“জলের শ্যাওলা”– আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ‘মুক্ত’ এই ছোট্ট শব্দটির অর্থ বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের সকলের কাছেই জলের মতন পরিষ্কার তবে এর প্রতিক্রিয়া বা বাস্তবতা সমগ্র বিশ্ব জুড়েই অত্যন্ত কঠিন এবং বাস্তবিক অর্থেই কঠিন। কেন কঠিন?
বিশ্বের যে কোন প্রান্তেই তাকান না কেন কোন কিছুই মূলত মুক্ত নয়। মুক্ত শব্দটির অর্থের সাথে প্রভাব যখন জড়িয়ে যায় তখন মৌলিক অর্থেও মুক্ত আর মুক্ত থাকে না। এটা শুধুমাত্র গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেই নয়, সর্বত্রই। সব বিষয়ে মুক্ত নিয়ে আলোচনা করা অসম্ভব কেননা প্রেক্ষাপট বৃহৎ এবং কখনোই শেষ হবার নয়। তবে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম যেহেতু মত প্রকাশের প্রধান মাধ্যম এবং মত প্রকাশের মাধ্যমেই আসল সত্য বা বাস্তবতা সামনে আসে, সেই অর্থেই একটি নির্দিষ্ট রেটিংয়েই গণমাধ্যমগুলো বিশেষভাবে বিবেচিত হয় কতটা মুক্ত বা কতটা বন্দি এবং সেটাও আবার বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সর্বত্রই একই পারদের স্কেলে উঠানামা করে কিনা, সেখানেও প্রশ্ন থেকেই যায় কেননা মুক্ত শব্দটির পাশাপাশি প্রভাব শব্দটিও সমান তালে ক্রিয়া করে যে। তবুও নিম্নের পক্ষে কিছু একটা সূচকেই আজকে ৩ মে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস।
বিষয়টি হালকা মেজাজে বলি, পিঠে মার দিলেও পেটে ভাত দেওয়া বা মন্দের ভাল বলা যায়। এই যে মন্দের ভাল বললাম, এটা একপ্রকার সিঁড়ির মতন। বিষয়টি ব্যাখ্যার প্রয়োজন। সহজভাবে বলি, সিঁড়ির প্রকারভেদ আছে। বাঁশের সিঁড়ির (যা আমরা মুখের ভাষায় চঙ বলি), ইট- পাথরের সিঁড়ি আবার আধুনিক যুগে লিফ্ট। মূলত সিঁড়ির মৌলিক বা মূল কাজ উপরে উঠার। উপরের তিনটি সিঁড়ি বা উপসর্গ বা মাধ্যম সবগুলোই মূলত উপরে উঠার মাধ্যম। স্বাভাবিক কারণেই উপরে উঠার গতিও প্রকারভেদে কোন সিঁড়ির হবে, সেটার গতিটাও তেমন হবে। ওই যে, লিখলাম ‘মন্দের ভাল’, গণমাধ্যমের জন্য এই প্রকারভেদে সিঁড়িগুলোর মতন। চঙ থেকে ইট- পাথরের বা লিফ্টের উপরেই নির্ভরশীল গতি।
১৯৯১ সালে ইউনেস্কোর ২৬তম সাধারণ অধিবেশনের সুপারিশ অনুযায়ী ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ৩ মে দিনটিকে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। লক্ষ্য করুন, এই দিবসে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠার মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ, বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতার মূল্যায়ন, স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ প্রতিহত করার শপথ নেওয়ার পাশাপাশি ত্যাগী সাংবাদিকদের স্মরণ ও তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো হয়। বিষয়টি সত্যিই বেশ তবে সর্ষের ভিতরেই ভুত থাকে। ‘মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ’ এই বাক্যটি দ্বারাই কিন্ত মুক্ত শব্দটিকে ব্রাকেট বন্দিও করা হয়ে যায় কেননা রাষ্ট্র ট্যু রাষ্ট্রভেদে এই মৌলিক নীতিমালা নির্ভর করে আবার শাসন ব্যবস্থার উপর। বিষয়টি সত্যিই অনেক অনেক জটিল এবং মোটেও পরিষ্কার নয়। তবে ইউনেস্কোর চেষ্টা একটি আছে নিম্নেরপক্ষে যেন বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোকে একটি রেটিংয়ের ছাতার তলে এনে মোটাদাগে যে কোন রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার একটি রূপকেও প্রকাশের প্রয়াশ পায়। কোন রাষ্ট্রের গণমাধ্যম রেটিংয়ে যত উপরে ধরে নেওয়া যায় সেই রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকার ততটা ভাল চর্চায় বাস্তবিক কি থাকে, সেটা আবার ভিন্ন প্রশ্নের তৈরি করে।
মূলত বিশ্বের যে কোন প্রান্তেই গণমাধ্যমের কথা উঠবে তো শাসন ব্যবস্থার কথা জড়িয়ে যাবে কেননা গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের সর্বত্র এবং সব বিষয়ে কাজ করে তবে সকল বিষয়ই মূলত রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার অংশ। সুতরাং সেই সূত্রে বলাই বাহুল্য গণমাধ্যম আর শাসন ব্যবস্থা একে অপরের যেমন সঙ্গী তেমনটাই একে অপরের শত্রুও বটে। বাংলায় বিখ্যাত শিল্পী আব্দুর জব্বারের একটি গানের কথা স্মরণ হলো। গানটি ছিল, “শত্রু তুমি, বন্ধু তুমি, তুমিই আমার সাধনা” মূলত বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার সাথে গণমাধ্যমের একপ্রকার চোর- পুলিশের খেলা চলে এবং আবহমান ধরেই ওটা চর্চা হয়ে আসছে এবং চলবেই। সেই সূত্রে বলাই যায় ইউনেস্কোর এই রেটিং পদ্ধতিটি একটি মাত্রাস্কেলে একটি রাষ্ট্রের শাসন ব্যবস্থার একটি রূপ অবশ্যই প্রকাশে সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
একটি রাষ্ট্রের জনমানুষেরা গণমাধ্যমকে যেভাবেই গ্রহণ করুক এবং গণমাধ্যম যেভাবেই কাজ করুক, মূলত একমাত্র গণমাধ্যমই একটি রাষ্ট্রের আসল দর্পণ। তবে একথা নেহাত সত্য যে, পুঁজিবাদের বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের ক্ষমতা আর অর্থের দাপট কোন না কোনভাবে সকল গণমাধ্যমের উপর প্রভাব বিস্তার করে। বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের এমন কোন রাষ্ট্রের এমন কোন গণমাধ্যম মূলত নেই যা প্রভাব বিহিন চলতে পারে অর্থাৎ গণমাধ্যমে প্রভাব নিশ্চিত থাকেই থাকে। রেটিং যতই থাকুক, বিশ্বের যেকোন রাষ্ট্রের যত বড় বড় গণমাধ্যম আছে (যে কোন গণমাধ্যম) মূলত সবগুলোই কোন না কোনভাবে প্রভাবিত। তবে একথাও সত্য যে, শত প্রভাবের মাঝেও গণমাধ্যম তার নিজেস্ব দর্শন ও জন্মসূত্রের চরিত্রের কল্যাণেই আবার গণমাধ্যমের রূপে বারবার প্রকাশিতও হয়ে বিশ্বেও একটি প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ক্ষমতা- অর্থ- দাপট- প্রভাব এগুলো গণমাধ্যমে ছিল- আছে- থাকবেই এবং এগুলো উপেক্ষা করেই মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে প্রতিজ্ঞা হোক দার্শনিক ভলতেয়ারের উক্তিতে, “I wholly disapprove of what you say—and will defend to the death your right to say it”- আমি তোমার কথার সাথে বিন্দুমাত্র একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষার জন্য আমি জীবন দেবো- ভলতেয়ার (Voltaire)।
শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকাটি সর্বদাই মত প্রকাশের স্বাধীনতায় শতভাগ বিশ্বাস রাখে এবং শতভাগ মত প্রকাশের প্রত্যয় নিয়েই শুদ্ধস্বর পত্রিকাটি শুরু হয়েছিল এবং পরিচালিত হয়ে আসছে এবং শতভাগ মত প্রকাশের প্রত্যয়েই আগামীর দিনে পথ চলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আজকের ৩ মে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার সকল সম্পাদক মণ্ডলীর পক্ষ থেকে স্বাগত জানাই দিবসটিকে এবং শুদ্ধস্বর পত্রিকাটির পথ চলা বরাবরের মতন সততার সাথে থাকুক সেই প্রত্যয়ে বিশ্ব গণমাধ্যম মানুষের কল্যান বয়ে আনুক, সেই কামনা করছি।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

