মানবজাতির ইতিহাসে রাষ্ট্র একটি নতুন ধারণা। এর যেমন উৎপত্তি আছে, তেমনি আছে পরিবর্তন ও বিকাশ। এসব নিয়ে জানতে হলে রাষ্ট্র দর্শনের ইতিহাসে গ্রিক নগররাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে কোনো আলোচনা অগ্রসর হতে পারে না। গ্রিক নগররাষ্ট্রের কথাও যদি বিবেচনা করা হয় তাহলে তার বিকাশ ঘটেছিল খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে। সে সময় থেকেই সংবিধান, আইনসভা, আইনের শাসন, ব্যক্তি-নগররাষ্ট্রের সম্পর্ক, রাষ্ট্র পরিচালনায় কারা ভূমিকা পালন করবেন ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও সংঘাতের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র সম্পর্কিত ধারণার বিকাশ হয়েছে ক্রমাগত। মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ ঘটে সমাজের মাধ্যমে। ফলে ক্রমাগত পাল্টে গেছে সমাজ, বদলে গেছে শাসকদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কের ধরন। দাস প্রথায় যেমন সম্পর্কে আবদ্ধ ছিল, সামন্ততন্ত্রে তেমন ছিল না। আবার পুঁজিবাদে অতীতের সম্পর্কের ধরন পাল্টে গিয়েছে। সমাজ পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে গেছে আইন আর মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের ধরন। সমাজ বিকশিত হয়েছে, এগিয়ে চলেছে। সেক্ষেত্রে নিকট ইতিহাসের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় বিস্তৃতি নিয়ে টিকে ছিল রাজতন্ত্র। রাজতন্ত্রে রাজা আইন প্রণয়ন করতেন, রাজাই দোষী সাব্যস্ত করতেন, বিচার করতেন, শাস্তি দিতেন অথবা ক্ষমা করতেন। এক ব্যক্তির কাছেই কেন্দ্রীভূত ছিল সব ক্ষমতা। তার মানসিক গড়ন ছিল এই যে, রাজা কখনো ভুল করে না। আর প্রজারাও বংশ পরম্পরায় সেটা মেনে চলতে চলতে ভাবত রাজার ইচ্ছাই আইন, রাজার কোনো ভুল নাই। প্রশ্ন করা অপরাধ, বিরোধিতা করা ক্ষমাহীন অপরাধ। সুতরাং রাজার প্রশংসা কর আর রাজার কাছে সমর্পিত হও। এভাবে রাজতন্ত্রে ব্যক্তির স্বেচ্ছাচার চলেছে বহুদিন। কিন্তু মানুষের চিন্তাকে রুদ্ধ করে রাখা যায় না। ফলে প্রতিবাদ, বিদ্রোহ হয়েছে আর বহুযুগ অত্যাচার সহ্য করে এক সময় রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার সেøাগান তুলে ব্যক্তির শাসনের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। আইনের চোখে সবাই সমান এই কথা বলে বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে জনগণের ইচ্ছায় রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর আধুনিক রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের চুক্তিকে বলা হয় সংবিধান। যে কারণে বলা হয়ে থাকে সংবিধান হলো, সামাজিক চুক্তি। জনগণ রাষ্ট্র নির্মাণ করে। আবার সেই রাষ্ট্রের সঙ্গেই তারা চুক্তিতে আবদ্ধ হয় সংবিধানের মাধ্যমে। সংবিধানে থাকে অধিকারের স্বীকৃতি আর আইন দেয় তার সুরক্ষা। কিন্তু সমাজ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, ক্রমাগত সামনে এগিয়ে চলে। সংবিধান বা আইন যদি স্থবির হয়ে যায় তাহলে ব্যবধান এবং বিরোধ তৈরি হবেই। ফলে একসময়ের তৈরি সংবিধান চিরকাল অধিকারের সুরক্ষা দেবে, এটি আশা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। যে কারণে সংবিধান বিশ্বাস নির্ভর নয়, প্রয়োজন নির্ভর। এখানেই প্রশ্ন আসে কার প্রয়োজন? শাসকের প্রয়োজনে হলে শাসিতের অধিকার সংকুচিত হবে। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে হলে সেখানে শোষণ করার অধিকার সংকুচিত হবে। যে কারণে আইনের চোখে সবাই সমান বলা হলেও, কোনো বুর্জোয়া রাষ্ট্রেই তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। কিন্তু মানুষের মনে সাম্যের যা আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে তার ফলে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সে প্রতিবাদী হবে এটাই স্বাভাবিক। সাম্যের আকাক্সক্ষাই বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানি ২২ পরিবারের শোষণের বিরুদ্ধে শোষণ মুক্তির লক্ষ্যে সমাজতন্ত্রের আকাক্সক্ষা, সামরিক শাসনের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আকাক্সক্ষা, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা আর সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলের বিপরীতে জাতীয়তাবাদী বলিষ্ঠতা মিলে তৈরি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। যে কারণে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল, আমরা ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম। ফলে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে এই আকাক্সক্ষা এবং ঘোষণার প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় বুর্জোয়া শ্রেণি অধিষ্ঠিত হয়েছিল বিধায় বুর্জোয়া গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল এই সংবিধানে। ফলে বাহাত্তরের সংবিধান একটি বুর্জোয়া সংবিধান। জনগণের গণতন্ত্রের দিক থেকে দেখলে দেখা যাবে, বাহাত্তরের সংবিধানে বেশ কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। যেমন বাংলাদেশের সব জাতিগোষ্ঠী সংবিধানে স্বীকৃতি পায়নি, নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়নি এবং আইন দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়নি মৌলিক অধিকারকে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়েও বিতর্ক ছিল এবং আছে। একটা কথা উল্লেখযোগ্য যে, ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারতে সংবিধান প্রবর্তিত হয়েছিল ১৯৫২ সালে আর পাকিস্তানে সংবিধান প্রবর্তিত হয়েছিল ১৯৫৬ সালে। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর সংবিধান পাস হয় এবং ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় সংবিধান কার্যকর হয়। বুর্জোয়া সংবিধান হলেও যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছিল তাই জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের কিছু বিষয়ে স্বীকৃতি সংবিধানে ছিল। যে কারণে যতই বুর্জোয়া শাসন সংহত হয়েছে, সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে ততই সংবিধান স্বীকৃত অধিকার সংকুচিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সংবিধানের ১৭টি সংশোধনী করা হয়েছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে, সংশোধনীগুলো গণতান্ত্রিক অধিকার সম্প্রসারিত করার জন্য নয় বরং গোষ্ঠীস্বার্থ সংহত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল। যেমন ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান, নিবর্তনমূলক আটক সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন এবং সংবিধানের ২৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে মৌলিক অধিকার পরিপন্থী আইন প্রণয়নের সুযোগ তৈরি করা হয়েছিল। যার পথ ধরে সব কালাকানুন প্রবর্তন করা হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার, ক্ষমতাহীন জাতীয় সংসদ, আজ্ঞাবাহী মন্ত্রিপরিষদ আর একদলীয় শাসন ব্যবস্থা যেমন প্রবর্তন হয় পাশাপাশি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে। এর পর ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীতে সামরিক শাসনামলের সব কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিবর্তন করা হয়। সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম স্থাপন করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯৮৬ সালের ১০ নভেম্বর সংবিধানের সপ্তম সংশোধনীতে সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮৮ সালের ৯ জুলাই অষ্টম সংশোধনীতে সংবিধান সংশোধন করে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা ও হাইকোর্ট বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়। সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন করা হয় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। ২০১১ সালের ৩০ জুন এই সংশোধনীতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বিলুপ্ত করা এবং ৭ক অনুচ্ছেদ স্থাপনের মাধ্যমে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদ অপরিবর্তনীয় বলে ঘোষণা করা হয়। যার ফলে ক্ষমতাসীনদের হাতে সংবিধান শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। কাজেই সংবিধান সংশোধন হলে যে গণতান্ত্রিক অধিকারের সম্প্রসারণ ও সুরক্ষা হবে তা সবসময় বলা যায় না। বরং সংবিধান সংশোধিত হতে হতে তার গণতান্ত্রিক চরিত্রটাই হারিয়ে ফেলেছে। সংবিধান যেন ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছাপূরণের হাতিয়ার।
যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে, ফলে জনগণ দেখেছে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। যেকোনোভাবে নির্বাচন করিয়ে নেওয়া যায়, বৈধতার প্রলেপ দেওয়া যায় এই সুযোগ আওয়ামী লীগকে দুর্বিনীত ও দুর্নীতিবাজে পরিণত করেছিল। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, হয় আওয়ামী লীগকে চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় রাখতে হবে অথবা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। কবে হবে তা নির্দিষ্ট না থাকলেও গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের কোনো বিকল্প ছিল না। বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা চাইলে, এ সময়ে সংবিধান সংশোধন ছাড়া অন্য বিকল্প কী? প্রশ্ন হচ্ছে, সংশোধনের মাধ্যমে গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা স্বীকৃতি পাবে কিনা? শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক এবং মর্যাদা নিয়ে বাঁচার আকাক্সক্ষায় মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করেছিল। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করেই শাসকগোষ্ঠী গত ৫২ বছর দেশ পরিচালনা করেছে। ফলে মানুষ দেখেছে দুর্নীতি, দুঃশাসন, দমন-পীড়ন, নির্বাচনকে বাণিজ্যে পরিণত করে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও চরিত্রকে ধ্বংস করাই যেন শাসকদের কাজ। সম্পদহীন মানুষের শ্রম নিংড়ে একদল মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়েছে, সম্পদ পাচার করেছে। সংবিধানে ২০তম অনুচ্ছেদে বর্ণিত, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ এই নীতিকে পরিহাসে পরিণত করেছে শাসকরা। ক্ষমতাসীন দল, ব্যবসায়ী, প্রশাসন, পুলিশ মিলে দেশটাকে টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছে।
একটা বিষয় স্পষ্ট যে, ৭১-এর মূল চেতনাকে সমুন্নত রেখে, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে এবং ২০২৪-এর ছাত্র শ্রমিক জনতার বিপুল আত্মত্যাগে গড়ে ওঠা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। সেই লক্ষ্যে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী প্রয়োজন। একটি সুষ্ঠু অবাধ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন মানুষের আকাক্সক্ষা। সেই নির্বাচন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সংবিধানের যতটুকু সংশোধন করা প্রয়োজন তা করতে হবে। নতুন সংবিধান বা সংবিধান পুনর্লিখনের নামে নতুন বিতর্ক তুলে শুধু সময়ক্ষেপণ করা হবে মাত্র। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন করা এ সময়ের প্রধান কাজ। কোনো সংবিধানই চূড়ান্ত এবং চিরস্থায়ী নয়। ফলে প্রতিটি পরিবর্তন যেন সংবিধানকে উন্নত ও গণতান্ত্রিক করে এটাই গণমানুষের প্রত্যাশা।

