“হুমায়ূন আহমেদের “চন্দ্রকথা” ও “বৃক্ষমানব” আহমেদ রুবেল”

“চন্দ্রকথা” সিনেমার শিল্পী বাছাই চূড়ান্ত হয়ে গেছে। সিনেমাটি যৌথ প্রযোজনায় নুহাশ চলচ্চিত্র এবং Chaos7 আমার প্রোডাকশন। চুড়ান্ত অভিনয়শিল্পী সিদ্ধান্তের পর চার জনকে পরিবর্তন করে নতুন করে শিল্পী নির্ধারণ করা হয়। চ্যালেঞ্জার ভাইয়ের পরিবর্তে আসাদুজ্জামান নূর ভাইকে জমিদার চরিত্রে। চেয়ারম্যান চরিত্রে রাজিব ভাইয়ের জায়গায় নাজমুল হুদা বাচ্চু। আমার স্ত্রীর চরিত্রে আরেকজন প্রতিষ্ঠিত নায়িকাকে বাদ দিয়ে চম্পা আপাকে নেয়া হয়। যদিও চম্পা আপা আমার বয়জেষ্ঠ!
“পদ্মানদীর মাঝি” মুক্তি পেয়েছে, চম্পা আপা তখন বাংলাদেশ‌ এবং ইন্ডিয়ায় সুপার স্টার।
আর একটা জরুরী কথা না বললে নয়, আমি কিন্তু চন্দ্রকথা ছবিতে অভিনয় করতে চাইনি!
আমার প্রযোজিত কোন নাটক বা সিনেমায় আমি অভিনয় করিনা। তার সাক্ষ প্রমাণ রয়েছে। হুমায়ূন ভাই আমাকে বাধ্য করলেন এই কথা বলে, বললেন বাংলাদেশের অনেক নামিদামি অভিনেতাও এই চরিত্রে অভিনয় করবে না। কারণ চরিত্রটা খুবই চ্যালেঞ্জিং, একজন পক্ষাঘাত রোগী। পুরো ছবিতেই ফ্ল্যাশব্যাক দৃশ্য ছাড়া বিছানায় শুয়ে থাকে।
চুক্তিপত্র স্বাক্ষর এবং স্বাক্ষর টাকা প্রদানের পর যে কোন একটা কারনে হুমায়ূন আহমেদ সিদ্ধান্ত নেন জাহিদ ভাইকে এই সিনেমায় রাখবেন না। ডাকলেন আমাকে বসলাম আমরা একসাথে দক্ষিন হাওয়ায়। বললেন সহ প্রযোজক হিসাবে তোমারও দায়িত্ব আছে, বলতো কাকে নেয়া যায়?
তখন বাংলাদেশের অভিনয়শিল্পী সবার সাথে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও কিছু কিছু কাজ দেখেছি, মোটামুটি ধারণা আছে।
বললাম আহমেদ রুবেলের কথা। উনি প্রথমে চিনতে পারেননি, জিজ্ঞেস করলেন কে সে? কি কাজ করেছে?
– “পুষ্প কথা” আপনার নাটক করেছে!
ডক্টর মোঃ জাফর ইকবালের সায়েন্স ফিকশন নিয়ে আহির আলমের পরিচালনায় একুশে টিভিতে প্রচারিত “প্রেত” ধারাবাহিকে অসাধারণ কাজ করেছে।
জানতে চাইলেন পরিচয় আছে?
– না
বললেন যোগাযোগ করে ওকে আসতে বলো। তখন আহমেদ রুবেলের সাথে আমার পরিচয় বা কোন প্রকার যোগাযোগ ছিল না। যোগাযোগ নাম্বারও নেই আমার কাছে। জানা ছিল আহমেদ রুবেল ঢাকা থিয়েটারের একজন সদস্য। ফোন করি ঢাকা থিয়েটারের কর্ণধার বাচ্চু ভাইকে (নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু)। না পেয়ে ফোন করি অভিনেতা শহিদুজ্জামান সেলিম ভাইকে। কারণ সেলিম ভাইও ঢাকা থিয়েটারের। সেলিম ভাইয়ের কাছ থেকে ফোন নাম্বার নিয়ে আহমেদ রুবেলকে ফোন করি। বসা হয় দক্ষিণ হাওয়ায়, চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। প্রথম বসায় চুক্তিপত্র স্বাক্ষর, স্বাক্ষর টাকা প্রদান করা হয় আহমেদ রুবেলকে।
“চন্দ্রকথা”র পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছে, লোকেশন রেকিং চলছে। এরমধ্যে কয়েকদিন পর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ছাড়া প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অসমাপ্ত।
স্ক্রিপ্ট লেখা হয়ে গেছে, নাটক “বৃক্ষমানব”। শিল্পী বাছাই চূড়ান্ত। আহমেদ রুবেল, আমি, হৃদি হক, এজাজুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, দীহান, চ্যালেঞ্জার, মুনিরা মিঠু, দুলাল, কমল সহ অন্যান্যরা।
চন্দ্রকথা সিনেমার পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ বন্ধ রেখে তৈরি হয় “বৃক্ষমানব”।
হুমায়ূন আহমেদের সাথে এটি আমার দ্বিতীয় নাটক। প্রথম নাটক ছিল “যাত্রা”। বৃক্ষমানব নাটকটি প্রচারের পর বাংলাদেশ সহ বহির্বিশ্বে বাঙ্গালীদের কাছে আমার পরিচিতি হয়ে যায় বেশ ভালো ভাবেই।
বৃক্ষমানবে আমার প্রথম কাজ আহমেদ রুবেলের সাথে। হয় বন্ধুত্ব, সহজাত, সহজিয়া।
আহমেদ রুবেল মানুষ হিসাবে একজন অসাধারণ সাদা মনের মানুষ। কিছুটা খামখেয়ালি, মোটেও বৈসয়িক না। পরচর্চা ছিল তার সবচেয়ে ঘৃণিত বিষয়। অভিনেতা হিসাবে একজন গিফটেড, যার অভিনয় জাদু ছড়ায়। পর্দায় উপস্থিতি মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন করে রাখে দর্শকদের। কন্ঠ একদম বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকের রাজার কন্ঠ মনে হয় (আমার কল্পনায়)।
তারপর থেকে আমরা একসাথে অনেক কাজ করেছি, একসাথে একান্ত অনেক সময় কাটিয়েছি। এমন ও হয়েছে আহমেদ রুবেল আর আমি দুজন বসে আছি, কিন্তু তেমন কোন কথা হচ্ছে না। শুধু আমরা দুজন হুম, হ্যা, এ আ্য করছি হুদাই। পাশে থেকে যারা দেখছে বা শুনছে তারা ভাবছে আমরা বসে দুজন আড্ডা মারছি বা জরুরী কোন কথা বলছি। আমরা কিন্তু ইচ্ছে করে দুরত্ব বজায় রাখছি। বিশেষ একটা কারণ তো আছেই!
“চন্দ্রকথা” সিনেমার ডাবিং চলছে বিএফডিসিতে। প্রতিদিন ডাবিং এর সময় আমি উপস্থিত থাকি হুমায়ূন আহমেদের সাথে ডাবিং থিয়েটারে। অন্যান্য শিল্পীরা ডাবিং করছেন আমি দেখছি। এর আগে আমি কোনদিন ডাবিং করিনি। যা করা হয়েছে তা ধারা বর্ণনা বা ধারাভাষ্য বলা যায় (Voice Over), তাও আবার ইংল্যান্ডে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য “War Crimes file”।
আমি যথেষ্ট নার্ভাস ডাবিং নিয়ে, রীতিমতো ভয় পাচ্ছি, আতঙ্কে আছি। ভয় পাওয়ার আরেকটা কারণ, খেয়াল করলাম নূর ভাই দুই দিন ডাবিং করতে এসে ডাবিং না করে ফিরে গেছেন। কারন জানতে চাইলে উনি বললেন ডাবিং এর ভয়ে আগুনের পরশমনির পর উনি আর সিনেমা করেননি!
আমার ভয়ের মাত্রা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
হুমায়ূন ভাই আমাকে পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যদি আমি ডাবিং করতে না পারি, তাহলে পেশাদার কোন ডাবিং শিল্পী দিয়ে আমার ডাবিং টুকু করাবেন। কিন্তু তিনি আমাকে সুযোগ দিতে চাচ্ছেন, তিনি চাচ্ছেন আমি যেন নিজের ডাবিংটা নিজে করি। আমি একবার হ্যাঁ, একবার না করছি, সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কি করব?
আমার ডাবিং রাখা হয়েছে সবার শেষে, কিন্তু আমি প্রতিদিন উপস্থিত থাকি অন্যদের ডাবিং এর সময়।
আমি মোটেই সাহস পাচ্ছি না, সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি।
ঠিক তখনই আমার ডাবিং শিক্ষকের উদয়।
আমাকে বুঝাতে শুরু করলেন, সাহস দিতে শুরু করলেন, ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, আপনার ডাবিং আপনি করবেন। আপনি পারবেন, ভালোভাবেই পারবেন। যথেষ্ট টিপস আমাকে দিলেন। এ নিয়ে আমরা কয়েক সেশন আড্ডা দিলাম, বলা যেতে পারে ডাবিং শিক্ষনীয় আড্ডা।
ডাবিং এর জন্য আমার সাহস দাতা, ডাবিং শিক্ষক, কে? নিশ্চয়ই জানতে চাচ্ছেন?
আমার ডাবিং শিক্ষক ছিলেন আহমেদ রুবেল!
আমরা বন্ধু ছিলাম, রাগারাগি হতো, কথা কাটাকাটি হতো, হালকা গালাগালি হতো তবে বন্ধুত্বের সীমানার মধ্যে। কিন্তু আমরা একে অন্যকে আপনি করে কথা বলতাম সব সময়। এমনকি রাগারাগির সময়ও।
ভালো থাকুন “বৃক্ষমানব”।
আবারও আপনার কন্ঠে শুনতে চাই “স্বাধীন আসেন…
এভাবে আর কেউ ডাকে না, এ কন্ঠ আর কারো নেই!
দেখা হবে, কথা হবে, এ য়ু হ্যা য়্যা করে অদেখা ভুবনে আবারো আপনার সাথে।
আপনি আমার একজন প্রিয় অভিনেতা। একজন প্রকৃত রহস্য মানব। মনে থাকবে আপনাকে।
আত্মার শান্তি প্রার্থনা।

স্বাধীন খসরু , অভিনেতা , নাট্যকার ।

১২/০২/২০২৪
লন্ডন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.