যা নয় উচ্ছেদ,  ইসরায়েল-মার্কিন এই পরিকল্পনা মেনে নেবে, নাকি মৃত্যু এলেও মাতৃভূমি ছাড়ব না এমন লড়াই অব্যাহত রাখবে? আগে তারা মুসলিম দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা পাচ্ছিল না, এখন সম্পূর্ণরূপে পরিত্যক্ত হয়েছে। তাহলে সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ লড়াই প্যালেস্টাইন এবং বিশেষত গাজার। এখন তাদের মৃত্যু দিয়ে প্রতিরোধ আর মানবতাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো ছাড়া বিকল্প নেই। গাজা বিশ্ববাসীকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, মনুষ্যত্বের পরীক্ষার সামনে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নিরস্ত্র মানবতাবাদী যোদ্ধারা এগিয়ে গেছেন। গাজা এবং মানবতার স্বার্থে, তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কর্তব্য।

রাজেকুজ্জামান রতন

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.