ঢাকাকে ভয়, ভক্তি ও রোমাঞ্চের অনুভূতি এনে দেওয়া সেই দুই কামান : ‘কালে খাঁ জমজম’ ও ‘বিবি মরিয়ম’



​ঢাকার চারশো বছরের ইতিহাসে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে মোগল যুগের দুটি সুবিখ্যাত কামানের নাম— ‘কালে খাঁ জমজম’ এবং ‘বিবি মরিয়ম’। মোগল নির্মাণশৈলীতে বিশালত্ব ও সৌন্দর্যের দিক থেকে এগুলি ছিল বিশ্বমানের। একসময় এই কামানগুলিই ছিল ঢাকাবাসীর গর্ব, যা পর্যটকদের কাছে লালবাগ দুর্গ বা বড় কাটরার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয় ছিল।
​ধারণা করা হয়, কোনো এক বীর ‘কালে খাঁ’ এবং তাঁর স্ত্রীর নামানুসারে কামান দুটির নামকরণ করা হয়। তবে কেউ কেউ দাবি করেন, বাংলার সুবেদার মীর জুমলাই এই নামকরণ করেছিলেন।

​কামানের জন্ম ও প্রেক্ষাপট:
​১৭ শতকের গোড়ার দিকে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময়ে যখন ঢাকায় বাংলার রাজধানী স্থাপিত হয়, তখন প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে জলদস্যুদের উপদ্রবও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে মগ, পর্তুগিজ ও আরাকানি জলদস্যুদের মোকাবেলায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করতে ঢাকায় বেশ কিছু কামান তৈরি করা হয়। এগুলির মধ্যে ‘কালে খাঁ জমজম’ ও ‘বিবি মরিয়ম’ ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত। এই কামান দুটি প্রমাণ করে সেকালের ঢাকার কামান তৈরির কারিগরদের অসামান্য দক্ষতা। বর্তমানে মুর্শিদাবাদে যে বিশাল কামানটি দেখা যায়, সেটিও ঢাকার কারিগর জনার্ধন কর্মকারের হাতেই তৈরি হয়েছিল।

​’কালে খাঁ জমজম’: বিশালত্ব ও আধ্যাত্মিকতা:
​দুটি কামানের মধ্যে প্রথমদিকে বেশি খ্যাতি ছিল ‘কালে খাঁ জমজম’-এর।
​বিশালত্ব: এটি ছিল আকারে প্রকান্ড—দৈর্ঘ্য ছিল ২২ থেকে ৩৬ ফুটের মতো। রবার্ট লিন্ডস (১৭৭৬ সালে আগত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা) এবং বিখ্যাত ভূগোলবিদ জেমস রেনেল—উভয়েই এর বিশালতা ও জমকালো গঠনের কথা বিস্তারিতভাবে লিখে গেছেন। লিন্ডস তো বলেইছিলেন, ঢাকায় আর কিছু না হলেও এই কামানটি তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল।

​আধ্যাত্মিক মর্যাদা: স্থানীয়দের কাছে এটি এতটাই পবিত্র ও আধ্যাত্মিক ছিল যে, তারা বিশ্বাস করত এটি স্বর্গ থেকে এসেছে। হিন্দু রমণীরা এই কামানের মুখে দুধ ঢালতেন, ফুল ও সিঁদুরের ফোঁটা দিতেন, এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতেন। ১৭৮০ সাল পর্যন্ত এটি স্থানীয়দের কাছে ‘পবিত্র স্থান’ হিসেবে মর্যাদা পেত।

​পরবর্তী ইতিহাস: ১৭৮০ সালের নদীভাঙনে বুড়িগঙ্গার মোগরাই চরে রাখা এই সুবিশাল কামানটি নদীতে তলিয়ে যায়। রবার্ট লিন্ডস যদিও কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছিলেন, তবে স্থানীয়দের বিশ্বাস ছিল—এটি স্বর্গ থেকে এসেছিল, আবার স্বর্গেই ফিরে গেছে।

​’বিবি মরিয়ম’: মীর জুমলার কামান ও একালের সাক্ষী

​আকারের দিক থেকে ‘বিবি মরিয়ম’ কালে খাঁ-র তুলনায় কিছুটা অনুল্লেখ্য ছিল। এর দৈর্ঘ্য ছিল ১১ ফুট এবং মুখের ব্যাস ছিল ছয় ইঞ্চি।

​যুদ্ধে ব্যবহার: ১৬৬০ সালে মীর জুমলা বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন এবং ১৬৬১ সালে আসাম অভিযানে তিনি ৬৭৫টি ভারী কামান ব্যবহার করেন, যার মধ্যে ‘বিবি মরিয়ম’ ছিল সর্ববৃহৎ।
​স্থাপন: যুদ্ধ শেষে বিজয়ী মীর জুমলা কামানটিকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন এবং বড় কাটরার দক্ষিণে সোয়ারীঘাটে স্থাপন করেন। তখন থেকে এটি ‘মীর জুমলার কামান’ নামেও পরিচিতি লাভ করে। সুবেদার এটিকে যুদ্ধজয়ের স্মারক হিসেবে স্থাপন করেছিলেন।

​পূজনীয় হয়ে ওঠা: কালে খাঁ জমজম বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়ার পর ‘বিবি মরিয়ম’ই হয়ে ওঠে প্রধান দর্শনীয় বস্তু। মোগল শাসকদের পতনের পর এই কামানটিও প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে ১৮৪০ সালে ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট ওয়ালটার্স ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কামানটিকে কাদা থেকে উদ্ধার করেন এবং চকবাজারের উত্তরে একটি বেদির ওপর স্থাপন করেন। তখন এটিও ‘কালে খাঁ’-র মতো পূজনীয় হয়ে উঠতে থাকে। এর শরীর ও বেদি দুধ, সিঁদুর ও ফুলে শোভিত থাকতো।
​স্থানান্তর ও জনপ্রিয়তা হ্রাস: সময়ের সাথে সাথে কামানটি ঢাকার বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা এর জনপ্রিয়তা ও পরিচিতিতে প্রভাব ফেলেছে:

​১৯২৫ সাল: ঢাকার জাদুঘরের কিউরেটর নলিনীকান্ত ভট্টশালী এটিকে চকবাজার থেকে মনোরম সদরঘাটে স্থাপন করেন। তখন শিশুরা এর মুখের ভিতরে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়তো, তাই ইংরেজ আমলে এর মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
​দেশভাগের পর: এটিকে সদরঘাট থেকে তৎকালীন জিন্নাহ এভিনিউ (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ) অবস্থিত গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনে রাখা হয়। তখন এটি ‘গুলিস্তানের কামান’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

​১৯৮৩ সাল: এরশাদ সরকারের সময় কামানটিকে গুলিস্তানের মোড় থেকে উঠিয়ে এনে ওসমানী উদ্যানের প্রধান ফটকের পেছনে স্থাপন করা হয়। সেই থেকে এটি লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলেছে।

​দুই সঙ্গীর গল্প
​কালে খাঁ জমজম বুড়িগঙ্গায় তলিয়ে যাওয়ার পর লোকমুখে একটি জনপ্রিয় কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা বিশ্বাস করত, বুড়িগঙ্গা থেকে প্রায়ই এক গুরুগম্ভীর গর্জন ভেসে আসে। তারা মনে করত, এ গর্জনের অর্থ হলো— ‘কালে খাঁ’ তার সঙ্গিনী ‘বিবি মরিয়ম’কে ডাকছে। এবং বহু ঢাকাবাসী হলফ করে বলতেন যে তাঁরা সেই আওয়াজ শুনেছেন!
​আজ হয়তো ‘বিবি মরিয়ম’-এর নামও অনেকের মনে নেই। ‘কালে খাঁ’ তো নেই-ই। কিন্তু পুরোনো ঢাকাবাসীর কাছে এই দুটি নাম ছিল ভয়, ভক্তি আর রোমাঞ্চের এক অবিচ্ছেদ্য সেতু, যা তাদের জীবন ও বিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে ছিল।

Weniger an

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.