ফ্রাঙ্কফুর্ট আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশ এবং প্রসাঙ্গিক কিছু কথা

 

এবার ৭৬তম বইমেলা অনুষ্ঠিত হল    ফ্রাঙ্কফুর্টে , এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বইমেলা । এইমেলায় আমি প্রায় ৪ দশক ধরে দর্শক হিসেবে অংশ নেই । ৮০র দশকের প্রথম থেকেই অঙ্কুর প্রকাশনীর মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ এই মেলায় নিয়মিত আসেন বাংলাদেশ থেকে , তিনি এই মেলা থেকে কপি রাইট কিনে নিয়ে বাংলাদেশে তার প্রকাশনী থেকে অনুবাদ করে বই প্রকাশ করতেন, হিলারি কিল্টন থেকে শুরু করে নেলসন মান্ডেলাসহ বহু বিখ্যাত বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করেছেন তার প্রকাশনা সংস্থা থেকে । তাকে দেখাতাম একটার পর একটা আন্তর্জাতিক প্রকাশনার সাথে মিটিং করছেন , আমিও থাকতাম কিছু মিটিং এ । এই মেলা নিয়ে লিখতে গেলে অনেক কিছু লিখতে হয় , আমার একটি স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মেলায় অংশগ্রহণ নিয়ে । অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম তার প্রকাশনা নিয়ে মেলা অথরিটির আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে এই মেলায় অংশ নিয়েছিলেন , তার প্রকাশনা থেকে হুমায়ূন আহমেদের অনেক বই প্রকাশ করেছেন । হুমায়ূন আহমেদকে নিয়েও একবার ফ্রাঙ্কফুর্টে এসেছিলেন বইমেলায় ।আমার সাথে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তিনিও রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মেলায় কিভাবে অংশগ্রহণ করা যায় এ নিয়ে আলোচনা করেছিলেন ।  তিনি একদিন আমাকে ফোনে জানালেন আগামী প্রকাশনার ওসমান গনি এবং পাঞ্জেরীর কামরুল ইসলাম শায়ক  ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আসবেন আমি যাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করি , এর মধ্যে ঢাকা থেকে শায়ক ভাই আমকে কল দিয়ে ইটালির আইরিন পারভিনের নাম্বার দিলেন , আমি যোগাযোগ করলাম , উনিও আমাকে জানালেন তাদের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় আসার কথা । তারপর তারা  ফ্রাঙ্কফুর্ট আসলেন  আমি তাদের মেলায় নিয়ে গেলাম । মেলা অথরিটির সাথে তারা বৈঠক করে ২০১৪ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয়ভাবে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করলেন , এই বৈঠকে আমি এবং প্রবাসী লেখিকা  নাজমুন্নেসা পিয়ারি তাদের সাথে উপস্থিত ছিলাম ।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ প্রথমবার জাঁকজমকভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে এই মেলায় অংশ নেয় , সেমিনার সিম্পজিয়াম , বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা বাংলাদেশ স্টল পরিদর্শন করে , সুসজ্জিত বাংলাদেশ স্টল সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই মেলায় বাংলাদেশ থেকে , কয়েকজন প্রকাশক , লেখক সাংবাদিক  এবং বাংলা একাডেমির মহা পরিচালক  সামসুজ্জামান খান , কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজিসহ  অনেকেই অংশ নেন, বাংলা সাহিত্যের ইংরেজিতে লেখা বইগুলো প্রদর্শিত হয়, বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের সাথে অনুবাদের জন্য মতবিনিময় হয়  । সংস্কৃতিমন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর , সচিব আখতারি মমতাজ সহ এই মেলায় অতিথি হিসেবে আসেন । সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি এই মেলায় আয়োজনে প্রধান ভুমিকা পালন করেন । ২০১৮ সালে পর্যন্ত এভাবেই চলছিল ,সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির আয়োজনে সেমিনারে অংশ নেনে অধ্যাপক মঞ্জুরুল ইসলাম  এতে জার্মান প্রকাশকরাও উপস্থিত ছিলেন , মঞ্জুরুল ইসলাম  বাংলা সাহিত্যকে তুলে ধরে প্রবন্ধ পাঠ করেন সেমিনার  পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন অন্যপ্রকাশের মাজহারুল ইসলাম  , এই মেলায় ময়ূরপঙ্খি প্রকাশনার মিতিয়া ওসমান কয়েকবার জার্মান সরকারের আমন্ত্রণে অংশ নেন, তার প্রকাশনার বই বিশ্বের বহু দেশের প্রকাশকরা অনুবাদ  করে প্রকাশ করেছে , আফ্রিকার রুয়ান্ডা থেকে শুরু করে ইউরোপ আমেরিকাসহ অনেক  দেশের, এবার ফিনল্যান্ডের প্রকাশনা থেকে তার বই ফিনিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে যা এবারের মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে  । সবকিছু ভালোই চলছিল, করোনার সময় আবার ছন্দপতন ঘটে , ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র এইমেলায় অংশ নিতে শুরু করে তারপর থেকেই একটি স্থবিরতা শুরু হয় , মেলা সীমাবদ্ধ হয়ে পরে একটি বিশেষ গণ্ডীর মধ্যে, রাজনৈতিক বই ছাড়া অন্য বই মেলায় স্থান পেত না , কিন্তু  বিদেশীরা বাংলাদেশের রাজনিতি নিয়ে আগ্রহী নয় , তারা জানতে চায় আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, এই বিষয়ে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের তেমন  আগ্রহ ছিল না , মেলায় এসে তারা ধ্যানী যোগীর  মতো ঝিম মেরে  বসে থাকা ছাড়া এদের আর কোন কাজ আমার নজরে আসেনি ।

এবারের মেলায় বাংলাদেশ থেকে কেউ আসবে  কি না নিশ্চিত ছিলাম না , এর কারন হচ্ছে রাজনৈতিক  পটপরিবর্তন । দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে পরিবর্তন হয়েছে , আফসানা বেগম জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের নতুন পরিচালক হয়েছেন তা সংবাদ মাধ্যমে দেখেছিলাম । মেলার ৩ দিন আগে আমার বন্ধু মকসুদুল আলম অপু আমাকে জানালেন বাংলাদেশ থেকে এবার মেলায় আসছেন  আফসানা বেগম এবং প্রথম আলোর নির্বাহী  সম্পাদক সাজ্জাদ শরীফ । মেলার আগেরদিন তারা আসলেন আমরা হোটেলে যেয়ে তাদের সাথে দেখা করলাম , মেলা সম্পর্কে কিছু আলাপ আলোচনা হল । আমি এবং অপু সন্ধ্যায় মেলার স্টলে গেলাম দেখতে , কাল মেলা শুরু হবে স্টল কি অবস্থায় তা দেখার একটা আগ্রহ আমার সবসময়ই থাকে। সুন্দর করে সাজানো হয় স্টল বিচিত্র রকমের বই দিয়ে , গত কয়েক বছর একটি বিশেষ রাজনৈতিক ঘরনার বই ছিল , সেই ঘরনার বাইরের কোন লেখকের বই আমার দৃষ্টিতে দেখিনি , থাকলেও থাকতে পারে আমার চোখে পড়েনি । এবার সবরকমের বই আছে  ।বিষয়টা আমার কাছে খুব ভালো লাগলো । আফসানা বেগম এবং সাজ্জাদ শরীফ জানালেন তারা বই  বিষয়ে কোন রাজনৈতিক বিষয়কে প্রধান্য  দেন নি , সরকারের তরফ থেকেও তারা কোন দিকনির্দেশনা পান নি , বই নির্বাচনের তারা স্বাধীন ছিলেন , লেখার গুরুত্ব বিবেচনা করে বই এনেছেন । বিষয়টি আসলে এরকমই হওয়া উচিৎ ।

সাজ্জাদ শরিফ এবং আফসানা বেগম দুজনই সাহিত্যজগতের মানুষ,মেলায় তারা খুব তৎপর ছিলেন বিভিন্ন স্টলে যেয়ে তারা বাংলাদেশর স্টলের কথা বইয়ে কথা বলেছেন , কিছু আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থার কর্মকর্তারা বাংলাদেশ স্টল পরিদর্শন ও করেছেন । আফসানা বেগম এবং সাজ্জাদ শরীফ প্রথম বার বই মেলায় এলেন ,তারা মেলা ঘুরে ঘুরে দেখে আগামীবার বাংলাদেশের গ্রহণ নিয়ে অনেক রকম পরিকল্পনা করলেন , আগামীতে আরও কিভাবে ভালো এবং আকর্ষণীয় করা যায় সেই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে আমাকে জানালেন দেশে ফিরে যেয়ে প্রকাশকদের সাথে বৈঠক করবেন এবং আগ্রহী প্রকাশকদের কিভাবে এই মেলায় অংশগ্রহণ করানো যায় এই বিষয়টা নিয়ে কাজ করবেন ।

এবারের মেলায় বাংলাদেশ দুতাবসের ভূমিকাও ছিল উল্লেখ করার মতো ।কমার্শিয়াল কাউন্সিলর গোলাম রাব্বি সবসময় স্টলে থেকে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন , দূতাবাসের চার্জ দ্য এফেয়ারস কাজী জাবেদ ইকবাল প্রথম দিন স্টলে উপস্থিত ছিলেন , খুব প্রাণবন্ত মানুষ তিনি মেলা নিয়ে তার ভিসনের কথা তিনি আমাদের বলেছেন । আমাদের আশা আগামীতে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র বাংলা  সাহিত্যকে বিশ্ব  সভায় তুলে ধরার জন্য যা যা দরকার তার সবকিছুই করবেন । যতবেশী সম্ভব প্রকাশকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবেন । বাংলা সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদের বই বেশী করে আনবেন , সাথে সম্ভব হলে লেখক এবং সাংবাদিকদেরও সাথে নিয়ে আসবেন ।

হাবিব বাবুল , প্রধান সম্পাদক , শুদ্ধস্বর ডটকম ।

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.