কথায় বড় হলেই কাজে বড় হয় না, এই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের প্রত্যাশা থাকে কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হওয়ার। কাজ বলতে এখন অবশ্য তাকেই বোঝায়, যে ক্রিয়ায় লাভ আছে। সহজভাবে বললে, যা করলে টাকা অর্জন করা যায় তাকেই কাজ করা বলে। কাজের ফলেই সাফল্য, এর মানে এখন কাজের ফলে টাকা অর্জন। এটা যে কোনো পেশায় তো বটেই, এমনকি রাজনীতি, বিশ্বাস এবং আবেগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সাফল্য বিষয়টা এমন যে, তা বিনয় ভুলিয়ে দেয়। তাই শুধু নয়, অতীতকেও ভুলিয়ে দেয়। অবজ্ঞা করতে শেখায় সামাজিক দায়বদ্ধতাকে। মানুষ এবং প্রকৃতির কথা বলা অনেকটা শুনতে ভালো ধরনের কথা, যা কাজে লাগে না। অর্থাৎ যা করে টাকা আসে না। ফলে এসব যারা বলে এবং করে, তারা ভালো ভাষায় বললে ‘বোকা’ আর রাখ-ঢাক না করে বললে ‘আহাম্মক’। নীতির চাইতে কৌশল গুরুত্বপূর্ণ আর বুদ্ধিমান হওয়ার চাইতে চালাক হওয়া প্রয়োজনীয় এটাই এখন সমাজের শিক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এক অদ্ভুত বিষন্নতা গ্রাস করছে সাধারণ মানুষকে। এ কেমন সমাজ, যেখানে কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, কারও ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষের ওপর ভরসা করা ছাড়া মানুষ তো বাঁচতে পারে না, বিকশিত হওয়া অনেক পরের কথা। মানুষের ওপর মানুষের ভরসা এবং বিপরীতে মানুষের প্রতি মানুষের ভয়ের চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে অভ্যুত্থানে। কীভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আন্দোলনকে দমন করা যায় এবং আন্দোলনকারী মানুষ, মানুষের ওপর ভরসা রেখে পথে নেমে এলে কীভাবে শাসকের নিষ্ঠুর আক্রমণকে প্রতিহত ও পরাস্ত করতে পারে তা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে দেখেছে বাংলাদেশ। শাসকদের পতন ও পলায়নের পর প্রশ্ন এলো, এরপর কী? ক্ষোভের আগুনকে কাজে লাগিয়ে লুটপাট যেমন হয়েছে, তেমনি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু এসব ছাপিয়ে মানুষ চেয়েছে, একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ আসুক, যেখানে অন্তত স্বস্তি আসবে। তাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দ হলো ‘সংস্কার’। সংস্কার দরকার, সেটা সবাই মানলেও কতটুকু সংস্কার এবং কোথায় সংস্কার হবে তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে।
গণপরিষদ করতে হবে, স্বাধীনতার পর সংবিধান বিধান মেনে তৈরি হয়নি, এই যুক্তি জোরেশোরে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস কী বলে? ’৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ীরাই সংবিধান প্রণয়নের কাজ করেছিলেন। যারা এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা তো জানেন, পাকিস্তানের সংবিধান তৈরি করার গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ৩ জুন। পাকিস্তান হওয়ার আগেই ব্রিটিশের অধীনে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস ২০৮ এবং মুসলিম লীগ ৭৩ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট করাচীর সিন্ধু বিধানসভায় বসে গণপরিষদ। এই গণপরিষদ ছিল ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত, পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত, অর্থাৎ ৯ বছর। ভারতের গণপরিষদ গঠিত হয় ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে প্রথম অধিবেশন বসে ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে আর সমাপ্ত হয় ১৯৫৩ সালে। অর্থাৎ সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছে প্রায় ৭ বছর। নেপালে প্রথম গণপরিষদ গঠিত হয় ২০০৮ সালে। গণপরিষদ টিকে ছিল ২০১২ সাল পর্যন্ত। এই গণপরিষদে ২৪০ বছরের রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়। দ্বিতীয় গণপরিষদ ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। তাহলে দেখা গেল, গণপরিষদ করতে গেলে নির্বাচন করতে হবে এবং সংবিধান প্রণয়ন কোনো শর্টকাট পদ্ধতিতে হবে না। ঐকমত্য কমিশনের অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সংবিধান প্রণয়নের কাজ অত সহজ হবে না। জুলাই সনদ এখন বিতর্কের কেন্দ্র। সরকার বলছে, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। কিন্তু নির্বাচনকে শর্ত সাপেক্ষ করে তুলছে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। যদি সনদে সবাই স্বাক্ষর না দেয়, তাহলে কী হবে? সনদ কি সংবিধানের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ? অভ্যুত্থানকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে কীভাবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো কী হবে? শুধু লিখেই কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে? নির্বাচনকে কালো টাকা, পেশিশক্তি, প্রশাসন-পুলিশের হস্তক্ষেপমুক্ত ও ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে, সুষ্ঠু নির্বাচন কী হবে? এসব প্রশ্ন ঘুরে-ফিরে আসছে বারবার।
অন্তর্বর্তী সরকার কোন প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা ছাড়বে, কখন ছাড়বে, নির্বাচন কখন হবে এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে যে সরকার ক্ষমতায় থাকবেন তারা অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা পূরণ করবেন কি না, এ ধরনের জল্পনা-কল্পনার মধ্যে আটকে আছে দেশের মানুষের আলোচনা। অনেকে বলছেন, ঐকমত্য কমিশন দিনের পর দিন সভা করে নানা বিষয়ে ঐকমত্য করে মূল বিষয়ে অনেকটা বিরোধ তৈরি করে দিয়েছেন। সংবিধান নাকি ফ্যাসিবাদ তৈরি করেছে এমন কথা বলে সংবিধান পুনর্লিখন, নতুন সংবিধান তৈরি করার দাবি করছেন কেউ কেউ। আবার সংবিধান সংশোধন করে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে তা পাস করিয়ে নেওয়ার কথা বলছেন কেউ কেউ। এই বিরোধ এখন তুঙ্গে। অন্তর্বর্তী সরকারে যারা নানা সুবিধা পাচ্ছেন, তারা নির্বাচন বিলম্বিত করার পাঁয়তারা করছেন, এমন অভিযোগও তোলা হচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর দুর্নীতি ও দখল নতুন রূপ নিয়েছে। চাঁদাবাজি, মব সন্ত্রাস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল যেমন ঘটছে তেমনি কারখানা বন্ধ হওয়ায় বেকারত্ব তীব্র রূপ নিয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য কম। আবার রাজনীতিতে বিরোধ থাকলেও, লুটপাটে ঐক্যের নানারূপ দেখছে দেশের মানুষ। পত্রিকা এবং টিভিতে খবর এসেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাদাপাথর লুটপাটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৪২ জন রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা আছেন। এই লুটপাটে নাকি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবির নিষ্ক্রিয়তা ও সহযোগিতা ছিল। সাদাপাথর এলাকায় এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়ে দুদক এসব তথ্য জানতে পেরেছে। এনফোর্সমেন্ট অভিযান শেষে দুদক ঢাকায় একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। এতে জানানো হয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে অসাধু ব্যক্তিরা যোগসাজশ করে সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্র থেকে কয়েকশ কোটি টাকার পাথর অবৈধভাবে উত্তোলন করে নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর থেকে, বিশেষ করে তিন মাস ধরে, পাথর উত্তোলন চলতে থাকে। সর্বশেষ ১৫ দিন আগে নির্বিচার পাথর উত্তোলন ও আত্মসাৎ হয়। এতে প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে এলাকাটি অসংখ্য গর্ত ও বালুচরে পরিণত হয়েছে।
ঢাকায় পাঠানো দুদকের প্রতিবেদনে ছয়টি ক্যাটাগরিতে পাথর লুটে জড়িত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় এবং সরকারি সংস্থাগুলোর কার কী ভূমিকা ছিল, তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি), পুলিশ সুপার (এসপি), উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) নিষ্ক্রিয়তা, লুটেরাদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়াসহ নানা অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রায় ৮০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচার হয়েছে পত্রপত্রিকায়। কী দাঁড়াল তাহলে? দুর্নীতির টাকা মুছে দিল সব বিরোধের রেখা? সব কিছুকে টাকার মাপে মাপতে শেখায় পুঁজিবাদ। কিন্তু টাকার কাছে সব ছোট হয়ে গেলে, বিনিময়যোগ্য হয়ে গেলে সবচেয়ে বিপন্ন হয় মানুষ। রাজনীতি শেখায় দায়বোধ, সেই রাজনীতি টাকাওয়ালাদের কাছে পরাজিত হয়ে যাচ্ছে। এর বিষময় ফল কি শুধু বাংলাদেশ, বিশ্ববাসী ভোগ করছে না? যেকোনো আন্দোলনেই নেতা লাগে, ডাক দেওয়ার এবং ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডাক দেওয়া এবং ডাকে সাড়া দেওয়া, এই দুই বিষয় এক বিন্দুতে না মিললে আন্দোলন সফল হয় না। নাম না জানা লাখ লাখ মানুষ যার যার ক্ষেত্রে সাহসের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় নামলেই, কেবল কোনো আন্দোলন তার সফল পরিণতি পায়। এরাই অজানা বীর আর অচিহ্নিত নায়ক। অভ্যুত্থান ঐক্যবদ্ধ করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, কিন্তু অভ্যুত্থানের নায়ক যাদের বলা হলো, তারা এর শতভাগ মর্যাদা রক্ষা করতে পারলেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধে মূল নায়ক ছিলেন শ্রমিক-কৃষক, যারা জীবন বিপন্ন করে লড়াই করেছেন, অকাতরে জীবন দিয়েছেন, নেতাদের ডাকে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার লাল সূর্য। কিন্তু যুদ্ধের পর তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল আড়ালে। তেমনি এবারও অসীম সাহসে লড়েছে ছাত্র, শ্রমিক, শিশু, শিশুর মায়েরা। জীবন-রক্ত, অশ্রু দিয়ে গড়ে তোলা প্রতিরোধের সামনে টিকতে না পেরে পালিয়ে গেল, স্বৈরাচারী শাসক। কিন্তু রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে বিতর্কের নামে বিভক্তি, মুক্তিযুদ্ধকে আড়াল করা আর এতদিনের সংগ্রামকে অস্বীকার করার কারণে মানুষ ভুলে যেতে বসেছে কী আকাক্সক্ষা ছিল তাদের!
বিতর্ক হচ্ছে সংবিধান নিয়ে। সংবিধান হলো জনগণের সর্বোচ্চ ইচ্ছার প্রতিফলন। মানুষ চায় দেশ চলবে তাদের মতের ভিত্তিতে, জনগণের স্বার্থে। জনগণ জানবে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, কিন্তু দেশের প্রধান বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিকে। এতে ব্যয় বাড়বে, দেশের নিয়ন্ত্রণ কমবে এবং দুর্নীতি ঠেকানো যাবে না। বিশাল বিশাল ক্রয় চুক্তি করা হচ্ছে, মেগা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু এসব সিদ্ধান্ত কোথায় নেওয়া হচ্ছে তা জানা যাচ্ছে না। যে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে কিংবা যে জনগণ ঋণ পরিশোধ করবে, তারা কিছুই জানবে না। তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কার কোথায় হলো? আগের ধারাবাহিকতাই কি চলছে? ক্ষমতায় যারা আছে, সবকিছু তাদের মর্জিতেই চলবে, জনগণ শুধু আজ্ঞাবাহক? শাসকদের মধ্যে দেশ শাসনের এই ঐকমত্য ছিল এবং আছে। লুটপাটকারী ও দুর্নীতিবাজদের ঐক্য, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা শুধু নষ্ট করে না ভীতি ছড়িয়ে দেয় সমাজে। অভ্যুত্থানের পর মানুষ এমন ঐক্য দেখতে চায় না। তারা চায়, শান্তিময় ভবিষ্যৎ। আমরা যেন স্বাধীনতার প্রশ্নে, দেশের প্রশ্নে, নাগরিক মর্যাদার প্রশ্নে পারস্পরিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে পারি।
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

