বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অথচ ক্ষণস্থায়ী নাম — আবুল হাসান। তিনি ছিলেন এমন এক কবি, যিনি খুব অল্প সময়ে কবিতাকে দিয়েছিলেন গভীর অনুভবের এক নতুন দিগন্ত। তাঁর কবিতায় ফুটে ওঠে প্রেম, নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু এবং জীবনের অন্তর্গত বেদনা। মাত্র ২৮ বছর বয়সে চলে গিয়েও তিনি বাংলা কবিতায় রেখে গেছেন এক অনন্ত প্রতিধ্বনি। আবুল হাসান ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সংবেদনশীল ও একাকী প্রকৃতির। উচ্চশিক্ষা নিতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্য অধ্যয়ন করেন, কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে সাংবাদিকতা পেশা বেছে নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক জনপদ-এ কাজ করেন। কিন্তু লেখালেখিই ছিল তাঁর প্রকৃত জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। সাহিত্যকীর্তি আবুল হাসান খুব অল্প বয়সে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর কবিতায় গভীর বেদনা, একাকিত্ব, প্রেম, মৃত্যু-চেতনা ও মানবিক আবেদন প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কবিতাগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও আবেগ ও সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রধান কাব্যগ্রন্থসমূহ: ১. রাজা যায় রাজা আসে (১৯৭২) ২. যে তুমি হারিয়ে গেছো (১৯৭৬, মৃত্যুর পর প্রকাশিত) ৩. পৃথিবী শুধু কবিতা নয় (১৯৭৭, মৃত্যুর পর প্রকাশিত) তাঁর কবিতায় আধুনিক শহুরে মানুষের নিঃসঙ্গতা ও অস্তিত্ব সংকট ফুটে ওঠে।শব্দচয়নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সংযত ও কাব্যিক। নির্বাচিত কবিতা ও পঙ্ক্তি ১. “রাজা যায় রাজা আসে” রাজা যায়, রাজা আসে, রাজত্ব শুধু রয়ে যায়— এইখানে কোনো মানুষের নাম নেই, এইখানে কেবল ইতিহাসের নৈঃশব্দ্য।
— এখানে তিনি দেখিয়েছেন ক্ষমতা বদলালেও মানুষের দুঃখ-দুর্দশা অপরিবর্তিত থাকে। ২. “যে তুমি হারিয়ে গেছো” যে তুমি হারিয়ে গেছো, তোমাকে খুঁজে বেড়াই শহরের প্রতিটি জানালায়। জানি, তুমি কোথাও নেই— তবু সন্ধ্যায় বাতাসে তোমার মুখ ভেসে আসে। — প্রেম ও বিচ্ছেদের বেদনা তাঁর কবিতায় এমনভাবে প্রকাশ পায়, যেন তা নিঃশব্দ আর্তনাদ। ৩. “পৃথিবী শুধু কবিতা নয়” পৃথিবী শুধু কবিতা নয়, পৃথিবী রক্ত, ঘাম, আর অশ্রুর ইতিহাস। আমি কবিতা লিখি না, আমি লিখি মানুষের কষ্ট। — এখানে তিনি কবিতার বাইরে বাস্তব জীবনের কষ্ট ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেছেন। আবুল হাসনের একটি অতি বিখ্যাত লাইন “আমি জন্মেছি এই দুঃখের পৃথিবীতে, কষ্টের মধ্যেই হয়তো আমার মুক্তি।” — এটি আবুল হাসানের জীবনের দর্শনকেই প্রকাশ করে: তিনি জীবনের বেদনা থেকেই সৌন্দর্য খুঁজে পেতেন। মৃত্যুচেতনা ও শেষ জীবনের কবিতা জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে আবুল হাসান আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা, মানসিক ক্লান্তি, এবং জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁর কবিতায় নতুন রূপে প্রকাশ পায়। নিচের কবিতাগুলোয় সেই মৃত্যুচেতনা স্পষ্ট। “মৃত্যুর আগে” আমি জানি, মৃত্যু আমার জন্য অপেক্ষা করছে, একা ঘরে নিভে যাওয়া প্রদীপের মতো। তবু আমি আলো জ্বালাই — যদি কেউ ফিরে আসে, যদি কেউ একবার ডাকে আমার নাম। — এখানে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও জীবনের প্রতি গভীর টান প্রকাশ করেছেন। “শেষ চিঠি” বন্ধু, যদি কোনোদিন আমার কবিতাগুলো পড়ো, ভাবো না — আমি শুধু কষ্টের কথা লিখেছি। আসলে আমি ভালোবাসতে চেয়েছিলাম পৃথিবীকে, কিন্তু পৃথিবী আমাকে ভালোবাসেনি। — এটি তাঁর একাকিত্ব ও মানবিক বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। “বিদায়” আমি চলে যাবো — কেউ জানবে না, শুধু বাতাস জানবে আমার নিঃশ্বাসের গন্ধ। আমি চলে যাবো — খুব নিঃশব্দে, যেন কখনো কেউ আমাকে চিনত না।
— মৃত্যুর আগে লেখা এই কবিতাগুলোয় এক অদ্ভুত শান্তি আর বেদনা মিলেমিশে আছে। আবুল হাসানের একটি বিখ্যাত লাইন (শেষ জীবনকাল থেকে) “আমি মৃত্যুর কাছে যাবো, কিন্তু মৃত্যু আমাকে নেবে না— কারণ আমি আগে থেকেই মৃত, শুধু নিঃশ্বাস নিচ্ছি এখনো।” — এটি তাঁর গভীর আত্মবোধ এবং জীবনের অন্তিম ক্লান্তির প্রতিচ্ছবি। আবুল হাসানের জীবন ছিল দুঃখে ভরা, তবু তিনি ভালোবাসতেন পৃথিবীকে। তিনি বিশ্বাস করতেন, কবিতা হলো মানুষের আত্মার সত্য উচ্চারণ। কিন্তু অসুস্থতা ও মানসিক ক্লান্তি তাঁকে খুব তাড়াতাড়ি নিঃশেষ করে ফেলে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর, মাত্র ২৮ বছর বয়সে, তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান— রেখে যান তাঁর অমর কবিতার সুর। কবি নির্মলেন্দু গুণ ছিলেন আবুল হাসান-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁরা দুজনই একই সময়ে ঢাকায় সাহিত্যচর্চা করতেন — তরুণ, স্বপ্নবান, এবং কবিতায় বেঁচে থাকা মানুষ। আবুল হাসানের অকালমৃত্যু নির্মলেন্দু গুণকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি তাঁর শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন একটি বিখ্যাত উক্তিতে — “আবুল হাসান মরে গেল, যেন বাংলা কবিতা হঠাৎ চুপ করে গেল।”
এই কথাটি শুধু শোক নয়, বরং বোঝায় যে আবুল হাসান ছিলেন সমকালীন কবিতার এমন এক কণ্ঠস্বর, যাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বাংলা কবিতার ভেতরের এক বিশেষ বেদনাময় সুর যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে নির্মলেন্দু গুণ তাঁর স্মৃতিচারণমূলক লেখা ও সাক্ষাৎকারেও বলেছেন যে — আবুল হাসান ছিলেন “অত্যন্ত সংবেদনশীল, নিঃস্ব, কিন্তু ভেতরে বিশাল এক আবেগে পূর্ণ মানুষ,” যিনি “নিজের জীবনের দুঃখকে কবিতার মাধ্যমে সবার বেদনায় রূপ দিতে পেরেছিলেন।” আজও আবুল হাসানকে স্মরণ করা হয় “বেদনার কবি”, “অকালপ্রয়াত প্রতিভা” বা “নগর-বেদনার কণ্ঠস্বর” হিসেবে। তাঁর কবিতা যেন নিঃশব্দে বলে যায় — “আমি চলে যাবো, কেউ জানবে না, শুধু বাতাস জানবে আমার নিঃশ্বাসের গন্ধ।” আবুল হাসান এসেছিলেন ক্ষণস্থায়ী হয়ে কিন্তু বাংলা কবিতায় আকাশে তিনি এক উজ্বল তারাকা হয়ে জ্বল জ্বল হয়ে জ্বলবে আজীবন।
লেখক ; নুরুল আখন্দ খোকন
কবি, নাট্যকার । ফ্রাঙ্কফুর্ট /জার্মানি ।

