পরিবর্তন চাই পুনরাবৃত্তি নয়

আমাদের দেশ আন্দোলনের দেশ। তবে সরকারবিরোধী আন্দোলন হলেও গণ-অভ্যুত্থান ঘন ঘন ঘটে না। ক্ষমতাসীনদের অত্যাচারে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বেদনা বিক্ষোভের রূপে মাঝে মাঝেই ফেটে পড়ে। কিন্তু যখন নিরসনের সব পথ রুদ্ধ দেখে বিক্ষুব্ধ জনগণ মরিয়া হয়ে লড়াই করে, নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে শাসককে তখন তাকে গণ-অভ্যুত্থান বলে। যদি রাষ্ট্রব্যবস্থার বদল ঘটে যায় গণ-অভ্যুত্থানের ফলে তখন তাকে বলে আমূল পরিবর্তন বা বিপ্লব। ২০২৪ সালে যে অভ্যুত্থান হলো তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উচ্ছেদ। বিগত সরকারগুলোর আমলে দুর্নীতি করে জনগণের অর্থ তছরুপ করা হয়েছে, টাকা পাচার করা হয়েছে, নির্বাচনকে টাকার খেলায় পরিণত করে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তিনটা ‘এম’ অর্থাৎ মানি, মাসল আর ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক চরিত্র ধ্বংস করা হয়েছে। ফ্যাসিবাদের ভিত্তি পুঁজিবাদ আর  প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন এসবের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদ টিকে থাকছে। ফলে ফ্যাসিস্ট তাড়ালেও ফ্যাসিবাদের ভিত্তিগুলো অক্ষুন্ন থাকলে আবার ফ্যাসিবাদ আবির্ভূত হবে।

একটি রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র হতে হলে কিছু প্রশ্ন ফয়সালা করতে হবে। রাষ্ট্র কি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ না হয়ে ধর্মভিত্তিক হবে? ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র না হলে কি বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে? এরশাদ যে রাষ্ট্রধর্ম প্রবর্তন করেছিলেন তা কি প্রতারণামূলক ছিল না? কারণ তিনি নিজের জীবনে কী ধর্মাচরণ পালন করতেন তাতো সবাই জানেন। কিন্তু অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম জারি করে রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিভক্ত করলেন কেন? ভাবলেন না ভারতের মুসলমান, বার্মার মুসলমান, ইউরোপের মুসলমান তারা কী চায়, তারা যে দেশে বসবাস করে সেখানে তারা ধর্মের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে থাকবেন? বাংলাদেশে রাষ্ট্রধর্ম সঠিক কাজ হলে, ভারতে কী হবে? চীন, জাপান, ইউরোপ, আমেরিকায় যদি তা হয়, তাহলে ধর্মীয়ভাবে যারা সংখ্যায় কম তারা কি বিপন্ন বোধ করবেন? কিংবা একই ধর্মেও তো চিন্তা এবং আচরণে পার্থক্য হয় না? এই যে এখন তবলিগ জামাতের মধ্যে বিরোধ লেগেছে, রাষ্ট্র এখানে কী করবে? সে কি নিরপেক্ষ থাকবে? না কি একপক্ষকে সমর্থন করে অন্যদের পিটিয়ে সোজা করে দেবে? আর একটা প্রশ্ন, রাষ্ট্র কি বৈষম্যমূলক থাকবে? একবাক্যে সবাই বলবেন না, না। কিন্তু  দেশের মানুষের মধ্যে যে আয়-বৈষম্য, নারী-পুরুষের বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্য, শ্রমিক-কৃষকের প্রতি বৈষম্য, শিক্ষায় বৈষম্য এ ধরনের নানা বৈষম্য বিরাজ করছে, সেসব দূর করার উদ্যোগ কতটা নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে? কেন গ্রাম-শহরে বৈষম্য বাড়ছে, বৈষম্য মাপার যে সমস্ত মাপকাঠি আছে সব মাপকাঠিতেই বৈষম্য বাড়ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং জবাবদিহি কী? অতীত সরকার জনগণের পক্ষে কাজ করেনি ফলে সমালোচিত হয়েছে, বর্তমান সরকার কি সেখান থেকে শিক্ষা নেবে না?

এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন তো উঠতেই পারে গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে যে প্রত্যাশা গড়ে উঠেছিল তা কি ম্লান হয়ে যাচ্ছে? প্রদত্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কি ভঙ্গ করা হচ্ছে না? নাকি ক্ষমতাসীনরা ভুলে যাচ্ছে? শ্রমিকের ১৮ দফা, বকেয়া মজুরি, কৃষিপণ্যের দাম, বাজার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি, পদ দখল তো ঘটছেই। এগুলো কি পুরনো শাসকের দেখিয়ে যাওয়া পথেই ঘটছে না? তাহলে তিন মাসেই মানুষ অভ্যুত্থানের চেতনা কি ভুলে গেল? তাহলে কেন এত নিস্পৃহতা? এই সরকার যে নতুন কিছু করবে বা করছে তা নিয়ে মানুষ ভাবছে না কেন? নাকি জনগণ মনে করছে এভাবেই চলবে রাষ্ট্র এবং সমাজ? পত্রিকার পাতায় জনগণ দেখছে, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উদ্যোগ নিয়েছে সংস্কার করে দেশকে ঢেলে সাজানোর। তারা যেসব পরিকল্পনা ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম হলো সংবিধান সংস্কার করা। ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, সংবিধান সংশোধন, পুনঃলিখন, নাকি নতুন করে লেখা হবে। পুনঃলিখন বলতে যা বুঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, তা হলো নতুনভাবে একটি সংবিধান রচনা করে সেটা কার্যকর করা। ইতিমধ্যে এর প্রয়োজনীয়তা নেই বলে মতামত দিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ করা হচ্ছে। ফলে সংবিধান সংস্কার কমিশন তার কাজের শুরুতে সমাজের বিভিন্ন অংশের কিছু প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। এখান থেকেই বুঝে নেবেন, তাদের কাজের পরিধি ও প্রক্রিয়া কী হবে। এছাড়া বাকি কমিশনগুলোও কাজ শুরু করে দিয়েছে এবং সরকারের প্রচারিত ঘোষণা অনুযায়ী, সব কয়টি সংস্কার কমিটিকেই ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ করে তাদের প্রস্তাবনা প্রদান করতে হবে। সংবিধান হচ্ছে যে কোনো একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল, বলা হয় জনগণের ইচ্ছার সর্বোচ্চ প্রতিফলন। যেখানে উল্লেখ থাকে, রাষ্ট্রের গঠন পরিচয় ও রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা। এর বাইরে অন্য অনেক বিষয়ের মধ্যে নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বের বিস্তারিত বর্ণনার উল্লেখ করা হয়ে থাকে। ফলে দেশের জনগণই হচ্ছে সংবিধানের মূল লক্ষ্য। আর এ কারণেই বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সংবিধান প্রণয়ন কিংবা এর সংশোধন প্রক্রিয়ায় জনগণকে অবশ্যই যুক্ত রাখা হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সাংবিধানিক সংসদ হচ্ছে সেই নাগরিক সংযুক্তির গ্রহণযোগ্য পথ। বিশ্বের কোনো দেশেই সংবিধান সংশোধন বা সংস্কারের দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণভাবে বাইরে রেখে পছন্দমতো বেছে নেওয়া কিছু লোকজনের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয় না। আমাদের দেশে গায়ের জোরে সংবিধানকে স্থগিত রাখার অনেক দৃষ্টান্ত থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংসদই হচ্ছে সংশোধন করার নিয়মতান্ত্রিক ও বৈধ জায়গা।

সংবিধান পরিবর্তন বা নতুন করে রচনার ক্ষেত্রে নির্বাচিত একটি সংসদের গুরুত্ব কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল রচনা বা সেটা সংশোধন করে নেওয়ার দায়িত্ব কোনো অবস্থাতেই হাতেগোনা এমন কয়েকজন ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না, যারা জনগণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নন। দেশের বাইরে থেকে দেশ নিয়ে ভাবতে পারেন অনেকেই কিন্তু দেশে থেকে কাজ করেন যারা তারা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে পারবেন আরও বেশি। সংবিধান সংশোধন করতে হলে প্রথমেই যা দরকার হবে, সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যার মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবেন। নির্বাচিত সংসদের প্রধান দায়িত্ব হবে চলমান সংবিধান সংশোধন করে নেওয়া, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সংশোধনী যুক্ত করা। সংবিধান নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে এক ধরনের ধোঁয়াশা ও অসহিষ্ণুতা তৈরি   হচ্ছে। প্রশ্ন উঠবে, ১৯৭২ সালের সংবিধান খারিজ করে দিয়ে নতুন একটি সংবিধান কেন রচনা করা দরকার? সংবিধান কী প্রক্রিয়ায় রচিত হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে কোনো আকাক্সক্ষা ও সংগ্রাম ছিল তা বেমালুম ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংবিধানের অসম্পূর্ণতা দূর করে তাকে আরও গণতান্ত্রিক করার চেয়ে ছুড়ে ফেলার আওয়াজ তোলা হচ্ছে। স্বাধীনতা পরবর্তী একটি বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সংবিধান কেমন হতে পারে তা নিয়ে বিতর্ক হোক না! সংবিধানের যে ধারাগুলো বা সংশোধনীগুলো জনগণের মৌলিক মানবাধিকার পরিপন্থী তা বাতিল করে দেওয়া হোক এই প্রশ্নে কারও তো আপত্তি থাকার কথা নয়। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের কোন বিধান বা দিকগুলো ত্রুটিপূর্ণ বা ভুল, সেগুলো তুলে ধরুন, এর চেয়ে উন্নত ভাব ও ভাষা যুক্ত করুন এ কথা বলবেন সবাই। কিন্তু অতীত সংগ্রাম, মানুষের আত্মদানকে তুচ্ছ করে দেখা উচিত নয়। বর্তমানের যে দায়িত্ব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওপর অর্পিত হয়েছে তা সঠিকভাবে পালন করার ওপর নির্ভর করছে দেশের ভবিষ্যৎ। এই ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা না থাকলে উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার লড়াইটা ছিল গণতন্ত্রের জন্য। গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলিত করা হয়েছিল নানা আইনের বেড়াজালে। যেমন, সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছিল মৌলিক অধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ আইন প্রণয়ন করা যাবে না। দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এই অনুচ্ছেদের সংশোধন করে অগণতান্ত্রিক আইন বা নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এর মাধ্যমেই জরুরি আইনের বিধান, বিশেষ ক্ষমতা আইন, সন্ত্রাস দমন আইন, জননিরাপত্তা আইন, সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রণয়ন করতে পেরেছে শাসক গোষ্ঠী। ফলে প্রয়োজন এসব নিবর্তনমূলক আইন ও সাংবিধানিক সংশোধনীগুলো বাতিল করা। এ যাবৎ ১৭টি সংশোধনী হয়েছে। তাতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারিত হয়নি। শাসকদের প্রয়োজনে সংবিধানে কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। এবার একটু গণতান্ত্রিক চরিত্র অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হোক। কিন্তু বিতর্কটাকে অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে গণতান্ত্রিক শাসনে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটা ঠিক। কিন্তু নির্বাচনের মধ্য দিয়েও স্বৈরাচারী শাসক ক্ষমতায় আসতে পারে বা ক্ষমতায় এসে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে এমন নজির পৃথিবীতে অনেক রয়েছে। সে কারণেই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি এবং চর্চা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য একদিকে রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গের স্বাধীনতা ও সমন্বয় অন্যদিকে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সচেতনতা দরকার। অভ্যুত্থান দেখিয়েছে কীভাবে স্বৈরাচারী সরকার উৎখাত হয় এখন মানুষ দেখতে চায় কীভাবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি একটা রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক রূপে দাঁড় করাতে আরও কত কাজ আছে বাকি। সেদিকে নজর দেওয়া খুব জরুরি। এক বিপুল প্রত্যাশায় জনগণ এই সরকারের দিকে তাকিয়ে আছে। ক্ষমতায় থেকে তারা যেন সেটা ভুলে না যান। মানুষ পরিবর্তন দেখতে চায়, ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি নয়।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.