যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাতার থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিলাসবহুল বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান উপহার পাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। যদিও তিনি এই উপহার গ্রহণে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে রাজনৈতিক বিভাজনের মাঝেও এবার তার নিজ দলের অনেক নেতা ও সমর্থক এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। মূলধারার গণমাধ্যম, প্রভাবশালী রক্ষণশীল বক্তা, এমনকি তার ঘনিষ্ঠ অনুগামীদের একাংশও এটিকে ঘুষ, দুর্নীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি কাতারের রাজপরিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগকে একটি অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৪৭-৮ বিমান উপহার দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এই বিমানটি সম্ভাব্যভাবে ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’ বহরের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, যেটি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারিভাবে ব্যবহৃত বিমানের নাম। তবে এখনই বিমানটি ব্যবহারের উপযোগী নয়—সংস্কার ও আপগ্রেডে বহু বছর এবং বিপুল অর্থ ব্যয় হবে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস। ট্রাম্প বলছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উপকারী উপহার। কিন্তু সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, কাতার কেন হঠাৎ এমন বিশাল উপহার দিচ্ছে, তার পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা আছে কিনা।
রক্ষণশীল ডেইলি ওয়্যারের বক্তা বেন সাপিরো এই উদ্যোগকে ‘ন্যক্কারজনক’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি তার পডকাস্টে বলেন, “কাতার এটা ট্রাম্পকে আনন্দ দিতে দিচ্ছে না, বরং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কৌশল মাত্র।” তিনি আরও অভিযোগ তোলেন, কাতার অতীতে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অর্থায়নে জড়িত ছিল এবং তারা আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসবাদের অন্যতম বড় পৃষ্ঠপোষক। কাতার যদিও এসব অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ভাবা হয় এমন অনলাইন ব্যক্তিত্ব লরা লুমার এ বিষয়টি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি ট্রাম্পপন্থী সোশ্যাল মিডিয়া বার্তার জন্যই এই সিদ্ধান্তকে দায়ী করেন এবং এটিকে ‘একটি দাগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন পোস্ট করেন যেখানে একটি জঙ্গি-ভর্তি বিমানকে ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে দেখানো হয়—মনে করা হচ্ছে এটি বন্ধুত্বের মুখোশে একটি ফাঁদ।
মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিক্রিয়াও ট্রাম্পের পক্ষে যায়নি। নিউ ইয়র্ক পোস্ট স্পষ্ট করে বলেছে, “কাতারের জেট কোনো ‘বিনামূল্যের উপহার’ নয় এবং ট্রাম্পেরও এটি গ্রহণ করা উচিত হবে না।” এমনকি ফক্স নিউজ, যেখানে ট্রাম্প সাধারণত প্রশংসিত হন, সেখানেও মার্ক লেভিন কাতারকে ‘সন্ত্রাসী রাষ্ট্র’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বিমান গ্রহণের সিদ্ধান্তকে নিন্দা জানিয়েছেন।
কাতার দূতাবাস জানিয়েছে, এটি ব্যক্তিগত নয় বরং দু’দেশের সরকারের মধ্যে হওয়া প্রতিরক্ষা লেনদেন। কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল-থানি বলেন, “এটি কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে হওয়া একটি সরকারিভিত্তিক চুক্তি।” হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিটও বলেন, প্রশাসন সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা মেনে চলেছে এবং বিদেশি উপহার নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সব আইন অনুসরণ করা হয়েছে।
মার্কিন সংবিধানে রয়েছে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকে উপহার নিতে পারবেন না। যদিও হোয়াইট হাউস বলছে, বিমানটি ব্যক্তিগত নয়, বরং মার্কিন সরকারের জন্য। তবে অনেকে যুক্তি তুলছেন, এত বড় উপহার নিশ্চয়ই বিনা প্রত্যাশায় আসছে না। আইনজীবী পাম বন্ডি বলেন, এখানে কোনো শর্ত নেই, তাই এটিকে ঘুষ বলা যাবে না। কিন্তু ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় যোগদানের আগে বন্ডি কাতারের লবিস্ট ছিলেন বলেও উঠে এসেছে, যা সন্দেহ আরও ঘনীভূত করছে।
এই বিতর্কের মধ্যেই ট্রাম্পের কোম্পানি কাতারে বিলাসবহুল গল্ফ রিসোর্ট নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। এবিসি নিউজের সাংবাদিক র্যাচেল স্কট হোয়াইট হাউসে এক প্রশ্ন করেন, “যারা বলছেন এটি আপনার ব্যক্তিগত উপহার, তাদের আপনি কী বলবেন?” উত্তরে ট্রাম্প বিষয়টিকে “ভুয়া খবর” বলে উড়িয়ে দেন এবং বলেন, “আমাদেরকে বিনা পয়সায় কিছু দিলে আমি কেন বলব যে তা নিই না?” পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি দাবি করেন, বিমানটি তার জন্য নয়, বরং মার্কিন বিমানবাহিনীর জন্য। তিনি এটিকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মতো একটি রাষ্ট্রীয় উপহার হিসেবেও তুলনা করেন।
রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই বিষয়টি নিয়ে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। সিনেটর র্যান্ড পল বলেন, “এই উপহার গ্রহণের কারণে কাতারের মানবাধিকার রেকর্ড বিচার করার ক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে।” আরেক সিনেটর টেড ক্রুজ বলেন, “এতে গুপ্তচরবৃত্তি ও নজরদারির ঝুঁকি রয়েছে।” তবে কিছু নেতা যেমন সেন টমি টিউবারভিল একে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ বলে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক কৌশলবিদ ডগ হেই মনে করেন, “অন্য যে কোনো রাজনীতিবিদের জন্য এটি কেলেঙ্কারি হতো, কিন্তু ট্রাম্প এসব ব্যাপারে বরাবরই চতুরভাবে এড়িয়ে যান।”
৪০০ মিলিয়ন ডলারের একটি বিমান উপহারের প্রস্তাব এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প এটিকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে উপহার বললেও সমালোচকরা মনে করছেন, এটি বিদেশি প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার। এখন দেখার বিষয়, এই বিতর্ক ভবিষ্যতে ট্রাম্পের রাজনৈতিক পথচলায় কতটা প্রভাব ফেলবে। তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা

