স্বাধীনতা সংগ্রামের অনুপ্রেরণায় স্বাধীন দেশ উপযোগী শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমৃত্যু সংগ্রাম করে গেছেন সিরাজুল আলম খান। বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসন অবসানে তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন পথ দেখায়। রোববার (৯ জুন ২০২৪) রাজধানীর রমনা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের সেমিনারে হলে বাঙালির তৃতীয় জাগরণের পথপ্রদর্শক সিরাজুল আলম খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এ সব কথা বলেন। যুব বাঙালির সভাপতি রায়হান তানভীরের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ সরকার। আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুব বাঙালির সংগঠক মশিউর রহমান দীপু।
আলোচনায় অংশ নেন ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, গণফোরাম সাধারণ অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জেএসডি সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, প্যালেস্টাইন প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. জিয়াউল কবির দুলু। যুব বাঙালির উপদেষ্টা কাজী তানসেন, সংগঠক সাগর খালাসী, মোহাম্মদ আলী পারভেজ, ওয়ালিদ হাসান ভুবন আলোচনায় অংশ নেন প্রমুখ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আব্দুস সালাম বলেন, “আওয়ামী লীগের কারণে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারছি না। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে গণতন্ত্র রক্ষা করা যাবে না। আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় আসছে ততবার গণতন্ত্র হরণ করেছে।” ভোটের অধিকার ও নিজের দেশের মালিকানা ফেরত চাইতে তরুণদের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকার ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে ফের দেয় না। শেখ হাসিনা নিজেই ঋণ খেলাপি। বেনজীর-আজীজকে ধরতে পারে না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বাংলাদেশের এই অবস্থা হবে। আওয়ামী লীগের হাতে আমাদের স্বাধীনতা কখনো নিরাপদ নয়।” সালাম বলেন, “আওয়ামী লীগের পেয়ারে পাকিস্তান। যুদ্ধ চলাকালে খন্দকার মোশতাককের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন করার চেষ্টা করছে। যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হতো তাহলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারতো না। যুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছিল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দেয়ার জন্য।” তিনি বলেন, “শুধু পাকিস্তানের নাম বদল করে বাংলাদেশ আর মুসলিম লীগের নাম বদলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসাতে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করিনি। আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলেন সকল মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করার জন্য।যখন মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হলো না। আওয়ামী লীগ যখন লুটপাটে চলে গেলো। তখন আমরাই প্রতিবাদ, প্রতিরোধ করেছিলাম।” বিএনপি চেয়ারপারসনের এই উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টি হয়েছিল তা দিয়ে স্বাধীন দেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান। এই শ্রমিক লীগের জন্ম, কৃষক লীগের জন্ম সিরাজুল আলম খান দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে কুপি জ্বালানোর কেউ ছিলো না। সেই সময় তিনি কার্যালয়ে যেতেন।” তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের রাজনীতি আন্দোলনমুখী করে তোলার জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিলো সিরাজুল আলম খানের। যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধে গেলাম সে স্বপ্ন পূরণ হলো না।”
গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, “এখন রিটায়ার্ড আজিজ, রিটায়ার্ড বেনজির দেখতে পাচ্ছেন। এস কে সিনহা রানিং বিচারপতি ছিলেন। তিনি ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে ফাউন্ডিং ফাদার নিয়ে বলেছিলেন। সিরাজুল আলম খান বাংলাদেশের অন্যতম ফাউন্ডিং ফাদার। ” তিনি বলেন, “ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধু ছাড়া সবার নাম মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। এমনকি তার দলীয় লোকদেরও অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দিচ্ছে না। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসায় নেমেছে। সিরাজুল আলম খানরা ছিল বলেই এতো সহজে মাত্র নয় মাসে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছিলাম।” বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, “সিরাজুল আলম খান মারা যাওয়ার পর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে কোথাও দেখিনি। শোক বিবৃতি দেয়ার যে সাধারণ রাজনৈতিক সৌজন্য দেখাতে পারেনি। এ ঘটনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দেউলিয়াত্ব প্রমাণ করেছে। আওয়ামী লীগের ৫৫ হাজার ভাতা ভোগী মুক্তিযোদ্ধার জন্ম একাত্তর সালের পর। যারা জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছেন আওয়ামী লীগের ইতিহাসে তারা নেই।” তিনি বলেন, “শুধু রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব না থেকে শ্রেণী পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে তার কর্মসূচি দিয়েছেন সিরাজুল আলম খান। শেখ হাসিনা কার্যত বাংলাদেশের ভোট ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিয়েছে। ভারতে শেখ হাসিনাকে রিসিভ করতে একজন সচিবকে পাঠিয়েছে এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে অসম্মান করা হয়েছে।
” গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, “স্বাধীনতার কথা বললাম কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা কতিপয় ব্যক্তির স্বাধীনতায় পরিণত হলো। শাসক বদলায় কিন্তু শাসনব্যবস্থা বদলায় না। যদি একই ধরণের ব্যবস্থা থাকে তাহলে জনগণের প্রকৃত স্বাধীনতা আসে না।” তিনি বলেন, “সিরাজুল আলম খান ধারণ করতেন স্বাধীনতার অর্থ সকল মানুষের স্বাধীনতার উপযোগী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করা। আজকে তরুণদের ভাবতে হবে এই স্বাধীন রাষ্ট্রে আমার জায়গাটা কোথায়? যারা ক্ষমতায় আছেন সবগুলো প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে মধ্যরাতে ভোট ডাকাতি করার জন্য।” সাকি বলেন, “সরকার আরো বেশি কর্তৃত্ব চাইবে, আরো বেশী জমিদারি চাইবে। আজকের লড়াই হচ্ছে রাষ্ট্রটাকে জনগণের করা। সরকারের পায়ের তলায় নেই। এরা দাপট দেখায়। এই দাপট আবার ভেঙে পড়ে যখন মানুষ নৈতিক প্রতিরোধ দেখায়।” ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা বদলের সংগ্রামে তরুণদেরকে রাজপথের আন্দোলনে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “এই শাসন থাকলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর। গদি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে পররাষ্ট্র নীতি পরিবর্তন করছে। এদের কাছে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়।”
অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ আজকে মাফিয়াদের দেশে পরিণত হয়েছে। এই জায়গা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিক শাসন, লুণ্ঠনের ব্যবস্থাকে বহাল রেখেই বাহাত্তরে একটা সংবিধান করা হলো।” স্বপন বলেন, “সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচারের সংবিধান আমরা পাইনি। এই সংবিধানে একদিকে বলা হয়েছে জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক অন্যদিকে জনগণের সেবককে সকল ক্ষমতার অধিকারী করা হয়েছে।”
সুত্র, প্রেস বিজ্ঞপ্তি ।

