কোথায় এবং কতটুকু সংস্কার

রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা বিতর্ক। তবে সব বিতর্কের কেন্দ্রে যে বিষয় তা হলো, অন্তর্বর্তী সরকার কত দিন থাকবেন আর নির্বাচন কবে হবে? সংস্কারের পরে নির্বাচন নাকি সংস্কার ও নির্বাচনের পরে সংস্কার? ছোট সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচন নাকি বড় সংস্কার করে দেরিতে নির্বাচন এই আলোচনায় সরগরম রাজনৈতিক মহল। যেকোনো আন্দোলনে বিজয়ের আগে এবং পরে চাওয়াগুলো এক থাকে না। আন্দোলনে থাকে দাবি আদায় করার প্রতিজ্ঞা, আর বিজয়ের পরে আসে দাবি বাস্তবায়নের দায়। ফলে আন্দোলনকারীরা সমালোচনা করেন ক্ষমতাসীনদের, কিন্তু বিজয়ের পরই আসে সমালোচনা সহ্য করার দায়িত্ব। প্রশ্ন উঠতে থাকে, আন্দোলনের সময় যা বলেছিলেন তা কি করছেন? ফলে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে কতটা আন্তরিক এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে কি না, সে ব্যাপারে সতর্ক নজরদারির মধ্যে পড়ে যান তারা। সে সময় ধৈর্য রক্ষা করে আন্দোলনের সাথিদের সঙ্গে নিয়ে পথ চলতে গেলে রাজনৈতিক দায় এবং প্রজ্ঞা লাগে। সেটা অর্জন করতে না পারার কারণে অতীতের বহু আন্দোলন বিজয়ের পরও ব্যর্থতার কানাগলিতে হারিয়ে গেছে। সাফল্যের কৃতিত্ব নিয়ে টানাপড়েন যেমন হয়, তেমনি ক্ষমতার স্বাদ পেতে বিরোধে জড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের বন্ধুরা শত্রুতে পরিণত হয়। তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন এবং দৃশ্যমান সাফল্য না দেখলে, জনগণের হতাশা এবং পরাজিতদের  ফিরে আসার সম্ভাবনা দুটোই বাড়তে থাকে। ফলে আবার উত্তেজনা এবং অস্থিরতা তৈরি হয়।

গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা আমাদের দীর্ঘদিনের। নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ হলেও যখনই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করেছে, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করেছে, দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার চেষ্টা করেছে তখন ফুঁসে উঠেছে জনগণ। সে কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে এবং পরে অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিস্ট শাসকদের ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করার জন্য গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন হয়েছে। সময়কালের পার্থক্য থাকলেও ১৯৬৯, ১৯৯০ এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে ঐক্যের জায়গাটা এখানেই। কিন্তু প্রতিরোধে, অংশগ্রহণে এবং জীবনদানে অর্থাৎ আন্দোলনের তীব্রতায় এবং ছাত্র শ্রমিক জনতার মিলিত শক্তির সামনে দাঁড়াতে না পেরে, শাসকগোষ্ঠীর সদলবলে পলায়নের কারণে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান অপর দুটির তুলনায় এক অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করে। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর শাসকদের বুকে কাঁপন ধরানো আর অত্যাচারিত জনগণের বুকে সাহস জাগাবার জন্য এই অভ্যুত্থান একটা প্রতীক হয়ে থাকবে। ক্ষমতাসীনদের প্রতিরোধ করার দৃষ্টান্ত এবং একটা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য মানুষের ন্যূনতম আকাক্সক্ষা দুটোই দেখিয়েছে এই অভ্যুত্থান।  ইতিহাসের শিক্ষা এই যে, আন্দোলন যত তীব্র হয় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষাও ততই বাড়তে থাকে। জুলাই আগস্টের আন্দোলন তাই জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাকে অনেক বড় করে দিয়েছে। আর কেউ যেন ফাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে এই প্রত্যাশা সবার মনেই। ১৫ বছর ধরে আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের দাবি নিয়ে নানা স্তরে এবং নানা পর্যায়ে তীব্র রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারকে উচ্ছেদ করে মানুষ শুধু বিজয়ী হয়েছে তাই নয়, তাদের দাবির যৌক্তিকতাও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে শুধু রাজনৈতিক দলগুলো নয়, সমাজের সব স্তরের মানুষের বিপুল আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে। গণমানুষের প্রত্যাশার চাপ বিপুল। সব আকাক্সক্ষার কেন্দ্রীভূত রূপ হিসেবে, দেশে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে এই আকাক্সক্ষা মানুষের দীর্ঘদিনের। এই আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হলে সুষ্ঠু, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন যেমন দরকার, তেমনি দরকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপযোগী শাসন-প্রশাসন, আইন-কানুন, বিধি-বিধান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিচার-প্রথা প্রতিষ্ঠান, সামরিক-বেসামরিক প্রতিষ্ঠানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থা। জনমতের সঠিক প্রতিফলন, জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রাখার মতো নির্বাচন ব্যবস্থা তৈরি করতে হলে প্রয়োজন নির্বাচনের ওপর ক্ষমতাসীন দলের ও সরকার প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করা, টাকা, পেশিশক্তির প্রভাব এবং আঞ্চলিকতা-সাম্প্রদায়িকতাকে নির্বাচনে ব্যবহার বন্ধ করা। এই কঠিন অথচ প্রয়োজনীয় কাজ করতে সরকারের সামর্থ্য, সময় এবং পদক্ষেপ জনগণ প্রত্যাশা করে।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র গড়ে তোলার যে আকুতি প্রকাশ পেয়েছে, তার প্রতিফলন হিসেবে সংস্কার কমিশন গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কমিশনের প্রস্তাবগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৬টি কমিশন তাদের সুপারিশ জমা দিয়েছে। স্বাধীনতার পর অনেক কমিশন গঠন ও সুপারিশ দেখা গেলেও, এবারের বিস্তৃতভাবে সুপারিশসহ প্রতিবেদন প্রকাশ আলোচনা ও বিতর্কের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।   প্রতিটি কমিশনের প্রতিবেদনে অনেক মৌলিক এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশ প্রণয়নে অতীতের অনেক রাজনৈতিক ঘটনার ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন রাজনৈতিক দলগুলো তাদের মতামত দেওয়া এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি। পাশাপাশি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। বাংলাদেশের মানুষ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়েছে বারবার। কোনো স্বৈরাচারই সহজে ক্ষমতা পরিত্যাগ করেনি। কিন্তু দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার বিদায় হলেও, প্রতিবার ব্যবস্থা বদল না হয়ে ক্ষমতার হাত বদল হওয়ার কারণে নতুনভাবে যারা ক্ষমতায় আসীন হয় তাদের মধ্যেও  দুর্নীতিবাজ ও স্বৈরাচারী হওয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠে। এটা হয় জবাবদিহির সংস্কৃতির পরিবর্তে আমরাই সব করেছি, এই অহমিকাসুলভ মানসিকতার জন্য। আমরা বিজয়ী অতএব সব আমাদের এ কথা ভেবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রগুলো দখল করার প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে সংবিধান ফ্যাসিবাদ তৈরি করে এ কথা ঠিক মনে করি না। বরং সংবিধানে যতটুকু দায়বদ্ধতার কথা বলা আছে তা অস্বীকার করা এবং নিজেদের ইচ্ছামতো শাসন-প্রশাসন চালাবার কারণে স্বেচ্ছাচারী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সামরিক অথবা বেসামরিক উভয় স্বৈরাচারের ক্ষেত্রেই এটা সত্য। আর ফ্যাসিবাদ কোনো ব্যক্তি নয়, ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদী শোষণের ফল এবং একটি আর্থসামাজিক ব্যবস্থার সৃষ্টি। এটা তো সত্যি, শুধু আইন কাউকে স্বেচ্ছাচারী করে না আর শুধু আইন বদলালেই স্বেচ্ছাচারী হওয়া প্রতিরোধ করা যায় না, ব্যবস্থা বদল সাপেক্ষে জনগণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধই কেবল পারে স্বৈরাচারী প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে। ফলে স্বৈরাচারবিরোধী গণতান্ত্রিক লড়াই অব্যাহত রাখা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে অন্যতম রক্ষাকবচ। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, আন্দোলনের স্বাধীনতা ছাড়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অগ্রসর করে নেওয়া সম্ভব নয়। নিপীড়িত জনগণের নিষ্ক্রিয়তাও শাসকদের স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠতে সহায়তা করে।

রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা কোনোভাবেই আলোচনার বাইরে থাকতে পারছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভেতর থেকে শক্তি অর্জনের ব্যাপার যেমন আছে, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগের ওপর শাসকদের নির্ভরশীলতার ব্যাপারও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বিপুল আমদানি এবং সীমিত রপ্তানির দেশ। প্রায় ৯০ বিলিয়ন ডলারের আমদানির বিপরীতে রপ্তানি ৫৬ বিলিয়ন ডলারের মতো। আমদানি রপ্তানির এই ঘাটতি পূরণে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। আর বিদেশি প্রযুক্তি ও  পুঁজিরও প্রয়োজন হয়। এটা আনতে গেলে বিনিয়োগ বাড়ানো, ঋণ করা প্রভৃতি পদক্ষেপ নিতে হয় সরকারকে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের কাছে ঋণ নিয়ে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে গেলে কোনো দেশ যে সহজে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, ঋণের সুদ আর আসল শোধ দিতে গিয়ে ঋণের দুষ্টচক্রে বাধা পড়ে সে রকম দৃষ্টান্ত কম নেই। তারপরও ঋণ নিতে থাকে আর ঋণের শর্ত পূরণ করতে জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়ায়, বিদ্যুৎ-গ্যাস-তেলের দাম বাড়ায়, ভর্তুকি কমায় কৃষি, স্বাস্থ্য খাতে, শিক্ষার রাষ্ট্রীয় দায় কমিয়ে জনগণের দায় বাড়াতে থাকে। এর ফলে জনগণ ক্ষুব্ধ হয় আর বিপরীতে সরকারি দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে।  এখন বিতর্ক সামনে আনা হয়েছে যে, কতটুকু সংস্কারের পর নির্বাচন হবে? ক্ষমতা পরিবর্তনের তিন ধরনের নজির বাংলাদেশে দেখা গেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে, সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এবং গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক কাঠামো ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে হলে, নির্বাচনকে ক্ষমতা হস্তান্তরের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি বলে ধরে নেওয়া হয়। একটি নির্বাচিত সরকারের  মধ্যমেয়াদি, লক্ষ্য নির্দিষ্ট ও সুস্থির নীতিকাঠামো না থাকলে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কোনো বিনিয়োগ হয় না। কারণ সরকার কত দিন আছে, সরকারের ধারাবাহিকতা নিয়ে সংশয় থাকলে কেউ তো বিনিয়োগ করতে চাইবে না।

জুলাই আন্দোলনের পেছনে অন্যতম কারণ বা চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক দুর্নীতি। বিগত সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা হিসাব না করে অনেক বিনিয়োগ করা হয়েছিল, প্রকল্পের ব্যয় বহু গুণ বাড়ানো হয়েছিল। অথচ উন্নয়ন বাজেটের প্রায় পুরোটাই ছিল ঋণনির্ভর। এসব নিয়ে তখন প্রশ্ন করা হলে, উন্নয়নের শত্রু বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জনগণের কষ্টে অর্জিত টাকার অপব্যবহার, প্রকল্প বিলাসিতা হয়েছে অনেক। সুশাসনের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে এসব নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। দেশ থেকে টাকা পাচারের কোনো আইনগত বিধান নেই। তারপরও টাকা পাচার হয়েছে। বিভিন্নভাবে অসদুপায়ে অর্জিত অর্থ নানা উপায়ে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ভয়াবহ টাকা পাচার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট তৈরি করেছে। এসব কিছুই মোকাবিলা করতে হচ্ছে এখন। ঝড়ের তীব্রতায় সব লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়ার পর যেমন আবার গুছিয়ে তুলতে হয় সবকিছ,ু তেমনি বর্তমান সরকারের ওপরও সেই দায়িত্ব পড়েছে। ফলে এই সময়কালে আস্থার সংকট যেন তৈরি না হয়, সেই দিকটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সংস্কার নিয়ে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে কি না, কোনো রাজনৈতিক দলকে বেশি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে কি না এসব নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে, তা ভবিষ্যতে জটিলতা বাড়াবে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যতটুকু সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে তাকে ভিত্তি করে অগ্রসর হলে, কম বিতর্কে বেশি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হতে পারে ।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.