সব সরকারই বলে তারা জনগণের সরকার, কাজ করে জনগণের স্বার্থে। তাদের প্রধান সাফল্য বলে যা তারা প্রচার করে তা হলো এই যে, তারা জনগণের স্বার্থরক্ষা করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, যে জনগণের জন্য তাদের এত প্রচেষ্টা এবং প্রচার তার সুফল জনগণ কতটুকু পায়? শুনতে খুব সহজ হলেও এটি কিন্তু এক ধরনের বিপজ্জনক প্রশ্ন। ‘জনগণ ভালো নেই’ এ কথা বললে প্রথম যে প্রশ্নটার মুখোমুখি হতে হয় তা হলো আগে কি এর থেকে ভালো ছিল? অথবা ব্যাখ্যা শুনতে হয়, আগের সরকারের কারণে কিংবা বিরোধীদের বিরোধিতার কারণে এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে জনগণকে। এখন জনগণের উচিত সরকারের সব কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে যাওয়া। কিন্তু সরকার যাই বলুক, সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তার সংসার। সেখানে প্রতিনিয়ত তাকে মোকাবিলা করতে হয় আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের। আয় বাড়ানোর পথ জানা না থাকায় ব্যয় কমানোর সব পথে হাঁটতে হয়। ব্যয় সংকোচনের প্রথম বলি খাদ্য তারপর পোশাক, বাসা ভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা আর বাবা-মায়ের প্রতি দায়দায়িত্ব। শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে বা ব্যাংকে সঞ্চয় বলতে আর কিছু থাকে না। বাজারে প্রতিনিয়ত বেড়ে চলছে খাদ্যপণ্যের দাম অথচ সেইভাবে বাড়ছে না জনগণের আয়। ফলে নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে খাদ্যপণ্য। এরই ধারাবাহিকতায় আবারও নাগালের বাইরে ছুটছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ নভেম্বর মাসে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে সাধারণ বা গড় মূল্যস্ফীতির হারও বেড়েছে। এই হার বেড়ে ১১ দশমিক ৩৮ শতাংশ হয়েছে গত মাসে যা ছিল ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। নভেম্বর মাসে অর্থাৎ বাড়ি ভাড়া, আসবাবপত্র, গৃহস্থালি, চিকিৎসাসেবা, পরিবহন ও শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে। ফলে এ মাসে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশে যা অক্টোবর মাসে ছিল ৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আলোচনার জন্য পরিসংখ্যানের তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু মানুষ তো পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যস্ফীতি বুঝে না, তারা বুঝে বাজারে দাম দেখে আর জীবনের অভিজ্ঞতায়।
ভোজ্য তেল নিয়ে আবার পুরনো খেলার পুনরাবৃত্তি হলো। সাধারণ ক্রেতার স্বার্থরক্ষা নয়, ব্যবসায়ীদের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে সরকারি মহল। ব্যবসায়ীদের কথামতো দুই ধাপে শুল্ককর কমিয়েও গত এক মাসে ভোজ্য তেলের দাম ভোক্তা সহনীয় করতে পারেনি। কারণ বিষয়টা শুল্ক বাড়ানো কমানো নয়, এখানে ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা আছে কীভাবে তারা দামবৃদ্ধিকে যুক্তিসংগত করবেন। প্রথমে বাজার থেকে পণ্য উধাও করো, তারপর আলোচনা করো, লোকসানের দোহাই দাও, শুল্ক কমানোর দাবি করো, ঋণ পাওয়ার ব্যবস্থা করো তারপর খুব সীমিত (!) লাভে বিক্রি করার ঘোষণা দাও। এই ফর্মুলায় দাম বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সয়াবিন তেল বাজার থেকে উধাও করেছেন। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিজেরাই বাড়িয়েছেন দাম। সর্বশেষ সরকারিভাবে লিটারে ৮ টাকা বাড়ানো হলেও মাসব্যাপী ২৮ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি করেছে। এর ফলে কী হবে? অতিরিক্ত দামে বিক্রির মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা ভোক্তার পকেট থেকে অতিরিক্ত আরও প্রায় ৫১৩ কোটি টাকা লোপাট করবে। যাদের এসব দেখার কথা তারা অতীতের মতোই কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে ব্যবসায়ীদের দেখানো পথেই হাঁটছেন, উপদেশমূলক কথা বলছেন, মৃদু ধমক দিয়ে বলছেন, বাজারে নৈরাজ্য চলবে না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা জানেন, কর্র্তৃপক্ষের তর্জন গর্জনই সার। এতে ভুগছেন ভোক্তা আর ভাবছেন তাদের পক্ষে কেউ নেই। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়ে ১৪৯ টাকা থেকে ১৫৭ টাকা এবং বোতলজাত তেল ১৬৭ টাকা থেকে ১৭৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু এরপরও বেশি দামে খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে, তাহলে সাধারণ ক্রেতারা কী করবেন? তেল খাওয়া কমান, স্বাস্থ্য ভালো রাখুন এই কথা ভেবে স্বস্তি পাওয়া ছাড়া আর কী করার আছে তাদের?
একটু অংকের হিসাব করে দেখা যাক! ট্যারিফ কমিশনের তথ্যমতে, সরকারি হিসাবে বছরে দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২২ লাখ টন। এতে দেখা গেছে এক মাসে তেলের দরকার হয় ১লাখ ৮৩ হাজার ৩৩৩ টন। একদিনে তেল লাগে ৬ হাজার ১১১ টন। লিটার হিসাবে দিনে ৬১ লাখ ১১ হাজার ১১১ লিটার তেলের দরকার হয়। সেক্ষেত্রে লিটারে ২৮ টাকা বেশি দরে বিক্রি হলে, মাসে ভোক্তার পকেট থেকে লুট হয়েছে ৫১৩ কোটি টাকারও বেশি। ব্যবসায়ীদের কিছু যুক্তি আছে যা সাধারণ ক্রেতারা শুনে চুপ করে থাকেন। যেমন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। পাশাপাশি ডলারের মূল্য বেড়েছে। এলসি করতে পারছেন না। এ কথাগুলো ব্যবসায়ীরা আগের সরকারের আমলেও বলতেন। এর কিছুটা সত্যতা আছে। সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কয়েকদিন আগে অল্প পরিমাণে বেড়েছে। কত বেড়েছে সেটা যাচাই করবে কে? ব্যবসায়ীরা যে পরিসংখ্যান ট্যারিফ কমিশনে দিচ্ছে, কমিশন সেটাই মেনে নেয়, যাচাই করে না। যে কারণে মূল্য বৃদ্ধির আগে একটা গণ শুনানি করা দরকার, যেখানে গণমাধ্যমকর্মী ও ভোক্তা প্রতিনিধি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু যারা ভুক্তভোগী তাদের খবর নেই, ব্যবসায়ী ও ট্যারিফ কমিশন মিলে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সংকটের সময় ভোজ্য তেল সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কয়েকদিন থেকে আমরা কীভাবে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় সেটা নিয়ে কাজ করেছি। তারা বলছে, বিশ্ববাজারে প্রতি টন তেলের দাম ১২০০ ডলারে উঠেছে। গত এপ্রিলে সরকার যখন তেলের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল, তখন বিশ্ববাজারে প্রতি টন তেলের দাম ছিল ১০৩৫ ডলার। এখন ১১০০ ডলার ধরে লিটাওে ৮ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেখুন! জনগণের স্বার্থে কী রকম স্বার্থত্যাগ। বিশ্ববাজারে দাম ১২০০ ডলার, আর তারা ১১০০ ডলার ধরে মূল্য নির্ধারণ করেছেন।
কিন্তু বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ডিসেম্বরে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১ হাজার ১০৫ ডলার। গত আগস্টে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩১ ডলারে, সেপ্টেম্বরে আবার কিছুটা বেড়ে ১ হাজার ৪৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে সার্বিকভাবে দাম নিম্নমুখী। গত ডিসেম্বরের তুলনায় সয়াবিনের দাম কমেছে ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশের বাজারে এর দাম ছিল ঊর্ধ্বমুখী। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম ১০০ থেকে ৭৮ ডলারে নেমে এসেছে। এতে জাহাজ ভাড়াসহ অন্য পরিবহন খরচ কমেছে। দেশে ডলারের দামও কমেছে। আগে আমদানিতে প্রতি ডলার কিনতে হতো সর্বোচ্চ ১৩২ টাকা করে। এখন তা কমে ১২০ টাকায় নেমে এসেছে। এসব কারণে আমদানি খরচ কমেছে। বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আর পরিবহন খরচ দুইই কমেছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই আমদানি করা পণ্যের দাম কমার কথা। কিন্তু দেশের বাজারে দাম কমেনি। উলটো আরও বেড়ে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীদের কথা শুনে সরকার আর কী করবে? ভোজ্য তেলের সরবরাহ বাড়াতে ও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিতে দুই দফায় শুল্ককর কমিয়ে দিল। প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯ নভেম্বর শুল্ককর কমিয়ে তা নামানো হয়েছে শুধু ৫ শতাংশে। অর্থাৎ লিটারে শুল্ককর কমেছে ১০-১১ টাকা। কিন্তু বাজারে তার প্রভাব কই? দাম কমা-বাড়া অনেকটা জোয়ার-ভাটার মতো। কিন্তু আমাদের দেশে মূল্যবৃদ্ধির জোয়ার যত দ্রুত আসে ভাটা আসে ততই ধীরে। যেমন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে কিছুদিন হলো।
দাম বৃদ্ধির পর বর্ধিত দামের তেল এখনো বাংলাদেশে আসেনি। কারণ সয়াবিন তেল দেশের বাইরে থেকে আনতে হয়। মালয়েশিয়া থেকে আনতে হলেও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। ব্রাজিলসহ অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করলে দুই থেকে তিন মাস সময় লেগে যায়। তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির যে অজুহাত দেখানো হলো, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। পাশাপাশি শুল্ক কমানোর সুফল ভোক্তারা পায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে মজুদ পর্যাপ্ত, কিন্তু সরবরাহ চেইনে সমস্যা। এই চেইন দেখবে কে আর সমস্যা দূর করবে কে? সরকার কি জানে না? তাহলে সরবরাহ চেইনে সমস্যার সমাধান করতে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে? বরং অসহায় অসংগঠিত বিপুল সংখ্যক ভোক্তার পরিবর্তে সংগঠিত শক্তিশালী ব্যবসায়ীদের কথা শুনেছে। ব্যবসায়ীরাও সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে ভোক্তার পকেট থেকে বাড়তি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেছেন। এক্ষেত্রে আগের সরকার যে পথে হেঁটেছে, এবারের সরকার তো সেই একই পথে হাঁটছে। প্রতি লিটারে ভোজ্য তেলের দাম ৮ টাকা বাড়িয়ে সরকার সয়াবিন তেলের মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৭৫ টাকা, খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৫৭ টাকা। দাম বাড়ানোর আগে বাজার থেকে সয়াবিন উধাও হয়ে গিয়েছিল, এখন বাজারে তেলের সরবরাহ বেড়েছে কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করা হয়নি। খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে লিটারপ্রতি ১৮৫ টাকা। মধ্যবিত্তের চেয়ে দরিদ্র ক্রেতারা বেশি দামেই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। জনগণ আটকে গেছেন মূল্যবৃদ্ধির ফাঁদে। সরকার নির্বাচিত না অনির্বাচিত, অন্তর্বর্তী না পূর্ণকালীন সেই বিতর্ক রাজনৈতিক। কিন্তু জনগণ যখন বাজারে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দেখে তখন যে প্রশ্নটা প্রথমেই করে, তা হলো দেশে কি সরকার নেই? যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা কাদের স্বার্থ দেখছেন? লক্ষ কোটি জনগণের না কয়েকজন ব্যবসায়ীর! এত পদক্ষেপের ঘোষণা আর প্রতিশ্রুতির পরও দ্রব্যমূল্য সহনীয় হয় না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়, ক্ষমতায় যারা থাকেন তাদের ওপরই পড়ে।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com

