এগোতে চাইছি কিন্তু এগোচ্ছি কি ?

সংস্কার প্রস্তাবনা ও বিতর্কে এখন সরগরম রাজনৈতিক মহল। সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে কতখানি সংস্কার ও কতদিন সময় লাগবে, এ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি এখনো। নতুন দল গঠন, নির্বাচনকালীন সরকারের চরিত্র, সংস্কার এবং নির্বাচন সবকিছু এক সূত্রে গাঁথা হবে কি না এ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে যেমন, তেমনি এক-এগারোর ছায়া দেখতে পাওয়ার মতো আশঙ্কা প্রকাশ, রাজনীতিতে বিতর্কের পালে নতুন হাওয়া দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা কর্র্তৃক অভিযোগ ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ চলছে। এর মধ্যেই চলছে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়া প্রণয়ন। কী থাকছে এতে বা কতখানি সুরক্ষিত হবে জনগণ ও গণমাধ্যমের অধিকার, তা নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। তবে কিছু সন্দেহ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অতীতের মতোই নিবর্তনের আইন হবে না তো! এমন প্রশ্নও অনেকের মনে জাগছে। গণ-অভ্যুত্থান শুধু ক্ষমতা থেকে শাসকদের উচ্ছেদ করে না, অভূতপূর্ব গণজাগরণের মধ্য দিয়ে জনগণের আকাক্সক্ষার সীমানা বাড়িয়ে দেয়। ২৪-এর অভ্যুত্থানেও সেটাই হয়েছে। গত ১৫ বছরে বিরোধী দলকে দমন করার অন্যতম হাতিয়ার ছিল মামলা। মিথ্যা মামলা কথাটির সঙ্গে দেশবাসীর পরিচয় দীর্ঘদিনের। রাজনীতি করতে গেলে মামলা খেতেই হবে, এটা সবাই মেনেই নিয়েছে। কিন্তু বিগত সরকার গায়েবি মামলার যে দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে তা ছিল এক কথায় ভয়াবহ। কোনো রাজনৈতিক নেতা শতাধিক মামলার বোঝা ঘাড়ে নিয়ে চললে আদালতের বারান্দার বাইরে তার কি আর যাওয়ার সময় থাকে? তাই আন্দোলনে দাবি উঠেছিল মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলা দিয়ে হয়রানি বন্ধ করতে হবে। রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে, বিরোধিতা থাকবে, এর মধ্য দিয়ে ভুল-শুদ্ধ যাচাই করার ক্ষমতা তৈরি হবে। এ কথা সবাই মানেন, কিন্তু ক্ষমতায় থাকলে শাসকরা সমালোচনা সহ্য করতে চায় না আর বিরোধিতাকে গুঁড়িয়ে দিতে চায় এই দৃষ্টান্তই প্রবল। এই প্রবণতা নিয়ন্ত্রণের পথ কী?

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চাইলে গণতান্ত্রিক আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনীতি, প্রশাসন ও পুলিশের সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে দমন-পীড়ন বাড়তে থাকে আর তৈরি হয় ভয়ের সংস্কৃতি। এই অভিজ্ঞতা থেকে সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। কিন্তু যতটুকু জানা গেছে, তাতে সাইবার নিরাপত্তা আইন কি নিরাপত্তাহীনতা দূর করবে না বাড়িয়ে তুলবে, এই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি জীবনকে যেমন সহজ করে, আবার জীবনে জটিলতাও তৈরি করে। উন্নত সমাজ গড়তে হলে উন্নততর প্রযুক্তির সঙ্গে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের উন্নততর দায়িত্ববোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল টেকনোলজি দুনিয়ার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের মানুষকে কত কাছে নিয়ে এসেছে, কত কাজ সহজ করে দিয়েছে, কষ্ট করে তথ্য মনে রাখার পরিবর্তে এক লহমায় সব হাজির করে দিচ্ছে এসব যেমন সত্যি, তেমনি অপরাধের নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। ফলে এসব নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে মানুষের কাছে। মানুষের সারা জীবনের গড়ে তোলা মানসম্মান কেউ চাইলেই ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সমাজে উত্তেজনা তৈরি করা সহজ, সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ধ্বংস করা সহজ। এর ফলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে সামাজিক ভারসাম্য। এসব এখন গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। ডিজিটাল জগতে নানা ধরনের অপরাধ দমনের জন্য আইন দরকার এ কথা বলে আইন তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০০৬ সালে। তখন প্রণয়ন করা হয় তথ্যপ্রযুক্তি আইন। শৃঙ্খলা রক্ষার নামে প্রণীত এই আইনের ৫৭ নম্বর ধারাটি বিতর্ক, আতঙ্ক আর ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়নের কাজে ব্যবহার করার আশঙ্কা তৈরি করে। কারণ সেখানে মানহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে এমন সব বিষয়ে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ ১৪  বছর ও সর্বনিম্ন ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা অর্থদণ্ড দেওয়ার বিধান করা হয়। যেহেতু আইনে অপরাধের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ছিল না। ফলে মানুষকে বিশেষত বিরোধী রাজনৈতিক দলকে হয়রানির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়।

বেশ কিছু ঘটনায় সে আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক দল, সামাজিক- সাংস্কৃতিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ ও সমালোচনার মুখে তথ্যপ্রযুক্তি আইনকে পরিবর্তন করে ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু সেখানেও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় বর্ণিত  অপরাধকে বিভিন্ন ধারায় ভাগ করে রেখে দেওয়া হয় এবং এর রাজনৈতিক ব্যবহার শুরু হয়। ২০২৩ সালের জুনে সংসদে তৎকালীন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাসের পর এই আইনে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭ হাজার ১টি মামলা করা হয়েছে। এই মামলাগুলোর বেশিরভাগই যে মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যমূলক তা প্রমাণিত হয়েছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) ২০২৪ সালের এপ্রিলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে করা ১ হাজার ৪৩৬টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনীতিবিদ (৩২  শতাংশ) ও সাংবাদিকই (২৯ শতাংশ) বেশি। সিজিএস জানিয়েছিল, অভিযোগকারীর প্রায় ৭৮ শতাংশই ছিল  আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী-সমর্থক। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই আইন। দেশের ভেতরে সমালোচনা ও আন্দোলন, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার আপত্তির মুখে আওয়ামী লীগ সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রহিত করে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে সাইবার নিরাপত্তা আইন করে। কিন্তু এই আইনেও দমনমূলক ও বিতর্কিত ধারাগুলো রেখে দেওয়া হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাজা কিছুটা কমানো হয় এবং কিছু ধারা জামিনযোগ্য করা হয়। বাস্তবে আইনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ আগের মতোই হবে এ কথা বলে তখন ব্যাপক সমালোচনা ও প্রতিবাদ হয়েছিল। আইন তার নিজের গতিতে চলবে বলে পুরনো সেই আপ্তবাক্য এবং আইন কখনো অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে না, এই অর্থহীন আশ্বাস সত্ত্বেও আইনের দমনমূলক ব্যবহার দেখেছে এবং নিপীড়ন ভোগ করেছে দেশের জনগণ। গণ-আকাক্সক্ষার কারণে জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করা হবে এই ঘোষণা দেয়। পরবর্তীকালে তৈরি করা হয় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়া। আইনে কী থাকবে আর কী বাদ দেওয়া হবে এই প্রশ্নে বিতর্কিত সাইবার নিরাপত্তা আইনের ৯টি ধারা নতুন সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের খসড়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইসিটি সচিব। ধারাগুলো হলো ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩৪। এর মধ্যে চারটি ধারা বেশি বিতর্কিত ছিল। সেগুলোতে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকা সম্পর্কে বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি ও কুৎসামূলক প্রচারণার দণ্ড (২১); পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণ, আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শন, তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ (২৫); মানহানিকর তথ্য প্রকাশ (২৯); আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো ইত্যাদি অপরাধ ও দণ্ডের (৩১) কথা বলা হয়েছিল। এসব ধারা বাতিল হয়েছে।

২৪ নম্বর ধারায় পরিচয় প্রতারণা বা ছদ্মবেশ ধারণসংক্রান্ত অপরাধের কথা বলা হয়েছিল। নতুন খসড়ায় ২৩ নম্বর ধারায় আংশিকভাবে এসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে। ২৬ নম্বর ধারায় অনুমতি ব্যতীত তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের কথা বলা হয়েছিল। কাছাকাছি ধরনের অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে নতুন খসড়ার ২২ ধারায়। ২৭ নম্বর ধারায় সাইবার সন্ত্রাসের অপরাধের কথা বলা হয়েছিল। সেটা নতুন খসড়ায় ২৩ নম্বর ধারায় রাখা হয়েছে। ২৮ নম্বর ধারায় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও অনুভূতিতে আঘাতের শাস্তির কথা বলা হয়েছিল। নতুন অধ্যাদেশের খসড়ার ২৬ নম্বর ধারায় সাইবার স্পেসে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক তথ্য প্রকাশ করলে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ৩৪ নম্বর ধারায় মিথ্যা মামলা করা হলে শাস্তির বিষয়ে বলা ছিল। নতুন আইনে তা ২৮ নম্বর ধারায় আছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে আইনে ধর্মীয়, জাতিগত বিদ্বেষ-বিষয়ক সংক্রান্ত বিধান যদি রাখতেই হয়, তবে তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হবে। কারণ সমাজে নানা বৈচিত্র্যের মানুষ রয়েছে, তারা সংখ্যালঘু হলে তাদের প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু সংখ্যালঘুদের হয়রানি করার ক্ষেত্রে বিদ্বেষ কথাটা যে কতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং হবে সে বিষয়টা বিবেচনা করতে হবে। তাই এ ধরনের বিধান রাখতে হলে, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার। নয়তো শুধু অপব্যবহার নয়, পরিকল্পিত ব্যবহারের সুযোগ থেকেই যাবে। যা আতঙ্কে রাখবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুসহ যেকোনো চিন্তাশীল, মানবিক মানুষকে, বিশেষ করে মব ভায়লেন্সের ভয়াবহ বিস্তার যখন ঘটেছে এবং পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হচ্ছে। আইন যদি কখনো হয়রানির অস্ত্রে পরিণত হয় তখন তার জঘন্য ব্যবহার ঘটতে থাকে। এই আতঙ্ক তাহলে তাড়া করতে থাকবে মানুষকে।

অভ্যুত্থানের আগে এবং পরে কী পরিবর্তন হলো, তা জনগণ বুঝতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন যেমন দৃশ্যমান হয়, আইনকানুনের পরিবর্তন তত দ্রুত দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু এর প্রভাব বুঝতে একটু সময় লাগে। সে কারণে আইন তৈরির আগেই বিতর্ক করে যত দূর সম্ভব ত্রুটিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক করার চেষ্টা করতে হয়। আইনের প্রয়োগ যেহেতু ক্ষমতাসীনরা করে থাকে, তাই তাদের হাতে অবাধ অধিকার ও আইনি হাতিয়ার তুলে দিলে স্বেচ্ছাচারের ক্ষেত্র তৈরি হবে আবার। সুরক্ষা দেওয়ার নামে শঙ্কিত করে তোলার অতীতের দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাইবে না কেউ। ফ্যাসিস্ট শাসক উচ্ছেদ করে আমরা গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাচ্ছি এই ঘোষণার সঙ্গে আইন যেন সংগতিপূর্ণ হয়। তা না হলে প্রশ্ন জাগবেই। আমরা এগোনোর ঘোষণা দিচ্ছি, কিন্তু এগোচ্ছি তো ?

 

 

লেখক : রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.