বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই রাজনীতির মঞ্চে মবতন্ত্রের কালো ছায়া পড়েছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেন একবার দৈনিক বাংলায় লিখেছিলেন, “আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।” স্বাধীনতার পর জনগণের স্বপ্ন ছিল গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ, কিন্তু বাস্তব বলল ভিন্ন কথা। গণতন্ত্র কেবল বইয়ের পাতায় বন্দি থেকে গেল, আলোর মুখ দেখল না।
১৯৭৩ সালে মবতন্ত্রের তাণ্ডব শুরু হয় সংবাদপত্রের কার্যালয়ে। গণকণ্ঠ পত্রিকার অফিসে আগুন দেওয়া হয়, সম্পাদক ও প্রখ্যাত কবি আল মাহমুদকে কারাগারে পাঠানো হয়। ১৯৭৪ সালের ১৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে জাসদের কার্যালয় ভস্মীভূত হয়। পুলিশের নাকের ডগায় এসব ঘটনা ঘটলেও মবতন্ত্রের দৌরাত্ম্য থামেনি। এমন ঘটনার তালিকা লিখতে গেলে পৃষ্ঠা ফুরিয়ে যাবে। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিরোধীরা নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালায়। কেরানীগঞ্জের এমপি বোরহান উদ্দিন গগনের বাসায় মবতন্ত্রের ধ্বংসলীলা আমি নিজ চোখে দেখেছি।
এরপর মার্শাল ল’ জারি হয়, যা ছিল মবতন্ত্রের আরেক রূপ। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এলে মবতন্ত্র কিছুটা কমে, কিন্তু শান্তি স্থায়ী হয়নি। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যার পর আবদুস সাত্তার ক্ষণিকের জন্য ক্ষমতায় আসেন। এরপর জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন মানুষকে ভয়ে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে, মবতন্ত্রের খবর তাই কম প্রকাশ পায়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর মবতন্ত্র ফিরে আসে নতুন উদ্যমে। জাতীয় পার্টির সভা-সমাবেশ ভাঙচুর করা হতো, মঞ্চে আগুন দেওয়া হতো। বিএনপির পতনের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মবতন্ত্র কিছুটা প্রশমিত হয়।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরলে প্রথমে মবতন্ত্র কমলেও, ২০১৪ সাল থেকে এটি আবার মাথাচাড়া দেয়। বিরোধী দলের সভায় পালটা কর্মসূচির নামে মবতন্ত্রের সঙ্গে পুলিশও যোগ দেয়। ভয়ের পরিবেশে মানুষ আতঙ্কে কাটায়। শেখ হাসিনার আমলে মবতন্ত্র বিরোধী রাজনীতি দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, এমনকি ব্যাংক দখলের মতো ঘটনাও ঘটে। এই মবতন্ত্রই তার পতনের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর মবতন্ত্র নতুন রূপে ফিরে আসে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িতে আগুন, মারধর আর ভাঙচুর শুরু হয়। তারা কোথাও সভা করতে পারেনি। পুলিশের চেয়ে মবতন্ত্র তাদের দমনে বেশি তৎপর। সম্প্রতি রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনের ঘটনা এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মবতন্ত্র কেবল ধ্বংসই বয়ে এনেছে। গণতন্ত্রের স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে এই অরাজকতা কখনো শান্তি ও অগ্রগতির পথে হাঁটতে দেবে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই মবতন্ত্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাব ?
হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

