সাংবাদিক বিভুরঞ্জনের সাথে আমার খবু একটা জানাশোনা ছিল না। কেউ পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো, ক্লাবে গেলে মাঝেমাঝে দেখা হতো। সৌজন্যতা বা হালকা কিছু কুশল বিনিময় করতাম। অনেকদিন পেশাদারী সাংবাদিকতায় নাই, ফলে আশির দশকের পর যারা পেশায় এসেছেন অনেকের সাথেই আলাপ পরিচয় নাই। ক্লাবে রেগুলার না হওয়ায় আরও নাই। তবে বিভুরঞ্জন একজন পুরনো সাংবাদিক। দেখা হলে একজন নিবেদিতপ্রাণ এবং নিষ্ঠাবান সংবাদপত্রসেবী বলেই মনে হয়েছে।
একদিন নিখোঁজ থাকার পর কাল তার মরদেহ নদী থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। সোস্যাল মিডিয়ায় তার অন্তর্ধানপূর্ব নোটটা পড়তে পড়তে বেশ অবাক হয়ে পড়ছিলাম। মনে হচ্ছিলো যেন আমারই কথা! আমরা যারা স্বাধীনতা পূর্বকালে বা সত্তুর আশির দশকে সাংবাদিকতাকে জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে নিয়েছিলাম, যেন তাদেরই কথা! সেই কাজের অনিশ্চিয়তা! কাজ আছে তো মাসশেষে বেতন নাই। কয়েক মাসের বেতন বাকি রেখে হঠাৎ জবাব। বকেয়া আদায়ের জন্য স্যান্ডেলের তলি ক্ষয়! বাসা ভাড়া বাকি, পরের দিনের বাজারের টাকা নাই! বাচ্চার দুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে এরওর কাছে ধর্ণা! পড়তে পড়তে অবাক হচ্ছিলাম এই ডিজিটাল জামানায়ও এমন সাংবাদিক ছিলেন! আমাদের কালের মত জীবনের পুরোটাই অনিশ্চিয়তায় ভরা!
সে সময় সাংবাদিকতা ছিল একটা মিশন। অনেকের কাছে রাজনৈতিক মিশন। যারা আসতেন, জেনে এবং মেনেই যে এ পেশায় সচ্ছলতা নাই বিত্তবৈভব নাই। গাড়ী বাড়ী অলীক স্বপ্ন। নিত্য অভাবকে পূঁজি করেই পথ চলতে হবে। ফলে শত কষ্টেও আমরা হতোদ্যম হতাম না। রাতে কোনরকম কিছু মুখে দিয়ে ঘুম, সকালে আবার নতুন উদ্যোমে বের হয়ে পড়া। মনে আছে সত্তুর দশকের প্রথমার্ধে ব্যক্তিগত গাড়ী ছিল মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন সম্পাদকের। আমরা যারা রিপোর্টার বা ডেষ্কে কাজ করি বড়জোর একটা মটর সাইকেল চালাতে পারলেই নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতাম। রিকশায় উঠতে পারার মধ্যেও একটা বনেদী বনেদী ভাব চলে আসতো। এমনি এক সময়ে হাজার পাঁচেক টাকা জোগাড় করে একটা থার্ডহ্যান্ড ভক্সওয়াগন গাড়ী কিনলেন আমাদের বন্ধু ইত্তেফাকের রিপোর্টার জাহিদুজ্জামান ফারুক। আমরা তাতেই ঠারেঠারে তার দিকে তাকাতাম। এত টাকা ফারুক পেলো কোথায়!
সময়ের পরিবর্তনে যুগের পরিবর্তনে আজ সাংবাদিকদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। ক্লাবে গেলে পুরো চত্বরজুড়ে সাংবাদিকদের দামী দামী গাড়ী দেখে এখন আর অবাক হই না। সাংবাদিকতার সজ্ঞাটাই আজ বদলে গেছে। আমাদের সময়ের সেই মিশন অনেকের কাছে আজ নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের ভিশনে রূপান্তরিত। গত প্রায় চার দশক ধরেই এই অবস্থা। বিভুরঞ্জনের নোটটা পড়তে পড়তে অবাক হচ্ছিলাম একবিংশ শতাব্দীতে এই ষাট-সত্তুর দশকের মডেলটা কিভাবে এতদিন টিকে রইলো!
বিভুরঞ্জনের কোন রাজনৈতিক বিশ্বাষ ছিল কি না আমার জানা নাই। থাকলেও কোন মতাদর্শের তা জানারও আগ্রহ নাই। বিভুরঞ্জন একজন সাংবাদিক ছিলেন এটাই আমার কাছে তার একমাত্র পরিচয়। শেখ হাসিনার ১৬ বছরে এত এত সাংবাদিক নেতাকে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রীর সাথে যাদের দহরম মহরম। কেউ প্লট বাগালেন ফ্লাট নিলেন, গাড়ী বাড়ী বাংক লোন ব্যবসা বাণিজ্য হাতালেন। লক্ষ কোটী টাকার মালিক হলেন। সাংবাদিকদের কল্যানে নাকি এনারা জান-প্রান উজাড় করে দিলেন। এই বিভুরঞ্জন সরকার তাদের নেক দৃষ্টি থেকে বাদ পড়ে গেলেন কিভাবে! তিনি কি পেশাদার সাংবাদিক ছিলেন না! কেন তার সংসারে নিত্য অভাব। কেন বার বার বেকারত্ব। চাকুরির অনিশ্চিয়তা। কেন তার ছেলে মেয়েদু’টো ভাল পড়ালেখা করেও দাঁড়াতে পারলো না! নিদেন পক্ষে সরকারপন্থী সাংবাদিকদের ডাম্পিং হাউজ বলে বিবেচিত সরকারি সংবাদ সংস্থাটিতে বিভুর মত সত্যনিষ্ঠ এবং অভাবী সাংবাদিকের একটা চাকরি হলো না!
কি জবাব দেবেন আবুল কালাম আজাদ সাহেব! কিভাবে দায় এড়াবেন সাংবাদিক নেতা ওমর ফারুক কুদ্দুস আফ্রাদ মোল্লা জালাল! কি করলেন এই দু;স্থ সাংবাদিকটির জন্য ইকবাল সোবহান চৌধুরী ভাই! বন্ধু সুভাষ চন্দ্র বাদল, সাংবাদিক কল্যান ট্রাস্টের যিনি ছিলেন সর্বেসর্বা। বিভুরঞ্জনের ন্যুনতম বেঁচে থাকার জন্য কি কিছুই করা যেতো না! আজ জীবনের সকল জ্বালা জুড়িয়ে তিনি চলে গেছেন, এখন আর আহা উহু করে কি লাভ! বিভুরঞ্জন প্রমান করে গেলেন সবাই গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দেয় নাই। এখনও কিছু সাংবাদিক আছেন যারা লড়াই করে চলেছেন। জীবনযুদ্ধে এখনও বাজী ধরে আছেন। আমরা চাই না আর কোন বিভুরঞ্জন এভাবে নিজেকে আত্মাহুতি দেন। নেতারা, প্লিজ এদেরকে খুঁজে বের করুন। অন্তত: চারটে ডালভাত খেয়ে বাঁচতে সাহায্য করুন! খুন না আত্মহত্যা- ষড়যন্ত্রতত্ব হাজির করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া যাবে, তাতে বিভুরঞ্জন আর ফিরে আসবে না। তার বিপর্যস্ত পরিবারেরও এক পয়সা উপকার হবে না। পারলে পরিবারটার পাশে দাঁড়ান।
বিভুরঞ্জন সরকারের আত্মার পারলৌকিক শান্তি কামনা করছি।
সাঈদ তারেক , লেখক সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।
Mohammad Sirazul Islam
সব দায় লীগের এখন এটা প্রচার হচ্ছে প্রসার ঘটেছে।
-
Antworten
-
Übersetzung anzeigen
Saeed Tarek
ওতে কিছু যায় আসে না।
-
Antworten
-
Übersetzung anzeigen

