নেপাল আজ এক অস্থির রাজনৈতিক মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে। ছাত্র-যুবদের প্রবল বিক্ষোভে কেঁপে উঠেছে দেশ, প্রাণ গেছে অন্তত ৩০ জনের। পার্লামেন্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয় থেকে মন্ত্রীদের বাড়ি—কোথাও শান্তি নেই। আগুন, লুটপাট, হামলা যেন প্রতিদিনের ছবি। ওলির পতন—অন্তর্নিহিত সংকট না আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র? এই তীব্র পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী কে.পি. শর্মা ওলি। সেনার হেলিকপ্টারে তাঁর কাঠমাণ্ডু ত্যাগের দৃশ্য গোটা দেশে আলোচনার ঝড় তুলেছে। অজ্ঞাতবাস থেকে লেখা চিঠিতে তিনি দাবি করেছেন, তাঁর পতনের নেপথ্যে যুবসমাজ নয়, বরং এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। বিশেষত সীমান্ত প্রশ্নে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পরই তাঁর ক্ষমতা টালমাটাল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন ওলি। লিপুলেখ, ব্ল্যাকওয়াটার ও লিম্পিয়াধুরাকে নেপালের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি, কিংবা ভগবান রামের জন্মস্থান নেপাল বলার মতো বক্তব্যে তিনি জাতীয়তাবাদী আবেগ উস্কে দিয়েছিলেন। কিন্তু একই সঙ্গে এর মাধ্যমে তিনি ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র করে তোলেন। তাই ওলির অভিযোগ—তাঁকে সরাতে নয়াদিল্লির প্রভাবই মুখ্য—রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অমূলক মনে হলেও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
নেপালের নতুন প্রজন্ম, যাদের বলা হচ্ছে ‘জেন জি’, এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। তারা শুধু রাস্তায় নামেনি, সংগঠিতভাবে বিকল্প নেতৃত্বও খুঁজছে। ভার্চুয়াল বৈঠকে পাঁচ হাজারের বেশি তরুণ আলোচনা করে প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া এরই প্রমাণ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—অভিজ্ঞতার দিক থেকে সক্ষম হলেও কারকি কি সত্যিই এক অশান্ত তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন ? আন্দোলনকারীদের মধ্যে প্রবল উদ্যম থাকলেও সুসংগঠিত রাজনৈতিক কৌশল এখনও গড়ে ওঠেনি। ফলে এ আন্দোলন টেকসই হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি? অতীতের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি আজ যেন অনেক বেশি সংযুক্ত। সম্প্রতি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতনের পর আন্দোলনকারীদের দাবিতে মহম্মদ ইউনুসকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসানো হয়েছিল। নেপালের ঘটনাপ্রবাহেও অনেকে সেই ছায়া দেখছেন। তবে বাংলাদেশে যেখানে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবি ছিল কেন্দ্রে, নেপালে সেখানে সীমান্ত ইস্যু, জাতীয়তাবাদী আবেগ ও প্রজন্মগত ক্ষোভ একসঙ্গে মিশেছে। সেনার ভূমিকা—রক্ষক নাকি শাসক? বর্তমানে সেনা দেশজুড়ে কার্ফু জারি করেছে এবং আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নিয়েছে। এটি সাময়িক পদক্ষেপ নাকি সেনাশাসনের পূর্বাভাস—সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। ইতিহাস বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সংকটকালে সেনা অনেক সময় রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণে এগিয়ে এসেছে।
কিন্তু গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এটাই কি কাম্য পথ ? অনিশ্চয়তার প্রহর সবশেষে দাঁড়ায় এক কঠিন প্রশ্ন নেপালের ভবিষ্যৎ কী ? সুশীলা কারকিকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীরা নিলেও, তা কার্যকর করতে হবে সেনা ও প্রেসিডেন্টের অনুমোদনে। যদি সেই অনুমোদন মেলে, তবে নেপাল নতুন এক পরীক্ষার পথে হাঁটবে। যদি না মেলে, তবে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও গভীর হবে। ওলির পতন কেবল একজন নেতার পরাজয় নয়, বরং একটি প্রজন্মের ক্ষোভ ও এক দেশের আত্মপরিচয় খোঁজার সংগ্রাম। নেপাল আজ বাংলাদেশের পথের দিকে এগোচ্ছে, নাকি একেবারে ভিন্ন কোনও পরিণতির দিকে—সে উত্তর এখনও অজানা। তবে যা স্পষ্ট, এই সঙ্কট শুধু নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নয়; এর প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেই ।
হাবিব বাবুল ,
প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম । ।

