রাজনীতি নিয়ে নানা নেতিবাচক কথা থাকলেও রাজনীতিবিহীন রাষ্ট্রের কথা কল্পনাও করা যায় না। এক সময় গ্রিকরা বলতেন, যে রাজনীতি করে না সে বর্বর। এখন সে কথা সে ভাবে না বললেও বলা যায়, বাতাসের মধ্যে থেকে বাতাসকে অস্বীকার করা শুধু অজ্ঞতা বা বোকামি নয়, বরং পরিকল্পিত শয়তানি। এর অর্থ দাঁড়ায় আপনি সমাজে থাকবেন সমাজ সম্পর্কে জানবেন না, রাষ্ট্রের নাগরিক হবেন কিন্তু রাষ্ট্র গড়ে ওঠার ইতিহাস জানবেন না, রাষ্ট্রের গতিময়তা বুঝবেন না, রাষ্ট্র পাল্টাবার প্রয়োজন বোধ করবেন না, প্রকৃতিতে থাকবেন, কিন্তু প্রকৃতির পরিবর্তন এবং সেখানে আপনার ভূমিকা অনুভব করবেন না। এর সহজ অর্থ দাঁড়ায়, যা চলছে চলুক, আপনার কিছু আসে যায় না। আপনি হয় অন্যের শ্রমের সুবিধাভোগী অথবা অদৃষ্টবাদী হয়ে যা আছে কপালে বলে বসে থাকবেন। কিন্তু এটা তো মানুষের স্বভাব নয়। মানুষ দেখে, ভাবে, চিন্তা করে, খুশি হয়, বিরক্ত হয়, ভালোবাসে, বিরোধিতা করে। সে কারণেই একদল মানুষ যারা প্রচলিত ব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা নেয়, তারা চায় মানুষ সমস্যা নিয়ে ভাবে ভাবুক, কিন্তু সমাধানের লক্ষ্যে ভূমিকা যেন পালন না করে। জনগণের কাছে এই বার্তা দিতে চায়, তোমরা থাকো তোমাদের জীবন নিয়ে আর আমরা তোমাদের জীবন কীভাবে চলবে বা চালাব, তা নির্ধারণ করে দেব।
ইতিহাস এত সরল গতিতে চলে না। আর সমাজ কোনো নিস্তরঙ্গ জলরাশি নয়। বাতাসে সেখানে তরঙ্গ ওঠে, যে পাড়ের বাঁধনে আটকে থাকে সেই পাড় ভেঙে যায়। এই পাড়ে আটকে থাকা যেমন, পাড় ভাঙাটাও তেমনি রাজনীতি। প্রতিদিনের বাতাস যে পরিবর্তন ঘটায় তা নজরে না এলেও বাতাস যখন ঝড় হয়ে দেখা দেয় তখন সবাই তা টের পায়। রাজনীতিতে একে বলে অভ্যুত্থান। অনেক দিনের চুপ করে থাকা মানুষগুলো তখন চেপে রাখা ক্ষোভের উদ্্গীরণ ঘটায়, ফেলে দেয় ঘাড়ের ওপর চেপে থাকা সরকার নামের ক্ষমতার প্রতীকটিকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটেছে কয়েকবার। কিন্তু ২০২৪ সালে যা ঘটল তা আগেরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপকতা অংশগ্রহণ আর প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এত মৃত্যু আর নির্যাতন মোকাবিলা করে শাসককে ক্ষমতা থেকে সরাতে হয়নি আগে। শাসকের নির্যাতন যত বাড়ে মুক্তির প্রত্যাশাও তত তীব্র হয়। আগস্ট অভ্যুত্থানেও সেটাই ঘটেছে। অনেক গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে এর মধ্যে একটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক আলোচনা নিষেধের পরিবর্তে লেখা হয়েছিল রাজনৈতিক আলোচনা জরুরি।
উন্নয়নের আড়ালে লুণ্ঠন, ক্ষমতা স্থায়ী করতে নির্বাচনে কারচুপি ও কারসাজি, সমালোচনার সব কণ্ঠকে রুদ্ধ করতে কালাকানুন, প্রতিবাদকে স্তব্ধ করতে দমন-পীড়নের নৃশংস সব পথ অবলম্বন, মুনাফার জন্য ব্যবসায়ীদের হাতে মানুষকে জিম্মি করার ঘটনা জনগণ দেখেছে ১৫ বছর আর জনগণের প্রতিরোধে পদত্যাগ ও দেশত্যাগের ঘটনা ঘটিয়েছে শাসক দল। এর মধ্য দিয়ে প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে যে, আর এ রকম দুর্নীতি হবে না, দমন-পীড়ন করবে না, জনগণের সম্পদ লুট করে বৈষম্যের পাহাড় গড়া হবে না আর মানুষকে অমর্যাদা করা হবে না। নির্বাচন হবে মত যাচাই এবং প্রার্থী বাছাই করার গণতান্ত্রিক উপায়। সেখানে থাকবে না পয়সা, পেশিশক্তি ও প্রশাসনের মাধ্যমে প্রহসনের খেলা। রাজনীতিকে খেলা অথবা কৌশল বানিয়ে নীতিবিবর্জিত কাজ আর হবে না। প্রতিটি গণআন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা দেশবাসী প্রত্যাশা করে এবারও প্রত্যক্ষ করেছে ছাত্রদের সাহসী ও অবিস্মরণীয় ভূমিকা। ছাত্রদের সঙ্গে পথে নেমে এসেছিল শ্রমিক, নারী, শিশু। তাদের বুকের বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছিল বৈষম্যবিরোধী স্লোগানে। কিন্তু বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে পরাজয়ের ছায়া কি প্রলম্বিত হচ্ছে দেশের রাজনীতিতে? দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা বৃদ্ধি, নারীর ওপর বিধিনিষেধ বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি বৃদ্ধি, শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্তের দুর্দশা বৃদ্ধি আর রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি নিশ্চয়ই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা ছিল না?
এখন আলোচনায় প্রধান বিষয়, নতুন রাজনৈতিক দল গঠন। ছাত্ররা দল গঠন করবে। এ লক্ষ্যে তারা দেশ জুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে এ কথা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের দাভোস সফর করেন ড. মোহাম্মদ ইউনূস। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রধান বৈদেশিক বিষয়ক ভাষ্যকার গিডেয়েন রাখমানের উপস্থাপনায় একটি পডকাস্টে এমন কথা বলেন। সেই আলোচনায় অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘একটি সম্ভাবনা হলো, ছাত্ররা নিজেরাই একটি দল গঠন করবে। শুরুতে যখন তারা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করছে, তখন তিনজন ছাত্রকে আমার উপদেষ্টা পরিষদে নিয়েছিলাম। আমি বলেছিলাম, যদি তারা দেশকে ‘প্রাণ’ দিতে পারে, তাহলে তারা উপদেষ্টা পরিষদে বসতে পারে এবং প্রাণ দেওয়ার জন্য কী করছে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তারা ভালো কাজ করছে।’ এখন ছাত্ররা বলছে, কেন নিজস্ব দল গঠন করা হচ্ছে না, তারা একটা সুযোগ নেবে এ কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, তারা বলছে, তাদের (ছাত্রদের) কোনো সুযোগ নেই, এমনকি সংসদে তাদের একটিও আসন থাকবে না। কেন? কারণ, কেউ তাদের চেনে না। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘আমি তাদের বললাম, পুরো জাতি তাদের চেনে। তারা যা করতে চায়, সে বিষয়ে তাদের একটা সুযোগ দিই। সুতরাং তারা এটা করবে।’
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘দল গঠনের প্রক্রিয়ার মধ্যে হয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এটাও একটা বিপদ। কারণ, রাজনীতি শুরু করলে সব ধরনের রাজনীতিবিদ তাদের সঙ্গে মিশে যাবে। তাই আমরা জানি না তারা আমাদের দেশে যে রাজনীতি, তা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারবে কি না। এ ধরনের সুযোগ আছে, যা আমাদের নিতে হবে। তবে ছাত্ররা প্রস্তুত। তারা প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা দেশ জুড়ে লোকজনকে সংগঠিত করছে।’ পডকাস্টে উপস্থাপক এ পর্যায়ে প্রশ্নে বলেন, ভারতীয়রা যেসব বিষয় বলছেন, তার একটি বিষয়ে আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তারা বলছে, বাংলাদেশের অবস্থা খুবই নাজুক। অধ্যাপক ইউনূস হয়তো না-ও ঠিক থাকতে পারেন। কিন্তু সেখানে ইসলামিস্টরা রয়েছে, যারা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন? তখন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘আমরা এমন লক্ষণ দেখি না। অন্তত আমি এখন কোনো লক্ষণ দেখি না। তরুণরা সত্যিই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাদের খারাপ কোনো কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শ নেই বা নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছানোর ব্যক্তিগত আকাক্সক্ষা নেই। তারা এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল গঠন করছে বা রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছে। এটা দরকার। কারণ, রক্ত দিয়ে তারা যেগুলো অর্জন করেছে, সেগুলো তাদের রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় সেগুলো সেই সব ব্যক্তি নিয়ে যাবে, যারা বিগত প্রশাসন ও অন্যান্যের মতো সব কিছুর পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ খুঁজছে। এটাই বাংলাদেশে আমাদের রাজনৈতিক পরিবেশ। সুতরাং তারা এটা রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তাই আমি বলব, ছাত্রদের স্বচ্ছ অভিপ্রায় থাকবে।’ প্রধান উপদেষ্টার এই সাক্ষাৎকারের পর আর কোনো অস্পষ্টতা নেই। এ কথা তিনি রেখে ঢেকে বলেননি। তিনি জানেন এবং তার অভিপ্রায় আছে যে, ছাত্রদের নেতৃত্বে দল গঠিত হোক। তার কথার মধ্য দিয়ে ভোটারের বয়স ১৭ বছর করা এবং নির্বাচনে দাঁড়ানোর বয়স ২১ বছর করার যে প্রস্তাব তিনি দিয়েছিলেন তার সঙ্গেও সাযুজ্য পাওয়া যাবে।
কিছুদিন ধরে নানা ঘোষণা ও তৎপরতার ফলে এটা তো স্পষ্ট যে, নতুন দল হচ্ছে। সেই দল ক্ষমতার ছায়ায় বেড়ে উঠবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ক্ষমতায় থেকে দল গঠন করা, নির্বাচন করা, বিজয়ী হওয়া ও সরকার গঠন করা, ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ঘটনা তো নতুন নয়। এবারও তার পুনরাবৃত্তি হবে কি না এই সন্দেহ রাজনৈতিক মহলে আছে। এ রকম পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা পদ ছাড়বেন এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, রাজনৈতিক দলে অংশ নিতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পদ ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত তিনি ও আরেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া নেননি। তিনি বলেছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি হলে তারাই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবেন। এরপর সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, রাজনৈতিক দল গঠনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না। জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখনো আমরা এটা ভাবিনি। আমরা তো সরকারের কার্যক্রমই করছি। এই আলাপটা আসছিল যখন আসলে রাজনৈতিক দল থেকে সরকারে থেকে রাজনৈতিক দলে অংশগ্রহণের কথা বলা হচ্ছিল। তখন কথার পরিপ্রেক্ষিতে আমি বলেছিলাম, নতুন রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো দল হোক, আমরা সরকারে থাকা অবস্থায় সেটার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হব না। এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত আমাদের নেই।’ তার এই বক্তব্য কিন্তু মানুষের মধ্যে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল। রাজনৈতিক দল গঠন প্রসঙ্গে কী করবেন এবং কখন করবেন তারা তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আরও বাড়বে। রাজনীতিতে কথা চালাচালি থাকে বলে মানুষ ধরে নেন। কথার মারপ্যাঁচে প্রতিশ্রুতি হারিয়ে যায় বা ভুলিয়ে দেওয়া হয়। মানুষ কথার পাশাপাশি দেখতে চায় পদক্ষেপ। প্রশ্ন উঠছে, এখন কি ছাত্রদের রাজনৈতিক দল হবে নাকি নাগরিকদের দল হবে? নতুন দল কি নতুন পথে হাঁটবে নাকি ক্ষমতার প্রশ্রয়ে থেকে ক্ষমতা সংহত করার পুরনো পথেই চলবে? রাজনীতি খুবই জরুরি, সঙ্গে সঙ্গে জরুরি ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া। ইতিহাসে কোন রিসেট বাটন নেই, আছে ভবিষ্যতের লক্ষ্যে গতিময়তা। ভবিষ্যতের সেই যাত্রাপথে প্রত্যাশার পরাজয় যেন না হয় সে লক্ষ্যেই পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশের মানুষ
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক ।

